শেকড়ে ফেরা

দুনিয়ার বিচারে আপনি দুর্দান্ত সফল একজন মানুষ ….সারাদিন হাজারো ব্যাস্ততা …কাজ, কাজ আর কাজ…কত মানুষ আপনার অপেক্ষায়…খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত সব আপনার দুপায়ে এসে ধরা দিয়েছে …আজ ঢাকা তো কাল চিটাগাং পরশু ব্যাংকক তো তরশু ব্রিটেন,লেগেইই আছে… বিবি ,বাচ্চা, বাবা, মা আত্মীয়স্বজনদের জন্য সপ্তাহে বা মাসে দুচার ঘন্টা … কখনো খুব আয়োজন করে কোনো চাইনিজে খেতে যাওয়া বা বছরে একবার কোনো রিসোর্ট বা সমুদ্র ,পাহাড় দর্শন করা …ব্যাস্! পরিবারের প্রতি কর্পোরেটি দায়িত্ব শেষ … তাছাড়া আসলে সময় কোথায় ?
বিজনেস ক্লায়েন্ট ,বন্ধু বান্ধবদের পার্টি সব সময় অগ্রাধিকার …মিটিং সিটিং …সপ্তাহে চারদিনই রেস্টুরেন্ট এ খাওয়া …কাজের হাজারো লোড নিয়ে রাত করে বাসায় ফেরা, সকাল হতে না হতেই দে ছুট …সংসারটা ঘরের চেয়ে ঘরের বাইরেই অনেক বড় … রুটিনের বিন্দুমাত্র হেরফের নেই …নিরন্তর ছুটে চলা……
…কিন্ত আজ …সুনসান… একা একা ….নানান উৎকন্ঠা উদ্বেগ ছাপিয়ে হঠাৎই যেনো শেকড়ে ফেরা … দারুন না? সকালে ঘরে বসে ঘন্টা দুয়েক ল্যাপটপে কিছু মেইল, আর ড্রাফট সেরেই বাইরের সব কাজ শেষ। অখন্ড অচেনা অবসর ঘিরে ধরেছে আপনাকে। সকল হেল্পিং হ্যান্ড ছুটিতে, জীবনে প্রথমবারের মতো ঘরের কোনো কাজে হাত লাগাচ্ছেন….নুন ,তেল বাসনকোসন খুনসুটি চলছে গিন্নির সাথে, বাচ্চাদের সময় দিচ্ছেন ..নিজেকে অচেনা লাগছে…! তবে এটা সত্যি ,আপনি বিরক্ত হচ্ছেন না কারন আজ এই দুর্যোগ, এই মুসিবত আপনাকে ভাবাচ্ছে নানাভাবে। আপনার মনে হচ্ছে দুনিয়ায় একজন মানুষ, একজন স্বাভাবিক মানুষ কেনো এত্তএত্ত কাজের মাঝে থাকবে,কেন নিজের সময়ের সিংহ ভাগ নিয়ে নেবে অন্যরা ।নিজের সাথে কেনো থাকার ফুরসত মিলবে না?
হোটেল রেস্তোরাঁর বাহারি খাবারের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া নিত্য দিনের শাকচচ্চরি, ডাল, নিজহাতে করা ডিমভাজি অপুর্ব প্রশান্তি দিচ্ছে মনে। বাড়ির সবাই মিলে তিনবেলা এক টেবিলে খেতে বসা …. শেষ কবে হয়েছে কে জানে।তবে বিকেল বা সন্ধ্যা নামলেই মনটা হাঁসফাঁস করে বাইরে যাবার জন্য। এই প্রথম বুঝতে পারছেন গিন্নিকে সপ্তাহে অন্তত একবার বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়াটা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা জরুরী।ছোট্ট ছেলেটা বাবাটিকে যে কি ভিষন ভালোবাসে আর মিস করে তা ভাবতেই আপনার চোখে পানি চলে আসছে। ওকে যতবারই কোলে নিচ্ছেন, ওর সাথে খেলা করছেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন। পরিবারের, পিতৃত্বের ,বন্ধনের এই স্বাদ এতোদিন হেলায় দুরে ঠেলে ছিলেন ভাবতেই বুকের কোনে চিনচিনে বেদনা টের পাচ্ছেন । এই বেদনাকে বোধনায় রুপান্তরিত করুন দেখবেন জীবন পাল্টে যাবে।

জীবন মৃত্যুর বৈশ্বিক সন্ধিকালে ,মাঝে মাঝেই জীবনের নানান হিসেবের অংক যখন মৃত্যুতে এসে ঠেকছে , তখন মনে পড়ছে হারানো আপনজনদের কথা। কেমন আছে সবাই আল্লাহর কাছে ….মন থেকে দোয়া আসছে হে আল্লাহ আব্বাকে, আম্মাকে, আত্মীয়স্বজনদের কে ভালো রেখো মাফ করো ….
নিজের কথা ভাবতে গিয়ে চোখ ভিজে যাচ্ছে –ঠিকমতো নামাজ কালাম পড়িনি কোনদিন —শুধু জুম্মার নামাজ সপ্তাহান্তে …ইসলাম নিয়ে প্রথাগত কিছু জ্ঞান ছাড়া নিজস্ব কোন উপলব্ধি নেই –দুনিয়ার সাথে এতটাই মেতে ছিলাম যে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কটা ঠিক কি অবস্থায় এতদিন ছিল বা এখন আছে তা নিজেই ঠাহর করতে পারছিনা –আল্লাহ্ নিশ্চয় আমায় ত্যাগ করেছেন ! এসব ভাবছেন ? —মোটেই না আপনি আমি যেখানেই হারায় না কেন, আল্লাহ আমাদের সাথ ছাড়েন না কক্ষনো। বেঁচে আছি —সুস্থ আছি —ভালো রিজিক –পরিবার পরিজন সন্তান সন্তুতি নিয়ে সুখেই আছি —সবই আল্লাহ্‌র অসীম করুনার প্রমান –কত নিয়ামত দিয়ে যে আগলে রেখেছেন আমাদের! –ভাবুন একবার , চোখে পানি চলে আসবে । আপনি বুঝতে পারছেন এতদিন আল্লাহ্‌ একতরফা ভালোবেসে চলেছেন ,অনুগ্রহ করে চলেছেন আপনার প্রতি –এখন কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আমার আপনার ফেরার পালা –আর এই ফেরা একান্ত নিজের জন্যই —নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য কারন আল্লাহ্‌ অমুখাপেক্ষী —আল্লাহ্‌মুখীতা বান্দার প্রকৃতিগত প্রবনতা যা তাকে পরিশুদ্ধ করে ,পূর্ণ করে ,পরকালীন জিবনে আল্লাহর দরবারে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে বাঁচায় ।তাই বাঁচতে হলে আর দেরি নয় —দু হাত তুলে করি মোনাজাত—-
হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো .. হে পরয়ারদিগার ! আমাকে সঠিক পথ দেখাও …হে আল্লাহ আমাকে সোজা পথ দেখাও …হে আল্লাহ আমাকে কবুল করো …আমার জন্য হেদায়েতের দুয়ার খুলে দাও, হে মাবুদ!!

এস আর এইচ মিলন- কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন