লাইলী

আবু জিয়াদঃ

লাইলীর সাথে দেখা হয়েছিলো বিশ বছর পর। হাসপাতালের আট নাম্বার ওয়ার্ডে। বউ বলেছিলো “ মেয়েটা এত কিছু করলো তার সাথে দেখা না করেই চলে যাবে ?
: না, দেখা না করে যাবো না। তুমি খুঁজে নিয়ে আসো।

লাইলী বড় অদ্ভুত আচরণ করে ছিল। এক্সিডেন্ট করে আমি যে কয়দিন লাওয়ারিশ হিসাবে হাসপাতালের ফ্লোরে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলাম, কেউ  পাশে ছিলো না ,তখন সে এক মিনিটের জন্যও আমাকে রেখে কোথাও যায়নি। চব্বিশ ঘন্টা পাশে থেকেছে। সুশ্রুষা করেছে। তিন দিন পর আমার জ্ঞান ফিরলে , বাসা থেকে লোক জন আসলে সে আর কাছে আসেনি। অথচ সে এই ওয়ার্ডেই প্রতিদিন ডিউটি করেছে। আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে আমার চোখেও পড়েনি। আমার বউ আশপাশের রোগীদের মুখে তার সেবা যত্নের কথা শুনেছে। তার সাথে সাক্ষাত করেছে। কৃতজ্ঞতাবশত টাকা পয়সাও দিতে চেয়েছে , সে নেয়নি।বলেছে ,” টাকার আশায় খেদমত করিনি। টাকা নিয়ে ছোট হবো কেনো ?”

লাইলীকে আমার কাছে আসার কথা বললে বারবার সে ব্যাস্ততার অজুহাত দেখিয়েছে। “যান আসছি” বলে এড়িয়ে গিয়েছে।

আজ হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছি। ভয়ঙ্কর হ্যান্ড আর হেড ইন্জুরি নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ছাড়ছি। কাল ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করবো। তাই বিদায় বেলায় লাইলীর সাথে দেখা করার জন্য বউ তাগাদা দিলো। যদিও নাকি এখন পর্যন্ত লাইলীর পরিচয়ই জানা হয়নি

: কেমন আছেন আপনি ? আমাকে চিনতে পেরেছেন।

লাইলীর কথায় ভাবনায় পরে গেলাম। মনে হচ্ছে চেনা চেনা কিন্তু মনে করতে পারছি না ,সে কে ? গভীর ভাবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

: চিনতে পারছেন ?
: কোথায় জানি দেখেছি কিন্তু ঠাহর করতে পারছিনা।
: আচ্ছা। আপাতত ঠাহর করার প্রয়োজন নেই।  আগে সুস্থ হোন পরে মনে করবেন।
: কিছু মনে না করলে আপনাকে কিছু দিতে চেয়ে ছিলাম। “ আমি খুব বিনয়ের সাথে বললাম।
: জনাব , আমি কিন্তু লাভের আশায় কিছু করিনি। যা করেছি মন থেকে।  আপন ভেবে করেছি। আপনি সুস্থ হোন। আপনার নাম্বার নিয়ে নিচ্ছি। খোঁজ খবর নিবো আপনি কোথায় ,কেমন থাকেন।

হাসপাতাল ত্যাগ করি তীব্র যন্ত্রনা নিয়ে। অতিরিক্ত মাথা ঘামিয়ে লাইলীর পরিচয় উদ্ধার করার মত অবস্থা ছিলো না। তবে অনেক কিছু শুনেছি। হাসপাতালে আনার পর আমার চেহারার এমন অবস্থা ছিলো যে আমাকে চিনা যাচ্ছিলো না। একে তো মাথা ,মুখ আর হাতে আঘাত, তারপরও ছিলো কাঁদায় মাখামাখি। লাইলীর যত্ন না পেলে শুধু চিকিৎসায় আমার সুস্থ হওয়ার সম্ভব ছিলো না। অবশ্য উপর ওয়ালাই সব। তিনিই হাসপাতাল পর্যন্ত এনেছেন , লাইলীর হাতে সেবা পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন , বাঁচিয়ে রেখেছেন। তিনিই সব করেছেন। সকল কৃতজ্ঞতা তিনিই পাওয়ার যোগ্য।

দিল্লীর রাজেন্দ্র প্রসাদ ট্রমা হসপিটাল (এইমসে ) দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে এক দিন হঠাৎ করে লাইলীর পরিচয় মনে পড়ে গেলো। তখন যোগাযোগ করার জন্য বড্ড অস্থির হয়ে উঠলাম । মুশকিল হলো সে আমার নাম্বার নিয়ে ছিলো ঠিক তার নাম্বার আমাদের নেয়া হয়নি। ফলে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিলো না। কাউকে বলাও যাচ্ছিল না যদি কেঁচো খুড়তে সাপ বেড়িয়ে আসে ?

বেশ কিছু দিন পর, তখনও আমি হাসপাতালের বিছানায় , হঠাৎ দেখি ইমুর নোটিফিকেশনে লাইলীর নাম। তৎক্ষনাত কল করলাম। একবার, দুই বার, বহুবার। লাইন সো করে, রিং হয় কিন্তু রিসিভ হয়না। অস্থিরতা আমাকে কঠিন ভাবে চেপে ধরলো। সেই দিন রাত পর্যন্ত অসংখ্য বার পাগলের মত লাইলীকে রিং করে গেলাম। রিসিভ করলো না। রিসিভ করলো পরের দিন দুপুর বেলা। বললো , ব্যাস্ততার কারণে রিসিভ করতে পারেনি।  তবে রাতের বেলায় আমাকে ব্যাক করবে।

লাইলী ব্যাক করেনি। কেবল এক তরফা কিছু মেসেজ দিয়ে আমাকে ব্লক করে দিয়ে ছিলো।

মেসেজ গুলো ছিলো এই রকম , আপনাকে পুনরায় পেয়ে আমার জীবনের প্রাপ্তি পূর্ণ হয়েছে। এখন আর আমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। বাকি জীবন এভাবেই কাটিয়ে দিতে পারবো। আর হ্যা, আমি কিন্তু আমার কথা আজও রেখে চলেছি। আমার গর্ভে কারও সন্তান ধারণ করিনি। বিয়ে করিনি। একবারের ভুল দ্বিতীয় বার আর করিনি। বরং একবারের ভুলের অনুশোচনায় সারা জীবন পার করে দিচ্ছি।

আপনাকে আহত অবস্থায় পেয়ে  নিজেকে সৌভাগ্যশালিনী মনে হয়েছে। আসলে আপনি মানবেন কিনা জানি না, পৃথিবীতে প্রাণের আগমনে কোনো পাপ থাকে না। পাপ থাকে আমরা যারা তাকে নিয়ে আসার উপলক্ষ হয়েছি তাদের পদ্ধতির মাঝে। আপনি বাচ্চা নষ্ট করে চলে গেলেন। হাওয়া হয়ে গেলেন। আপনি কি ভেবেছিলেন জানিনা তবে আমার কাছে আমার বাচ্চাকে কখনও পাপী মনে হয়নি। মনে হয়েছে যাকে গর্ভে ধারণ করেছি সে নিষ্পাপ। বৈধ ভাবে যদি তার আগমন ঘটতো তাহলে তার জন্য আমার যতটুকু মাতৃত্ব বোধ জেগে উঠতো তার জন্যও ঠিক ততটুকুই উঠেছিলো। বিন্দু মাত্রও কম উঠেনি।

জানেন, যার সন্তান গর্ভে ধারণ করা হয় তাকে বড় আপন লাগে। তাকে খুব করে নিজের মনে হয়। আর এতো নিজের মনে হয় বলেই আর বিয়ে করা হয়ে উঠেনি। বরং মনে হয় এই তো জীবন ! হাসপাতালে আয়ার কাজ করছি। মানুষের সেবা করছি। বেশ কেটে যাচ্ছে। আর আমি তো কাজের মেয়েই ছিলাম। কখনও যদি স্বল্প সময়ের জন্য ঘর বাঁধার স্বপ্ন অথবা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে থাকি তবে সে জন্য আপনি দায়ী নন,আমিই দায়ী। আমার ভুল আপনার উপর কেনো চাঁপাবো ? ভালো থাকবেন। পিছু টানে পড়বেন না। পজিটিভ চিন্তা করবেন।

আপনার বউ অনেক সুন্দর আর ভালো মানুষ। বাচ্চারাও সুন্দর। খুব নিষ্পাপ। আদর করতে ইচ্ছা হয়। শেষ কথা হলো কোনো ভাবেই আমার সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করবেন না। করলে আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হতে হবে। হয়ত অজানার পথে পা বাড়াবো, তবু আপনার সামনে আর পড়তে চাইনা।

লাইলী ব্লক দেয়ার পর থেকে অদ্যবধি আমার দিন গুলো কাটছে অনুশোচনার অনুতাপে পুড়ে পুড়ে নিজেকে বিশুদ্ধ করার প্রচেষ্ঠায়। বিশ বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনার রেষ টেনে টেনে।

আমি তখন টগবগে যুবক। সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করা চাকরীর পিছনে ছোটা এক বেকার। ঢাকার কল্যাণপুরে এক মেসে থাকি। পড়ি আর চাকরির সন্ধান করি।

লাইলীর মা সালেহা আমাদের মেসে বুয়ার কাজ করতো। লাইলী তখন ক্লাস টেনের ছাত্রী। মিশমিশে কালো, কুৎষিত চেহারার লাইলীর সম্পদ বলতে ছিলো তানপুরার মত ঢেউ খেলানো টান টান  দেহ বল্লরী। সালেহা কোনো দিন অসুস্থতার কারণে কাজে আসতে অক্ষম হলে লাইলী এসে রান্না বান্না আর ঘর মোছার কাজ করে যেতো।

যেই আমি কোনো দিন কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি সেই আমার মাঝেই অনূভব করলাম বিশাল পরিবর্তন। নেশা চেপে বসলো। কোনো ভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। শুরু করলাম লাইলীর সাথে প্রেমের অভিনয়। খুব সম্ভবত এর আগে কোনো পুরুষ এই ভাবে লাইলীর রূপের প্রশংসা করেনি। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখায়নি। আমিই প্রথম তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রূপের বন্দনা করেছি। হয়ত সে বিশ্বাসও করে ফেলেছিলো যে,আয়নায় নিজ চেহারা কুৎসিত দেখালেও তাকে আমার মত এক জন সম্ভাবনাময় যুবকের চোখে  ঠিকই সুন্দর দেখায়।

লাইলী আমার প্রেমে পড়েছিলো। যতটুকু একজন মেয়ের পক্ষে সম্ভব ততটুকু। হয়ত আমিও পড়েছিলাম তবে তখন পর্যন্ত ঘর বাঁধার সাহস ও সামর্থ্য কোনটাই অর্জন করতে পারিনি। লাইলীকে বলেছিলাম তোমার এই গর্ভের দখল কেবলই আমার।  আমার সন্তানের।

আমার লোভ আর দুর্বল চিত্তের কাছে আমি আত্মসমর্পন করেছিলাম । অনাগত সন্তানকে আলোর মুখ দেখাতে পারিনি। আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম।

বিশ বছর অতিক্রান্ত হলো। লাইলী তার কথা রেখেছে। কথা রাখতে পারিনি আমি। সে জিতে গিয়েছে।আর আমি আমার বিশাল প্রতিষ্ঠান ও প্রতিপত্তি নিয়েও হেরে গিয়েছি।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন