রান্নাবান্না

আসাদুজ্জামান জুয়েলঃ

আমার বৌয়ের সাথে আমার কিছুতেই বনিবনা হচ্ছে না। দিনরাত খুৃ্ঁটখাঁট লেগেই আছে। এই লেগে থাকার মূল কারণ হলো, সে একটা অকেজো টাইপ মানুষ। সারাজীবন একই কাজ করে গেল। কোন ইনোভেশান নেই। 

রোজ সকালেই ঘুম থেকে উঠে দেখি, সিংকে দাঁড়িয়ে থালা বাসন পরিষ্কার করছে। আমি বাথরুমে ঢুকলে সে এসে বিছানাটা গুছিয়ে রাখে। আরো একটু শরীরটাকে এলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পরিপাটি বিছানাটাকে আর নোংরা করতে ভালো লাগেনা বলে, পড়ার টেবিলে বসি। ম্যাডাম তখন ঘরবাড়ি ঝাড়ু দিতে ব্যস্ত।

একটু পরেই রান্না ঘর থেকে তার বকবকানির শব্দ শোনা যায়। আমার মতো অকেজো, অপদার্থ যে সে আর কখনো দেখেনি, সেটা বলতে বলতেই নাস্তা তৈরি করে। চা বানায়। আমার লাঞ্চ রেডি করে হটপটে ভরে দেয়। নাস্তা প্লেটে তুলে দিতে দিতেই অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,”আমিও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম। চেষ্টা করলে কি চাকুরী পেতাম না। নিশ্চয় পেতাম। এই অপদার্থের সংসারে এসে আমার হাড়-মাংস-পিত্তি সব জ্বলে গেল। একটু হেল্পও তো করা যায়! চাকুরী করে বলে কি আমার কাজে একটু হাতাহুতি দেওয়া যায় না।”

আমি নাস্তা করি। চুপচাপ। বোবার মতো। জানি বোবার শত্রু নাই। সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরলে, ম্যাডাম দয়া করে নাস্তা দেন। আমার জন্য লাল চা এবং বাকিদের জন্য দুধ চা বানাতে বানাতে বলেন, “এমন কপাল নিয়ে জন্মেছিলাম, একেকজনের জন্য একেক চা বানাতে হয়। কেন আর সবার মতো দুধ চা খেলে ক্ষতিটা কি! পেয়েছে বিনা পয়সার এক চাকরানী, খাটিয়ে নিচ্ছে। বুঝবে একদিন বুঝবে।”

রাতের খাবার রান্না করতে করতে আর এক পর্ব চলে। তারপর দুধের গ্লাসটা দিতে দিতে আরো কয়েকবার স্বার্থপর শব্দটা উচ্চারণ করেন। আমার শোবার বিছানা রেডি করতে করতে এবং শুয়ে পড়লে মশারী টাঙাতে টাঙাতে আরো কিছু শব্দ তীরের মতো ছুঁড়ে দেন আমার দিকে।

এই হলো তার রুটিন। একই কাজ, একই তীর নিক্ষেপ পরেরদিনও অব্যাহত থাকে। তারপরের দিনও। কোন নতুনত্ব নেই। ইনোভেশান নেই। বোরিং।

সেদিন সাহস করে বলেই ফেললাম, “একই কাজ তো রোজ রোজ করো, আমার কষ্ট তুমি কি বুঝবা। অফিস করতে হলে ঠ্যালা বুঝতা।”

বোবার মুখে রাঁ ফুটতে দেখতে তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। মুখ ভেংচে বললেন, “আহ্ কি আমার অফিসার রে! আবার কাজ দেখায়! করো তো ব্যাংকে কেরানির কাজ। ওটা কোন কাজ হলো। একদিন চূলার পাড়ে গেলে ঠ্যালা বুঝতা।”

আমি বললাম, “রান্না করা আবার কোন কাজ হলো। তাও আবার গ্যাসের চূলা। খড়ি ঠ্যালার ঝামেলা নাই। ইজি কাজ নিয়ে বিজি থাকো, আবার ভাব নাও।”

– ইজি কাজ, না? ইজি কাজ? একদিন করে দেখাও তো দেখি! আমি না থাকলে এক সপ্তাহ তুমি টিকবা না, গ্যারান্টি দিতে পারি।

-এক সপ্তাহ কেন, তুমি না থাকলে আমি নির্বিঘ্নে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। কোন সমস্যা হবে না।

-তাই না? ঠিক আছে আজই আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি।  থাকো দেখি কেমন পারো!

আমি তিনদিন ধরে আছি একাই। খুব বেশি সমস্যা হয়নি। শুধু মশারীটা তিনদিনে একবারও খুলিনি। আর খোলার দরকারটাই বা কি! রাতে তো আবার টাঙাতেই হবে। বিছানাও ওতো গোছাতে হবে বলে মনে হয় না। এক সপ্তাহ পর পর বেড শিট আর বালিশের কাভার চেঞ্জ করলেই হলো।

খাবারের সমস্যা হয়নি। বিস্কিট, মুড়ি, চা খেয়েই তিনদিন কাটিয়ে দিয়েছি। নিজেকে বড় স্বাধীন মনে হচ্ছে। কানের কাছে চিৎকার চেঁচামেচি নাই। গালিগালাজ নাই। একমাত্র সমস্যা হলো, ঘরের মেঝেতে ধূলো জমেছে। হাঁটতে লাগলে পায়ে বাঁধছে। 

রান্নাঘরে চায়ের কেটলিটা পড়ে আছে। ওটা পরিষ্কার করতে ইচ্ছে করছে না। ওভাবেই বারবার একটু পানিতে ধুঁয়ে নিয়ে চা বানাচ্ছি। খাচ্ছি। কেউ আর লাল চায়ের বদনাম করতে পারছে না। চা বানানোর সময় জানালার পাশে একটা কাক বসে বসে মুখ ভেংচাচ্ছে। ওটা আমার ম্যাডামের বান্ধবী। ম্যাডাম রান্নার সময় কাকটা এসে কা কা করে গল্প করে। ম্যাডামও বোধ হয় কাকের ভাষা জানে। আমাকে বকাবকি করার সময় তার মুখ দিয়েও ওরকম কর্কশ শব্দই তো বের হয়।

তিনদিন পর খুব ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। ভাত রান্না করা সহজ কাজ।  সমস্যা হলো, তরকারি রান্না করা নিয়ে। ডিম ভাজা যায় কিন্তু আমি আবার ভাজা ডিম খেতে পারিনা। 

সাহস করে বাজারে গেলাম। মাছ কিনলাম। রুই মাছ। কাটতে পারবো না জানি। দোকানদারের থেকেই কেটে নিলাম।

বাসায় এসে দুই টুকরো মাছ রান্না করবো ভাবছিলাম। এই প্রথম রন্ধনবিদ্যা না জানায়, নিজেকে অপদার্থ বলে গালি দিলাম। এতদিনে মাছটাও রান্না করা শিখিনি!

কিভাবে রান্না করতে হয় জানার জন্য ম্যাডামকে ফোন করবো ভাবলাম। তারপর নিজেকে গালি দিলাম এই বলে যে, “ছিঃ ছিঃ তাকে ফোন দিবা, যে গ্যারান্টি দিয়েছে এক সপ্তাহও তাকে ছাড়া চলবে না”।

আর কাকে ফোন দেওয়া যায় ভাবতে ভাবতে এক বন্ধুর কথা মনে এলো। যোগাযোগ করলে সে বললো,” আরে হাঁদারাম, এই যুগে এটা কোন সমস্যা হলো। ইউটিউব দ্যাখ। তোর ভাবি রাগ করে কাল বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমিও ইউটিউব দেখে দেখেই রান্না করে খাচ্ছি।”

ম্যাডামের মতো বন্ধুও হাঁদারাম বলে গালি দিলেও, ইউটিউবের কথা মনে করে দেওয়ায় মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। এক ঘন্টা ধরে টিউটোরিয়ালগুলো দেখে দেখে মনে হলো, রান্না কোন ব্যাপারই না। অযথাই মেয়েরা এটা নিয়ে ভাব নেয়। তাছাড়া মেয়েরা আবার রান্না জানে নাকি! কোনমতে বাড়ির জন্য দুইটা নুন ভাত রান্না করতে জানে। পৃথিবীর সব বড় বড় হোটেলের পাচক পুরুষ। যে কোন বড় অনুষ্ঠানেও পুরুষ বাবুর্চি ছাড়া চলে না। সুতরাং “পুরুষ বাবুর্চি জিন্দাবাদ” বলে রান্না ঘরে প্রবেশ করলাম। 

রান্না ঘরে ঢুকতেই বিড়ম্বনা শুরু হলো। মাছ রান্নার জন্য আদা বাটা, রসুন বাটা লাগবে দেখলাম, এখন এই বাটাবুটি কোথায় পাই! 

মনে হলো, ম্যাডাম ফ্রীজে বেঁটে রাখতে পারে। ফ্রিজ খুলতেই ইউরেকা বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। মশলার বাটি পেয়েছি। 

টিউটোরিয়ালে দেখলাম, বাঁটা মশলা দিয়ে মাছ আগে মাখিয়ে নিতে হবে। আমি সিংকের পাশে দাঁড়িয়ে মাছে মশলা মাখানোর সময় বেকুব বনে গেলাম। বাঁটা মশলা সবগুলোই তো একই রকম! কোনটা কি চিনবো ক্যামনে! আমার কান্না কান্না মুখ দেখে জানালার পাশের ডালে বসে, আমার ম্যাডামের বান্ধবী দাঁত কেলাতে লাগলো। মুহূর্তেই আরো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী জুটে গেল তার। কাক সাম্রাজ্যের বদ কাকগুলো, আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে হাসিতে কুটি কুটি হয়ে যেতে লাগলো।

আন্দাজে যেটাকে যা মনে হলো তাই দিয়ে মাছ মাখালাম। আধাঘন্টার চেষ্টায় চূলা জ্বালাতে পারলাম। চূলায় প্যান চাপালাম। পানি ঢেলে দিয়েই মনে হলো, ভুল করে ফেললাম। তেল দেওয়ার কথা আগে। এখন কি করি কি করি করতে করতে প্যান থেকে পানিগুলো ঢালবো ভেবে হাতে ছ্যাঁকা খেলাম। আরে হাতলও যে গরম হয়, তা তো জানতাম না। কোন মতে পাশে পানিটা ফেলার জন্য ঘুরেছি হঠাৎ একটা শব্দ হলো। চমকে উঠে ঘুরতেই দেখলাম, দুটো কাক ছোঁ মেরে আমার জানালা দিয়ে মাছগুলো নিয়ে পালিয়ে গেল। আমি ম্যাডামের বন্ধুদের গুষ্টিশুদ্ধ গালাগালি করে ধুঁইয়ে দিলাম। 

আবার প্রথম থেকেই শুরু করতে হলো। ফ্রীজ থেকে মাছ বের করলাম। আন্দাজে মশলা মাখালাম। প্যানে তেল দিলাম। তেল গরম হলে মাছটা সেখানে দিতেই তেল ছিঁটে এসে হাতে পড়লো। মা গো, বাবা গো বলে কিছুক্ষণ চিৎকার করলাম। 

ভাজা মাছ নামিয়ে, ঝোল করার জন্য মশলা করতে লাগলাম। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখ দিয়ে গ্যালন গ্যালন পানি বেরুলো। মনে হচ্ছিলো অন্ধ হয়ে যাবো। চোখ বুঁজে তেলে পেঁয়াজ কুচি দিলাম। জিরা দিলাম। তারপর মাছ ছেঁড়ে দিয়ে মনে হলো, হায় হায় মরিচের গুঁড়া তো দিইনি। কি আর করা, ওর মধ্যেই মরিচ গুঁড়া ছেড়ে দিলাম। বেশ সুগন্ধ বের হচ্ছে। 

মনে মনে ভাবলাম, ম্যাডামকে আজ শিক্ষা দিবো। রান্না শেষে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিবো। সে নিশ্চয় দেখবে এবং বুঝবে রান্না করা কোন কঠিন কাজ নয়, যে কেউই পারে।

মাছ হয়ে আসলো কিনা দেখতে গিয়ে চমকে গেলাম। আরে, মাছ এমন সাদা কেন! তখন মনে হলো, হলুদ গুঁড়া দেইনি। অগত্যা তখন হলুদ দিলাম। হলুদগুলো গোটা গোটা হয়ে মাছের গায়ে লাগলো এবং রীতিমত বিশ্রী দেখাতে শুরু করলো। 

আমি ফেসবুকে ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়লাম। এই রঙের মাছের ছবি কেউ কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না। সুতরাং সিদ্ধান্ত নিলাম, ছবি আর দিবো না, চুপচাপ খেয়ে নিই। চূলার পাড়ে গিয়ে খুব ইচ্ছে করলো, নিজের রান্নাটা একটু চেখে দেখার। চামচে একটু ঝোল নিয়ে মুখে নিতেই দেখলাম, “ইহা জগতের সব চাইতে অখাদ্য রান্না এবং ইহাতে মোটেও লবণ দেওয়া হয় নাই”।

কোনমতে লবণ ছিটিয়ে চূলা থেকে নামাতে গিয়ে ঘটলো আসল বিড়ম্বনা। প্যানের হাতল ধরেছি, ওমনি সেটা কাঁত হয়ে সবটুকু ঝোলসহ রুই মাছ এসে পায়ের উপর পড়লো। আমি চিৎকার দিয়ে লাফাতে লাফাতে রান্নাঘর থেকে বেরুলাম। পায়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে ফোঁসকা পড়ে গেছে। যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে নিজেকে হাজার বার অপদার্থ বলে গালি দিলাম।

তেলে হাত পুড়েছে, ঝোলে পা। মন তবু গললো না। বৌকে দেখাতেই হবে, তাকে ছাড়াও আমার চলে। দেখানোর উপায় একটাই৷ ফেসবুকে ছবি আপলোড দেওয়া। কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই উপায় পেয়ে গেলাম। ফেসবুকে একজনের রান্নার ছবি দেখতে পেয়েই সেভ করে নিলাম। তারপর নিজের টাইমলাইনে  “আহ্, ইয়াম্মি, নিজের রান্না করা রুই মাছ” ক্যাপশান লিখে পোস্ট দিলাম। কয়েক মিনিটেই শত শত লাইক আর হাসির ইমেটিকোন দেখতে পেয়ে মনে মনে গর্বিত হলাম। ম্যাডাম এবার বুঝবে ঠ্যালা! তাকে ছাড়াও আমার বেশ চলে।

কিছুক্ষণ পরেই ম্যাডামের ফোন। জানতাম ফোন করবেই।  উপায় নেই। 

খুব ভাব নিয়ে বললাম, “হ্যালো”।

– কি খেয়েছো?

-আমি কি রান্না করতে জানি না নাকি! রুই মাছ কিনে এনে রান্না করলাম। জোশ হয়েছে। জীবনে এতো টেস্টি রান্না খাইনি। ভাবছি রিটায়ার্ডমেন্টের পরে একটা মাছ ভাতের হোটেল দিবো। নিজে রান্না করে কাস্টমারদের খাওয়াবো। হোটেলের নাম দিবো, ” বিকল্প ভাত ঘর”। সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে “যারা বৌয়ের হাতের রান্না খেতে চান না তারা চলে আসুন। বৌ বাড়ি থেকে তাড়ালে, সকল খাদ্যে ৫০% ছাড়।”

-হোটেল পরে দিও বুদ্ধু। আগে মাছ চেনো। ফেসবুকে যেটার ছবি পোস্ট দিয়েছো ওটা রুই মাছ নয়। ওটা তেলাপিয়া মাছ। লোকে হা হা রিএ্যাক্ট দিচ্ছে তাও বোঝেনা। উনি দিবেন বিকল্প ভাত ঘর!”

ফোন কেটে গেলে মন মরা হয়ে বসে থাকলাম। মনের ভেতর থেকে কে যেন বললো, “যতই ভাব নাও চাঁদু, বৌ ছাড়া চলবে না। তার চেয়ে তাকে একটু কাজে কর্মে হেল্প কইরো।”

লেখকঃ কবি,  সাহিত্যক ও এডমিন, মহীয়সী।

আরও পড়ুন