মু্ভি রিভিউঃ অব্যক্ত কথাগুলো দুরত্ব তৈরী করে ‘এ সেপারেশন’

মাসুদুল হাসান রনি

দুপুরে চলচ্চিত্র নির্মাতা আকা রেজা গালিবভাইয়ের একটা লেখা পড়ছিলাম চ্যানেল আই অনলাইনে।সেখানে তিনি তার পছন্দের বারোটি সিনেমার কথা উল্লেখ করেছেন। সবগুলো সিনেমাই দর্শক নন্দিত, প্রশংসিত ও পুরস্কৃত। উল্লেখিত তালিকার ৩/৪ টি সিনেমা ছাড়া বাকী সবই দেখা। গালিবভাইয়ের লিস্টের এক নাম্বার সিনেমা ছিল ইরানী পরিচালক আসগর ফারহাদীর ” এ সেপারেশন “( A seperation).

এ সিনেমাটি গালিবভাই যেহেতু এক নাম্বারে রেখেছেন তাই দেখার আগ্রহ শতগুন বেড়ে যায়। কারন একটাই। বিশ্ব চলচ্চিত্র নিয়ে গালিবভাইয়ের পর্যবেক্ষন, তার সিনেমা বোঝাপড়া দীর্ঘদিনের। তিনি নিশ্চয়ই আসগর ফারহাদীর সিনেমায় এমন কিছু পেয়েছেন যার কারনে ভাললাগার সিনেমার একনাম্বার স্থানটি সহজে দখল করে নিয়েছে ” এ সেপেরাশন”। অসম্ভব মেধাবী এই মানুষটির সাথে ‘সানসিল্ক বৈশাখি সাজ ‘ ও আরো দু’একটি কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখেছি তার জ্ঞান, মেধার বিচ্ছুরন। সেই প্রসংগে না হয় আরেকদিন বলা যাবে।

হোম কোয়ারান্টাইনের বায়ান্নতম রাতে দেখলাম ইরানীয়ান সিনেমা আসগর ফারহাদী পরিচালিত ‘ এ সেপারেশন “( A seperation). সিনেমাটি ২০১২ সালে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল কানাডায়।

কাহিনী সংক্ষেপ হচ্ছে, ইরানের এক দম্পতি নাদের এবং সিমিন তাদের মেয়ে টেরেমের সাথে ইরানে থাকেন। সিমিন দেশের বাইরে চলে যেতে চায়, কিন্তু নাদের তার অসুস্থ বাবার যত্ন নিতে চাইলে সিমিন তা করতে নারাজ। এ নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মনোমালিন্য, দ্বন্ধ ও নাটকীয়তা।

সিনেমাটি কেমন লাগলো? সে প্রসংগে যাবার আগে বলি, বিগত পঁচিশ- ত্রিশ বছরে বিশ্বব্যাপী নাড়া দিয়েছে ইরানের সিনেমা। এ সময়ে ইরানে অসংখ্য খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকারের আর্বিভাব হয়েছে। নির্মিত হয়েছে দুর্দান্ত কিছু সিনেমা। অস্কার, কান, বার্লিন,ভেনিস থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের তাবৎ নামীদামী সকল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ইরানের সিনেমার জয়জয়কার, রমরমা অবস্থা বিরাজ করেছে। আব্বাস কিয়োরস্তমি, মহসিন মাখমলবাফদের পরের সারিতে উঠে এসেছেন আসগর ফারহাদীর মতন অসংখ্য বরেন্য নির্মাতা।

এ সেপারেশনে পরিচালক দেখিয়েছেন নাদের তার নিজের জীবনকে নতুন করে তৈরি করার এবং জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু একরকম দূরবর্তী পরিস্থিতিতে কঠিন ঘটনাগুলির মুখোমুখি হওয়ার সেরা জায়গা হতে পারে বিচ্ছেদ। কিন্তু দর্শক হিসেবে চাইবো, এই ধরণের ঘটনা এবং সংঘাতগুলি আমাদের কারো জীবনে সংঘটিত না হোক। তবে তাঁর বাস্তববাদী বিশ্ব এবং চরিত্রগুলির সাথে এগুলি কারও কাছে খুব কাছাকাছি এবং সম্ভব বলে মনে হচ্ছে। আসগর ফরহাদি তার দর্শকদের বিচারকের জায়গায় রাখতে পছন্দ করেন, যেমন বুধবার সম্পর্কে এলি বা ফায়ার ওয়ার্কস। এখানে কোনও ভীতি ছাড়াই তিনি আমাদের সরাসরি আদালতের ঘরে নিয়ে যান। তবে বিচারক সুস্পষ্ট রায় দেওয়ার জন্য কোনও সহায়তা দেন না এবং আশ্চর্য রকমভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেন।

হ্যাঁ ফারহাদী তার দর্শককে কোনও রায় দিতে চান না, তিনি ঘটনার ওপর নজর রাখেন এবং পর্যবেক্ষণ করেন। এবং কাহিনীকে ব্যবচ্ছেদ করার জন্য একটি বিশাল কাঁটাচামচ দর্শকের সামনে রেখে যান । নাদের ও সিমিন যখন কেউ বিচ্ছেদে স্পষ্টতই দোষী না হয় । আবার এখানে আমরা সিনেমার শেষে অবাক বিস্মিত হয়েছি। দর্শক হিসেবে নিজের চেয়ারটি এক সেকেন্ডের জন্যও ছাড়তে পারবেন না, কারণ কাহিনী দর্শককে একটি মুহুর্তও হারিয়ে ফেলতে দেয় না। উপরন্ত টেনিস বলের মতো আমাদের সর্বদা এই দিক থেকে অন্যদিকে চিন্তার মনযোগ কেড়ে নেয়। অবশেষে দেখি নাদের ও সিমিনের সিদ্ধান্তহীনতায় তাদের কন্যা হতবাক! ছোট ছোট মিথ্যাচার এবং গুরুত্বহীন পূর্বাবস্থায় থাকা জিনিস এবং অনুচ্চারিত শব্দগুলি যখন তাদের বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং একটি বিরাট বিপর্যয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন আমরা তাদের একসাথে থাকতে দেখিনি বা আমরা জীবনের এই দিকটি দেখতে চাই না, যেখানে কিছুই পরিষ্কার নয়। ফারহাদি তার নিজস্ব ভাষায় কাহিনী এগিয়ে নিয়েছেন। এমন কিছু ট্রিটমেন্ট দিয়েছেন, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি। অভিনয় করেছেন লায়লা হাতামী, পেমন মোয়াডি, শাহাব হোসেইনি, বাবাক করিমি, সারে বায়াত, সারিনা ফরহাদি, মেরিলা জেরেই।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার মুভি রিভিউ লেখক

 

আরও পড়ুন