দাদু

শাহনেওয়াজ কাকলী

দাদুর সাথে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর একটা অলৌকিক অন্তরীয় সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাদের কাছে চিত্রকলার জীবন্ত ইতিহাস। তিনি যে পরিমাণ চারুকলা,মুক্তিযুদ্ধ ও জয়নুল আবেদিন স্যারের গল্প শুনিয়েছেন তা কয়েক বেলার লাইব্রেরি ওয়ার্ক করার চেয়েও বেশি।
দাদু আমাদের শিক্ষকও ছিলেন বটে। তার ড্রয়িং করতে যেই যেতো তিনি খানিক পরে নিজ থেকেই বলতেন, “দেখি তো দাদু কি আঁকছো?” তারপর ড্রয়িং না মিললে নিজেই ভুল ধরিয়ে দিতেন এমন সুন্দর করে; বলতেন,” দেখার চোখ করতে হবে অদুরদর্শন। দুরদৃষ্টি না থাকলে ছবি আঁকতে পারবা না দাদু। প্রাক্টিস করতে হবে অনেক অনেক প্রাক্টিস। এই আর্ট কলেজ কত কষ্টে জয়নুল স্যারে গড়ছে…দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে গল্প শুরু হয় আর আমরা দাদুকে আকঁতেই থাকি। তাকে দেখে মায়া হয়না এমন মানুষ খুব কমই ছিল।। শুধু চারুকলার ছাত্রছাত্রী নয় পুরো ক্যাম্পাসের অন্য বিভাগীয় ছাত্রছাত্রীরাও দাদুর কাছে ভিড় জমাতো। তাঁর নিজের হাতে তৈরিকৃত মাটির রংগিন মালার ছিল বিশেষ চাহিদা। দাদু মালাদাদু নামেই জনপ্রিয় ছিলেন। আমাদের শ্রদ্ধাভাজনেষু মোমিন দাদুকে আমরা যখন পাই তখন তিনি মডেলিং প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। ক্লাশ ওয়ার্কে নয়,শখ করে আউটডোর করলে ওনি খুশি মনেই মডেল হতেন।

একরাশ মায়ামুখের এই দাদু সব ছাত্রছাত্রীর কাছে আবদার বা সাহায্য চাইতেন না, নিতেন না। আমরা শখ করে মাঝেমধ্যে শুধু ভাত খাওয়া কিংবা চা নাস্তার বিল দিয়ে দিলাম ক্যান্টিনে, তাও তিনি কয়েকবার না করতেন। যদিও তিনি বেশিরভাগ সময় খাবার সাথে করেই নিয়ে আসতেন এবং ভাত খেতেন না। খুব কমসম, দু একবার।

অমায়িক তাঁর জীবনাচার-আচরণ,খাদ্যাভ্যাস,ভাষার ব্যবহার ও ব্যক্তি স্বভাব। তাঁর পাশে ভয়ে বসে থাকলে তিনি দারুণভাবে অভয় দিয়ে বলতেন,চারুকলায় কোন ভয় নাই দাদু বড় পবিত্র স্থান। ভুত পেত্ন মানুষ কেউ কিছু করবেনা। ওঁনার নির্ভীকতা আমাদেরকে সাহসী করে তুলেছিল।

দাদুর সাথে আমারও একটি অলৌকিক সম্পর্ক ছিল।প্রতিবছর আমার বাবা মৃত্যুবার্ষিকী আসলে আমি তাকে ৫০০ টাকা করে দিলাম।। এটা ছিল আমার আত্মিক শান্তি। তখন ছাত্রী ছিলাম,দাদু এই টাকা কিছুতেই নিতে চাইলেন না। আমি যখন বললাম দাদু এটা আমি খুশি হয়ে দিচ্ছি, ভিক্ষাও না সাহায্যও না যখন বললাম, আমার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী, আমি কোথায় কাকে কীভাবে সাহায্য করবো আমি তো জানিনা! ঢাকা শহরে কোথায় এতিম খুঁজে পাবো এই ক্যাম্পাসে? তারপর অনেক বছর আমি এটা ধারাবাহিকভাবেই পালন করতাম। আমি কোনদিন কাউকে বলিনি কারণ তাকে কেউ যদি ছোট করে কথা বলে আমি মেনেই নিতে পারতামনা। একবার তাকে না পেলে কী অস্থির হয়ে কাঁঠালবাগানে খুঁজতে খুঁজতে তাঁর বাসায় যাই। ছোট একটি চিপা বাসায় ছেলে, ছেলের বউ, নাতীদের নিয়ে তাঁর বসবাস দেখে আসলাম। দুইদিন জ্বরে চারুকলায় যায়নি। আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন। প্রতিবারের মত এবারও টাকা দিলাম। আমারও আত্মা যেন শান্তি হলো। এই স্মৃতিটা আমার খুব মনে পড়ে। দাদুকে শেষ কবে দেখেছি মনে নেই।

দাদু বুকের ভেতর যেন আরেকটি ফাইন আর্টস। এত অল্প পরিসরে দাদুকে লিখে শেষ করা যাবে না।

শৈলীটি ছিল ড্রয়িং এর উপর প্রাচ্যরীতিতে এক ওয়াশ দিয়ে কাজটি শেষ করেছিলাম।। পুরুষ ড্রয়িং আঁকা প্রাচ্যরীতি ধারায় বেশ কঠিন ছিল তখন আমার কাছে।

বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা দাদুর প্রোট্রেট ও ফিগার দেখলে মনে হয় দাদু যেন এখনো দেয়ালের পাশে বসেই মালা বিক্রি করছেন। চারুকলায় গেলেই দেখা পাবো।

সাল ২০০৩
সাইজ ২২”-৩০”
মাধ্যম জলরঙ।

লেখকঃ চিত্রপরিচালক ও চিত্রশিল্পী 

আরও পড়ুন