আধুনিক ফারসি কাব্যে সমাজচিন্তা ও নৈতিক মূল্যবোধঃ ফারসি কবিতার দর্পণ

মীম মিজান

জীবন ও জগতকে চিত্রায়নের মাধ্যম শিল্প। এই শিল্পের আছে অনেকগুলি শাখা-প্রশাখা। তন্মধ্যে কবিতাই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম উল্লেখিত বিষয়াবলীকে নিখুঁত ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলার। আর সেই কবিতায় ইরান তথা পারস্য বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কেননা বিশ্বের মুষ্টিমেয় মহাকবির মধ্যে পাঁচ পাঁচজন এই ইরান তথা ফারসির। তাঁদের কবিতার ভাব সারাবিশ্বের কবিদের উপর স্পষ্টত। তবে সেই মহাকবিদের যুগ পেরিয়ে এখন ফারসি কবিতা আধুনিকতার আঙ্গিকে সজ্জিত। তাই বলে ফারসি কবিতা পিছিয়ে যায়নি। হারায়নি নিজস্ব গতিপথ। বিশ্বসাহিত্যের সাথে মানিয়ে চলে গ্রহণ করেছে এক উৎকর্ষের সিঁড়িপথ।

সেই উৎকর্ষের সিঁড়িপথের যাঁরা প্রোজ্জ্বল আরোহী তাদের কবিতার বিষয়াঙ্গীক, সৌষ্ঠব, পরিণতি ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সম্মানিত সহযোগী অধ্যাপক ড. তাহমিনা বেগম। তিনি নিজে ফারসি অধ্যয়ন করেছেন। ফারসির পঠনপাঠনের সাথে সম্পৃক্ত। তাইতো তার ফারসির জ্ঞান গহীনের। সেই জ্ঞান ও বোধ থেকে তিনি ফারসি কবিতার এক বিশাল পরিক্রমার উপর গবেষণার কাজ সম্পন্ন করেছেন।

তার গবেষণার শিরোনামটি হচ্ছে, ‘আধুনিক ফারসি কাব্যে সমাজচিন্তা ও নৈতিক মূল্যবোধ’। যার কালক্রম ১৯০৬ সাল থেকে ১৯৭৯ তথা ইরানে ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত। এই তেহাত্তর বছরের ফারসি কবিতার গতিপ্রকৃতি, বিষয়াঙ্গীক ইত্যাদির বিশদ বিশ্লেষণ ও গবেষণার কাজই গ্রন্থটি। ফারসি সাহিত্যে আধুনিকতার আগমন বাংলাসাহিত্যের আধুনিকতার প্রায় এক শতাব্দীকাল পরে। কোনো একটি জাতীয় ইস্যু শিল্পের সব অনুষঙ্গকে করে আলোড়িত। শিল্পমানসগণ তাদের শিল্পের মাধ্যমেই করতে চায় প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশ। আর এরকমটি ঘটেছিল ইরানে। সাংবিধানিক আন্দোলনকে ঘিরে সাহিত্যে আগমন করে এক নতুন মোড়। এই মোড়ই নামগ্রহণ করে আধুনিকতা। অবশ্য ফারসি গদ্যও এই আন্দোলনের ফসল।

এই আন্দোলনের স্বপক্ষে কবিতা লিখতে ও ইউরোপীয় ধারার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতেই আধুনিক ফারসি কবিতার কবিগণ ছিলেন সরব। তবে প্রাচীন যে কাব্যের রীতি ও সৌষ্ঠব তা আধুনিক রীতিতে এসে ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে যায়। ইরানে সাড়াজাগানো ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হলে কবিতার ভাবে পরিবর্তন আসে।

উপর্যুক্ত সকল বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ, আধুনিক কবিদের পরিচয় ও তাদের কাব্যের উপর আলোচনা নিয়ে গবেষণাগ্রন্থটি ঋদ্ধ। গবেষণাগ্রন্থটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। মুখবন্ধে গবেষক ফারসি কবিতার উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করে গবেষণাকর্মে যাঁদের সহযোগিতা পেয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। এরপর সূচিপত্র। তারপর বারো পৃষ্ঠার দীর্ঘ এক ভূমিকা। সেখানে পুরো গবেষণার সারাৎসারের প্রাপ্তি ঘটে।

প্রথম অধ্যায়ে ইরানের সমকালীন সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ইরানের অবস্থান, নামকরণ, জাতিগত তথ্যাদি, ভাষা, শাসকগোষ্ঠী, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সফলতা ইত্যাদি স্পষ্টীকৃত। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আধুনিক ফারসি কবিতার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা উত্থাপিত হয়েছে। এখানে গবেষক তাঁর গবেষণার মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন। নিরেট একজন গবেষক হওয়ার জন্য যা যা বৈশিষ্ট্য ধারন করতে হয় তার সবকিছুই স্পষ্ট। সুক্ষ্মদর্শী চিন্তা ও তত্ত্ব-তথ্যের সমাহার এই অধ্যায়টি। এখানে তিনি তুলে ধরেন কবিতার সংজ্ঞা, প্রকরণ, মানের প্রশ্নে গ্রহণীয়-বর্জনীয়, আধুনিক কবিতা কী, ফারসি কাব্যের উৎসমূল, আধুনিক কাব্যের গোড়াপত্তন, ফারসি কবিতার প্রথম কবি, জনক, আধুনিক কবিতার প্রথম কবি, পথিকৃতের অবদান, কাব্যের সামগ্রিক পরিক্রমা ইত্যাদি। কেউ যদি ফারসি কবিতা সম্বন্ধে প্রকৃত ধারনা পেতে বা জানতে চায় তার জন্য এই অধ্যায়টি যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য যে, নতুন কোনোকিছুর অবতারণা হলে প্রকৃত সমঝদার ছাড়া কূপমণ্ডূকরা সেটার ঘোর বিরোধী হয়। সমালোচনার ঝড়ে ধুয়ে দেয় নবতর চিন্তার সেই মানসের কর্মকে। যেমনটি কাজী নজরুল ইসলাম যখন বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক ধূমকেতু হয়ে আবির্ভাব হয়ে পৃথিবীখ্যাত অনন্য ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সৃজন করলেন। তখন সমসাময়িক কিছু কূপমণ্ডূক সেই পরিমাণে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল। যেমনটি একজন সজনীকান্ত রচনা করলেন ‘আমি ব্যাঙ’ নামক প্যারোডি। কিন্তু সেই সজনীকান্ত আজ কোথায় আর নজরুল আজ কোন উচ্চমার্গে! ফারসি আধুনিক কবিতা প্রচলনের প্রারম্ভে এমনটাই ঘৃণার স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। তবে পরে সেই ঘৃণা ছড়ানোর তথাকথিত মানসিক সম্পদের ঐশ্বর্যবানরা হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে। নতুন ধারার ফারসি কবিতা পেয়েছে নব্যগতি ও শ্লাঘ্য রূপ।

তৃতীয় অধ্যায়ে গবেষক আধুনিক ফারসি কবি ও কাব্য বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এ অধ্যায়টি প্রধান দু’টো অনুচ্ছেদে বিভক্ত হয়েছে। প্রথম অনুচ্ছেদে সনাতনী ধারার কবি ও কাব্যপ্রতিভা বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। যে সকল কবিগণ আধুনিক যুগে এসেও সনাতনী ধারার কাব্যচর্চায় নিবেদিত ছিলেন এমন নয়জন প্রখ্যাত আধুনিক যুগের কবির জীবনী, কাব্য, কাব্যের কিছু নমুনা, কাব্যের ভাব, ভাষা, রীতি ইত্যাদি উপস্থাপিত হয়েছে। তন্মধ্যে প্রোজ্জ্বল কবিগণ আল্লামা আলী আকবর দেহখোদা, আরেফ কাজভিনি ও ইমাম খোমেনি উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আধুনিক ধারার কবি ও কাব্যশৈলী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে একত্রিশজন আধুনিক ভাবরীতির কবির পরিচয়, কাব্যধারা, বিষয়বস্তু, কাব্যের নমুনা ইত্যাদি গ্রন্থিত হয়েছে। তন্মধ্যে প্রোজ্জ্বল কবিগণ হচ্ছেন- আধুনিক কবিতার পথিকৃৎ নিমা ইউশিজ, আহমদ শামলু, পারভিন এ’তেসামি, শাহরিয়ার, নুসরাত রাহমানি প্রমুখ। এখানে এসে গবেষক নিমা ইউশিজের সম্পর্কে বিস্তর আলোচনা করেছেন। নতুন ধরনের কবিতার নিরীক্ষণ, সফলতা অর্জন ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে এ পর্যায়ে। কোন পত্রিকার মাধ্যমে আধুনিকতার দ্যূতির বিচ্ছুরণ, কোন কোন সাহিত্য আড্ডার মাধ্যমে লেখকগণ মত বিনিময় করতেন এ বিষয়ে এক প্রাঞ্জল আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবে উত্থাপিত হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে আধুনিক ফারসি কাব্যে সমাজচিন্তা বিষয়ক কাব্য নমুনা ও বিশ্লেষণ আনীত হয়েছে। যা গবেষণা শিরোনামের কিয়দংশ। এখানে সমাজের পরিচয়, উৎপত্তি, ক্রম-বিকাশ, উদ্দেশ্য-লক্ষ্য বিশদভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে আধুনিক ফারসি কাব্যে বিধৃত নৈতিক দিকগুলি আলোচিত হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে নৈতিকতার সংজ্ঞা, সমাজজীবনসহ সামগ্রীরূপে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি সম্যকভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। কুরআন, হাদিস, মনীষীদের বাণীসহ নৈতিকতাকে পুরোপুরিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি পৃথিবী, দেশ, জাতি, সমাজ, পরিবার, ব্যক্তির জন্য এই নৈতিকতায় শ্রেষ্ঠ প্রত্যয় যার মাধ্যমে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ধরায়। তাই গবেষক একাজটির জন্য অকৃত্রিম সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমাদের উচিৎ নিজেকে নৈতিকতার পাঠ শেষে তা মেনে চলা। সে হিসেবে এই গবেষণাকর্ম খুবই প্রাসঙ্গিক ও জরুরি। গবেষক তার ভাষা প্রয়োগে থেকেছেন সাবলীল। শব্দচয়ন করেছেন সর্বজন বোদ্ধ। উপস্থাপনায় রেখেছেন চমৎকারিত্বের ছাপ। গবেষণাগ্রন্থটি পাঠে ফারসি কবিতার প্রকরণ তথা- কাসিদা, গজল, মাসনবি, কেতয়া, রুবাঈ ইত্যাদির বিষয়ে জানা যাবে। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের শেষে সংযুক্ত করেছেন তথ্যসূত্র ও টীকা। গ্রন্থটি গবেষক তার জ্ঞান আর সম্পদের মধ্যে আরেক প্রাচুর্য সন্তানদ্বয় মাহিরা তাহসিন ও তাহমিদ আদনানকে উৎসর্গ করেছেন।

প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০১৯ প্রকাশক: পরিলেখ প্রচ্ছদ: আলী মেসবাহ মূল্য: ৪৫০ টাকা

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক

আরও পড়ুন