ভৌতিকঃ সে (পর্ব ১)

মৌলী আখন্দ

তখন আমি মেডিকেল কলেজে পড়ি। ফার্স্ট প্রফ পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি গেছি। রেজাল্ট আউট হওয়ার প্রতীক্ষায়। কী মনে করে কংকালটা নিয়ে গেলাম সাথে করে, আজও জানি না। হয়ত বাসায় সবাইকে দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছা কাজ করছিল মনে। বাসায় কেউই এর আগে কংকাল দেখেনি। কংকাল কিনেছি হোস্টেলে এসে, এক বড় আপুর কাছ থেকে। এটাই নিয়ম। এই যে আমি প্রফ দিলাম, রেজাল্ট বের হওয়ার পর পাস করলে আমিও আমার কংকাল বিক্রি করে দেব নতুন ফার্স্ট ইয়ার আসার পর। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে।

ওঃ, আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি আপনাদের। আমি রানা। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তো, সেবার বাড়ি আসার পর সবাই মিলে খুব চেপে ধরল সামনের অনুষ্ঠান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে একটা অনুষ্ঠান করতে হবে।

আসলে আমি আমাদের পাড়ায় একটা নাট্যদল খুলেছিলাম। নাম “প্রতিবিম্ব”। সেখান থেকে আমরা “অবাক জলপান”, “কবর”, “রক্তাক্ত প্রান্তর”, “ডাকঘর” মঞ্চস্থ করে খুব প্রশংসা পেয়েছিলাম। আমি মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়ে হোস্টেলে চলে যাওয়ার পর সবকিছু ঝিমিয়ে পড়েছিল। নাট্যদল নতুন কোনো নাটক মঞ্চস্থ করেনি। আর তাই আমাকে এতদিন পর ফিরে পেয়ে ওরা নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। সবার উৎসাহ পেয়ে আমি ঠিক করলাম এবার নতুন নাটক লিখবো। নাম “একাত্তরের ঘাতক “। মনে মনে ঠিক করলাম শেষ দৃশ্যে সারা মঞ্চ জুড়ে একটা বধ্যভূমি হিসাবে দেখাবো আর সেখানে আমার কংকালের হাড়গোড়গুলো ছড়িয়ে রাখবো। এমন করে যেন মনে হয় এটা বধ্যভূমি। আর সেখানে সাদা শাড়ি পরে হঠাৎ হাজির হবে আমার চাচাত বোন ঐশী। ঐশী কলেজে যায়, সেকেণ্ড ইয়ারে উঠেছে সেবার। পড়াশোনার চাপ থাকলেও আমার নাট্যদলের প্রধান নারীচরিত্র তার জন্য বাঁধা ছোটবেলা থেকেই। এবারের নাটকেও তার ব্যতিক্রম হল না।

মূল নাটকের দিন সবকিছু ঠিকমতোই এগুচ্ছিল। পর্দা টানার পর মঞ্চজুড়ে আমার কংকালের টুকরা টুকরা হাড়গোড়গুলো ছড়িয়ে দিলাম। এর মধ্যে দেখলাম মাথার খুলিটা নেই। কিন্তু তখন আর খোঁজাখুঁজি করার মত সময় ছিল না। সময় মাত্র তিরিশ সেকেণ্ড। এর মধ্যেই যা করার করে পর্দা সরিয়ে মঞ্চ উন্মুক্ত করে দিতে হবে দর্শকদের সামনে। পরিকল্পনামত দুপাশে লাইটিং আর ধোঁয়া দিয়ে আবহ তৈরি করার পর হঠাৎ করেই সাদা শাড়ি পরে ঐশী মঞ্চে আবির্ভূত হল পেছন থেকে, যেমনটা কথা ছিল। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী আমি আঁতকে উঠে বললাম, “কে? কে আপনি?”

স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ঐশীর এখন বলার কথা, “আমি সেলিনা, সাংবাদিক সেলিনা পারভিন। একাত্তর সালে এখানেই হত্যা করা হয়েছিল আমায়। ” কিন্তু ঐশী তা বলল না। তার বদলে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল। খনখনে গলায় বলল, “কে আমি? এই কংকালটা আমার!”

অজানা ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল আমার মেরুদণ্ড বেয়ে। ঐশী কি সংলাপ ভুলে গেছে?

ঐশী অপ্রকৃতিস্থ ভঙ্গিতে মঞ্চে হাঁটু গেড়ে বসে একটা একটা করে হাড় তুলে তুলে দেখতে লাগলো। এপাশ থেকে প্রম্পটার প্রম্পট করতে শুরু করল, “ঐশী, বল, আমি সাংবাদিক সেলিনা পারভিন, একাত্তরের শহীদ!”

কিন্তু ঐশীর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল না সে প্রম্পট করা সংলাপ শুনতে পাচ্ছে বা সেদিকে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা আছে। সে একইভাবে বসে থেকে পাগলের মত হাড়গোড়গুলো তুলে তুলে দেখতে লাগলো।

আমি আর থাকতে না পেরে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রায় বারো বছর ধরে ওর সাথে নাটক করছি আমি। কোনো দিন এমন হয়নি তো! ওকে সংলাপ মনে করানোর জন্য আবার ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জোর গলায় একই সংলাপ দ্বিতীয়বার বললাম, “কে? কে আপনি?”

ঐশী ঝট করে মুখ তুলে তাকাল। আমি আতঙ্কে পিছিয়ে গেলাম।

এ ঐশী নয়! গায়ের কাপড়টাও সাদা শাড়ি নয়, অনেকটা কাফনের মত দেখাচ্ছে।

সাদা কাফনের কাপড়পরা মেয়েটি বসে থেকেই ধকধকে চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। আমি চাপা গলায় বললাম, “ঐশী কোথায়! আর আপনি কে!”

মেয়েটি অডিটোরিয়াম ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “বললাম না, আমি এই কংকালের মালিক! এটা আমার কংকাল! আমার -আমার -আমার!”

মঞ্চের সামনে বসে থাকা দর্শকদের উপস্থিতি পুরোপুরি ভুলে গিয়ে আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “আপনার মানে? আমি এটা পয়সা দিয়ে কিনেছি!”

খল খল করে হাসতে শুরু করল মেয়েটি। “আমার মানে, এই কংকালটা আমার শরীরে ছিল, যখন আমি তোমার মত হেঁটে বেড়াতাম!”

আমি পিছিয়ে গেলাম। দুর্বল কণ্ঠে বললাম, “কী পাগলের মত কথা বলছেন আপনি!”

“পাগল, না?” মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। আলুথালু চুল ছড়িয়ে পড়ল সারা পিঠজুড়ে, কিছুটা মুখের সামনেও এসে পড়ল। “আমি রাতের বাসে চাকরিতে জয়েন করতে যাচ্ছিলাম, বাসায় আমার ছোট ভাই ছিল, মা ছিল! বাসের জানোয়ারগুলি আমাকে বাঁচতে দিল না!”

আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

“আমার মায়ের অনেক পয়সা ছিল না, তাই আমাকেও কেউ খুঁজে পেল না। আমি হয়ে গেলাম বেওয়ারিশ লাশ! আর তুমি এখন আমার কংকাল দিয়ে পড়াশোনা কর! আর আমার কংকাল এভাবে ছড়িয়ে রেখেছ নাটক করার জন্য? ”

আর কিছু মনে নেই আমার।

(চলবে)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন