ভালোবাসার ডিম

 

দেশে থাকতে আমি যখন বাজার করতাম, একটি ছেলের কাছ থেকে নিয়মিত ডিম কিনতাম। সপ্তাহে দুদিন বাজার করতাম – বৃহস্পতি আর রবিবার। শুক্রবারে আমার কখনো বাজার করা হয়ে উঠেনি।

কলেজ জীবন থেকেই শুক্রবার আমার জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম দিন। শুক্রবারে আমার কাজের শেষ নেই। প্রথমেই নিজের কাপড়চোপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা। আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করা, ফুপাতো বোনদের যাদের বিয়ে হয়েছে সবাইকে পালাক্রমে দেখতে যাওয়া, কোনো শুক্রবারে গ্রামে যাওয়া, কখনও আবার খালাদেরকে দেখতে যাওয়া। এক ফুপাতো ভাই ঘটনাচক্রে বিদেশ চলে গেলেন হঠাৎ করে, ছোটছোট দুটি মেয়ে রেখে। ওরা আমার জন্য অপেক্ষা করতো। ওদেরকে দেখতে যাই পাশাপাশি টুকিটাকি কাজ যেগুলো ওদের মা একা করতে পারতেননা সেগুলো করে দিয়ে আসি। মাস্টার্সের শেষের দিকে দরিদ্র কিছু ছেলেমেয়েদেরকে মেট্রিক পাশ করানোর প্রতিজ্ঞা করলাম – শুক্রবারে ফ্রি কোচিং আমার শিডিউল আরো টাইট হয়ে গেলো। শুক্রবারে বিকাল তিনটায় সবাই যখন দলবেঁধে বাংলা ছায়াছবি দেখার জন্য বিটিভির সামনে হুমড়ি খেয়ে পরে আমি তখন শহরের এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরে বেড়াই। আমার শুক্রবারের ব্যস্ততা বেড়েই চলছে। যার কারণে বৃহস্পতিবারেই বাজার সদাই করতাম।

একদিন বাজার করে বাসায় ফেরত আসছি। রিক্সাভাড়া বাঁচানোর জন্য প্রায়শই হেঁটে আসি। বাজারের পরিমাণ খুব বেশি নাহলে পারতপক্ষে রিক্সা নেইনা। বাজারের জাংশান থেকে বেশ দূরে আসার পর মেইন রোড থেক একটি গলি ঢুকেছে যা আমার বাসা পর্যন্ত পৌঁছেছে আনুমানিক তিন কিলোমিটার। দুই হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি যেখানে গলির ভেতরে ঢুকবো সেখানে গলির মুখে একটি গাছের নীচে প্রায় অন্ধকার একটি জায়গা। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো কোনরকমে একটু পৌঁছায়। আবছা অন্ধকারাচ্ছন্ন এই জায়গাটিতে দুটি কূপি জ্বালিয়ে কিশোর একটি ছেলে বসেছে ডিম নিয়ে। কত আর হবে বয়স? বড়জোর ১৩/১৪। কুচকুচে কালো গায়ের রঙ, শরীরে ময়লা কাপড়চোপড় নিয়ে বসে আছে খালি পায়ে। অদ্ভুত মায়াবী একটি চেহারা ছেলেটির। সাথে তার এসিস্টেন্ট হিসেবে আছে আরেকটি ১০/১১ বছরের ছেলে। ঠেলাগাড়ির মতো একটি নড়বড়ে কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে তার ভাসমান ডিমের দোকান। ওর ডিমের দোকান দেখেই আমার মনে পড়লো ডিম কেনার কথা আমি ভুলে গেছি। আমি ওর কাছ থেকে দুই হালি হাঁসের ডিম কিনলাম।

এরপর থেকে যতদিন বাজার করি ওর কাছ থেকে দুই হালি ডিম কিনি। এমন একটি অলিখিত সম্পর্ক স্থাপন হলো ছেলেটির সাথে বৃহস্পতিবারে সন্ধ্যায় আমি যখনই গিয়ে ওর দোকানের সামনে দাঁড়াই সে কোনো কথা নাবলেই আমার হাতে একটি কাগজের ঠোঙা ধরিয়ে দিয়ে বলে – স্যার, আপনার ডিম। প্রতি বৃহষ্পতিবারে সে আগে থেকেই ডিম প্যাক করে আমার জন্য অপেক্ষা করে আমি যাওয়া মাত্রই হাতে তুলে দেয় ডিমের ঠোঙা। ছেলেটির এহেন ব্যবহারে আমি মায়ায় পরে গেছি। কখনও ডিমের দরকার নাহলেও আমি জানি সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, আমি যাই এবং ডিম নিয়ে আসি। সে সবসময় আমার জন্য দুই হালি ডিম আলাদা করে রেখে দেয়।

বয়স কম হলেও সে খুব স্মার্ট। এত সুন্দর করে কথা বলে যেকোনো মানুষের মনে মায়া লাগবে। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার এই বয়সে স্কুলে থাকার কথা, তুমি ডিমের ব্যবসা করো; তোমার বাবা কোথায়?”

– স্যার, আমি স্কুলে যেতাম। বেশি দূরে নয়, কাছেই একটি বস্তিতে থাকি। বাবা রিক্সা চালাতেন। গতবছর একটি ট্রাকের নীচে চাপা পরে বাবা পঙ্গু হয়ে গেলেন। আমার আর কোনো উপায় রইলোনা। এই ছোটভাইকে সাথে নিয়ে ডিমের ব্যবসা করে সংসার চালাই। তবে স্যার, দোয়া করবেন – আমার বড় বোনটি এখনও স্কুলে যায়, আমি ওর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হতে দিবোনা। ও মেয়ে মানুষ, কী করবে? আমিই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম। বোনটি পড়ুক।

সে একদিন আমাকে বললো, “স্যার, আমি সেরা ডিমগুলোই আপনাকে দেই। এরপরও যদি কোনদিন আমার কোনো ডিম নষ্ট পান আপনি আমাকে বলবেন, আমি বদলা ডিম দিয়ে দিবো।”

ডিম কীভাবে বিক্রি করতে হয় সেটিকে একটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে ছেলেটি। এত দ্রুত সে ডিম তুলে প্যাক করে মনে হয় যেনো কোনো মেশিন চলছে। হিসেব নিকেশেও খুব চটপটে। চটজলদি হিসেব করে টাকার লেনদেন খুবই দক্ষতার সাথে করে। যত দিন যাচ্ছে আমি ওর মায়ার বাঁধনে আরো বেশি বেশি জড়িয়ে যাচ্ছি।

আমার পাড়ার আরো দুয়েকজন যারা নিয়মিত বাজার করেন, আমার সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তাদেরকে বললাম এই ছেলেটির কাছ থেকে ডিম কিনতে। সবাইকে তার জাদুকরী ব্যবহার দিয়ে এতটাই মুগ্ধ করে ফেললো কয়েক মাসের ভেতরেই দেখি মানুষ লাইন ধরে তার কাছ থেকেই ডিম কিনে। বাজার থেকে বেশ দূরে হেঁটে এসে কিশোর ছেলেটির কাছ থেকে ডিম কিনে সবাই যেনো একটি তৃপ্তির হাসি উপহার দেয়। একদিন অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম তার ডিমের ব্যবসা। সে এতটাই ব্যস্ত আমাকে দেখতেই পায়নি। অনেক্ষণ পরে কাছে গিয়ে বললাম, “কী ব্যাপার? তোমার ব্যবসাতো জমে গেছে হে।”
সে অমায়িক একটি হাসি দিয়ে বললো, “স্যার, উপরে আল্লাহ্ নীচে আপনি। আপনি যতজনকে নিয়ে এসেছেন ওনারা সবাই আরো কাস্টমার এনে দিয়েছেন আমাকে। সবাই আমার নিয়মিত কাস্টমার। আল্লাহ্ মেহেরবান, আমার সংসার চলে যাচ্ছে স্যার।”
তার এই প্রশস্ত, কৃতজ্ঞতা মাখা হাসি দেখে আমার হৃদয় সিক্ত হয়ে উঠলো। গড়িয়ে দিতে দিলাম দু’ফোঁটা চোখের জল। তাকে বললাম, ” এ তোমার সততা আর পরিশ্রমের ফল। তুমি সৎভাবে পরিশ্রম করছো তাই আল্লাহর অনুগ্রহ তোমার উপর বর্ষিত হচ্ছে।”

আত্মীয়দের ভেতরে এবং পাড়ার কয়েকটি বিয়েতে ডিম সাপ্লাই দেবার কন্ট্রাক্ট দিলাম ওকে। আলহামদুলিল্লাহ! তার সার্ভিসে এবং ব্যবহারে সবাই এত সন্তুষ্ট যে সবাই বলছে তাদের পরিবারের সব বিয়েতে এই ছেলের কাছ থেকেই ডিম নিবে। আমাকে দেখলেই সে কৃতজ্ঞতায় একেবারে নুয়ে পরে। সারাক্ষণ স্যার স্যার করে। একদিন ধমক দিয়ে বললাম:
– তুমি আমাকে স্যার ডাকো কেন?

– স্যার, আমি সব কাস্টমারকেই স্যার ডাকি। তবে আপনাকে স্যার ডাকি অন্য একটি কারণে। কারণটি এখন বলবোনা। পরে একদিন বলবো।

কিছুদিন পরে খুব বেশি অসুস্থ হয়ে গেলাম। প্রচন্ড জ্বর, মাথা ধরা। শরীরে শক্তি বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। বেশ কিছুদিন যাবৎ বিছানা থেকে উঠতে পারছিনা। সবচেয়ে বেশি টেনশন করছিলাম কোচিং এর ছাত্রছাত্রীদেরকে নিয়ে। দরিদ্র এই বাচ্চাগুলিকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছি, যেকোনো মূল্যে ওদেরকে মেট্রিক পাশ করাবো। সামনে ওদের পরীক্ষা। আমি উঠে দাঁড়াতেই পারছিনা, ক্লাস নেব কীভাবে? ওদের জন্য খুবই টেনশন নিচ্ছিলাম বিছানায় শুয়ে শুয়ে। ছোটভাই এসে বললো- একটি ছেলে এসেছে তোমার সাথে দেখা করতে। তুমি নাকি তার কাছ থেকে সবসময় ডিম কিনো?

আমি হতবাক হয়ে গেলাম! সে এসে লম্বা একটি সালাম দিয়ে বললো, “স্যার, আপনি বৃহস্পতিবারে ডিম কিনতে আসেননি, তখনই বুঝেছি আপনি অসুস্থ। জিজ্ঞেস করে করে আপনার বাসা খুঁজে বের করেছি। আপনাকে সবাই চেনে তাই কোনো সমস্যা হয়নি আপনার বাসা খুঁজে পেতে।”

এই নিন আপনার ডিম বলেই একটি কাগজের ঠোঙা রাখল আমার পাশে। আরেকটি পলিথিনের ব্যাগ দেখিয়ে বললো – এখানে দুটি কচি মুরগী আছে। আমি জবাই করে একেবারে পরিষ্কার করে এনেছি। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান। এগুলো খাবেন তা না হলে আপনার স্টুডেন্টসদের পড়ানোর জন্য শক্তি আসবে কোথা থেকে?

আমি চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কোচিং করাই তুমি কীভাবে জানলে?”

– স্যার, আমার বড় বোনও আপনার ফ্রি কোচিং এ পড়ে। ওরা সবাই আপনার সুস্থতার জন্য দোয়া করছে। ওরা আপনাকে সালাম দিয়েছে।

ছোটবোনকে ডেকে বললাম ওকে নাস্তা দাও। মুরগী এনেছে আমার জন্য উপহার হিসেবে এগুলো ফ্রিজে রাখো আর দুই হালি ডিমের দাম ওকে দাও। বোন এসে বলল ডিমতো ভেতরে তিন হালি, দুই হালির দাম কেন দিবো? আশ্চর্য! আমি সবসময় দুই হালি করে ডিম কিনি সে তিন হালি কেন আনলো?
আমার বোন আকাশ থেকে পরে বললো, “কী বলছো? গত দুইমাস যাবত তুমি প্রতিদিনই তিনহালি করে ডিম আনছো। আমিতো ঠোঙা খুললেই তিন হালি ডিম পাই।”

আমার জন্য বোধহয় আশ্চর্য হবার আর কিছু বাকী নেই! গত দুইমাস যাবত প্রতিবারই সে ঠোঙার ভেতরে একহালি ডিম বাড়তি দিচ্ছে বিনামূল্যে। একারণেই আমি যাবার আগেই ঠোঙা বেঁধে রেখে দিতো। এই ভালোবাসার প্রতিদান আমি কী দিয়ে দিবো! অসুস্থ না হলেতো জানতেই পারতামনা একটি কিশোর ছেলে কী প্রচন্ড ভালোবাসা তার অন্তরে লালন করে! আর কত ভালোবাসা চাই জীবনে? আমার ভালোবাসার ডিম যে এভাবে বাচ্চা ফোটাবে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি!

 

 

মনসুর  আলম- কবি,সাহিত্যিকও মডারেটর মহীয়সী  

আরও পড়ুন