বনৌষধি (লাল মাটির গল্প)

নুরে আলম মুকতা

বিশাল প্রান্তর । চারিদিকে শুধু ক্ষেত আর ক্ষেত । জলাশয় মাঝে মাঝে । ক্ষেতের মধ্য দিয়ে যে রাস্তাগুলো গিয়েছে এগুলো দিয়ে একটি গোরুগাড়ি যেতে পারে কোনমতে । রাস্তার দুধারে সারি সারি তাল গাছ । মাটির এত পুষ্টি যে গাছগুলো অযত্ন অবহেলায়ও লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে । শাখাগুলোর চির হরিৎ বর্ণ দৃষ্টির তেজ বাড়িয়ে দেয় । শীতকালে রাস্তাগুলো বড় চমৎকার থাকে। কিন্তু বর্ষাকালে পা ফেলা দুষ্কর !এমন পিচ্ছিল হয়ে যায় যে ,ঐ মাটির মানুষ ছাড়া কেউ আর ঐ পথে হাঁটতে পারে না। চৈত্র-বৈশাখে খরার সময় মাটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় । ভুমি পুত্র কন্যারা জানে কেমন করে এ শক্ত ঢেলা গুড়ো করে সোনা ফলাতে হয়। চৈত্রের সূ্র্য্য বেলা বাড়ার সাথে সাথে ক্ষেপে ওঠে । হারু ওং ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি তার আগে জমিতে সেচ দিতে এসেছে । ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে ওর । জলাশয়ের জল ছাড়া আর কিছু নেই । বার বার দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেখছে শিপ্রা রানী আসছে কি না । ও বহুদুর পথ অতিক্রম করে স্বামীর জন্যে খাবার নিয়ে আসবে । শক্ত বাঁধনের শরীরে কোমরে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে শিপ্রা এলে হারুর সমস্ত ক্ষুধা মিটে যাবে । ওর ব্লাউজ বিহীন শরীরের দিকে তাকিয়ে হারু জাঁত থেকে নেমে আসবে। থেমে যাবে পানি সেচা জাঁতের কঁ কঁ শব্দ ।

আলের ধারে বসে শিপ্রার আনা ভাত আর পোড়া লঙ্কা খেয়ে হারু তৃপ্তির ঢেকুর তুলে । ও দুরের রাস্তায় দেখে পাশের গাঁয়ের সেকু রক্ষিতেরা কোথায় যেন যাচ্ছে । হারু হাঁক ছেড়ে বলে , তোরা কুন্ঠে যাছিস হে ? ওরা ছয় ভাই এর মধ্যে একজন জবাব দেয় , বাপুর বিহা দিতে যাছি । রক্ষিতেরা ছয় ভাই ওদের বাবাকে সামনে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারুর ডাক শুনে থমকে দাঁড়ায় । ওরা বলে, যুদ্ধের বছর শহরের লোকজন সব হামাদের গাঁয়ে চলে এলো । তো হামরা কুন্ঠে যাবো ? কামও নাই, খাবারও নাই । তাই হামরা জঙ্গলের ভিতরে চলে গেনু । সাঁতাল মানুষ হামরা মনে করনু খানার অভাব হবে না । ক্ষুধা লাগলে কচু-ঘেঁচু যা পাই তাই খাই । তো হামার বাপ কি যে খেয়ে লিলো ওর চুলও পাকে না,বুড়াও হয় না । মরতে মরতে চার মা মরে গেলো । হামরা বুড়া হয়ে গেনু ,চুলও সব শোন পাকা পেকে গেলো । হাসতে হাসতে শিপ্রা ক্ষেতের আলের ওপর লুটিয়ে পড়ে । রক্ষিতেরা বলে , হামরা বাপুর বিহা দিতে যাছি ।

লেখকঃ সাহিত্যিক,কলামিস্ট ও অ্যাডমিন, মহীয়সী  

১৪ ,০৯ ,২০২০

আরও পড়ুন