আল মাহমুদের সাহিত্যমানস

ড. ইয়াহ্ইয়া মান্নান

আল মাহমুদের (জন্ম: ১১ জুলাই ১৯৩৬-মৃত্যু: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) সৃষ্টিশীল মেধার বিকাশ বিচিত্রমুখী। অর্থাৎ কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনীসাহিত্য, ভ্রমণসাহিত্য, থ্রিলার প্রভৃতি। তাঁর রচিত সাহিত্য কর্মে যে জীবন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে দুটি পর্বে বিভক্ত করা যায়।
প্রথমত : লোক-লোকান্তর থেকে সোনালিকাবিনপর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো থেকে ইতিহাস দেখ বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে (মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রচিত সাহিত্য কর্ম) পর্যন্ত।

প্রথম পর্বে লেখকের মানস ছিল প্রধানত সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় উজ্জীবিত, যেখানে তিনি বলেছেন-
শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত
হিয়েন সাঙের দেশে শান্তি নামে দেখ প্রিয়তমা
… … … … … … … … … … …
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ।
(সোনালিকাবনি : ১০/সোনালিকাবিন)
আল মাহমুদের প্রথম পর্বের রচনায় রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সমাজতন্ত্র উপস্থাপিত হলেও গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও লোকজ ঐতিহ্যেও সফল রূপকার হিসেবেই তিনি খ্যাতিমান। তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের মানানসই ব্যবহারও তাঁকে কাব্য সাহিত্যে স্মরণীয় করে রেখেছে। জসীমউদ্দীন বা জীবনানন্দ দাসের প্রতিধ্বনি বা প্রতিচেতনা নয়, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়েই তিনি উপস্থিত হয়েছেন বাংলা কাব্যাঙ্গনে।

মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো থেকে আল মাহমুদের চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পরিবর্তে তিনি ইসলামী জীবন দর্শনে দীক্ষিত হন। যা তাঁর সোনালিকাবিন উত্তর রচনাবলিতে প্রকাশ পেয়েছে। কবি বলেছেন-
আমি কু-লীকৃত কালো ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে
ধ্বংসের ওপর রেখে আসা আল্লাহর আদেশ
বুকে তুলে নিলাম…
আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যাক্ত পাথরে
আল্লার আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি
ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম।
(মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো : মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)
আল মাহমুদের আদর্শিক ঐতিহ্যপ্রীতি পরিস্ফুটিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), অদৃষ্টবাদীদের রান্না-বান্না (১৯৮০), বখতিয়ারের ঘোড়া (১৯৮৬), মিথ্যাবাদী রাখাল (১৯৯৩), আমি দূরগামী (১৯৯৪) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায়।
আল মাহমুদের দুটি শ্রেষ্ঠকবিতা ‘হযরত মুহম্মদ’ ও ‘নাত’। মানবতার মুক্তির দিশারী হজরত মুহাম্মাদ স.কে নিয়ে বাংলা সাহিত্যেও মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে উল্লেকযোগ্য সংখ্যক শিল্প সফল সাহিত্য রচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ও আধুনিক যুগে গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কবিগণের বিশ্বাস, অনুভূতি, চেতনা ও ভালবাসা মুহাম্মাদ স.কে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। মুহাম্মাদ স. এর মহিমা, জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব ও মহাকালিক ব্যাপ্তি নিয়ে আল মাহমুদ অকপটে উচ্চারণ করেন:
লাত্-মানতের বুকে বিদ্ধ হয় দারুণ শায়ক
যে সব পাষাণ ছিল গঞ্জনার গৌরবে পাথর
একে একে ধসে পড়ে ছলনার নকল নায়ক
ঈাথর চৌচির করে ভেসে আসে ঈমানের স্বর।
লাঞ্ছিতের আসমানে তিনি যেন সোনালি ঈগল
ডানার আওয়াজে তাঁর কেঁপে ওঠে বন্দীর দুয়ার
ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় জাহেলের সামান্য শিকল
আদিগন্ত ভেদ করে চলে সেই আলোর জোয়ার।
(মোহাম্মদ / অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)
হজরত মুহাম্মাদ স. এর আগমনের মুহূর্তকে আরববিশ্বের অন্ধকার যুগবলা হয়। মানবতার চরম অপমান, লাঞ্ছনা, বিশৃঙ্খলা ও সীমাহীন পাপে জর্জরিত এক সমাজ ও সময়ে তাঁর আবির্ভাব। অতঃপর মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে এক সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নবজন্ম সাধিত হয় তাঁরই করস্পর্শে। আরববিশ্ব ছাড়িয়ে সমগ্রবিশ্বে ‘সেই আলোর জোয়ার’ প্লাবন সৃষ্টি করে। সেই মহাপুরুষের জীবনীগ্রন্থও রচনা করেছেন আল মাহমুদ।

কবি বিশ্বজগতের সৌন্দর্য, জীবন ও প্রকৃতির মাঝে স্রষ্টাকে খুঁজে পেয়েছেন। স্ট্রষ্টা অবিনশ্বর ক্ষমতা ও মহিমাময় চালিকা শক্তিকে তিনি অভিবাদন জানিয়েছেন। মহান স্রষ্টার অদৃশ্য শক্তিকে যাঁরা অস্বীকার করে, তাদের মুখে চপেটাঘাত করেছেন। মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি, স্থায়িত্ব ও চলমান ক্ষমতা যে একমাত্র তাঁরই দান, এ বিষয়ে তাঁর কোন দ্বিধা নেই। তাঁর ভাষায়-
তোমাকে ডেকেছি বলে আমি
নড়ে ওঠে জগত জঙ্গম
পর্বতও পাঠায় সেলামি
নদী ফেলে সাগরে কদম।
… … … …
ভাগ্যের অদৃশ্যে বসে যিনি
ঠিক রাখে আত্মার বাদাম
আমি ঠিক চিনি বা নাচিনি
তারই প্রতি অজস্র সালাম।
(ডাক / আরব্য রজনীর রাজহাঁস)
সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবণিক গল্পগ্রন্থের বিভিন্ন গল্পে; যেভাবে বেড়ে উঠি, ডাহুকী, কবি ও কোলাহল উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রে ও সংলাপে তিনি ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই আদর্শিক পরিবর্তন সম্পর্কে নিজেই বলেছেন:
আমার মনে আদিম মানুষের মত অতিশয় প্রাথমিক এক জিজ্ঞাসা জাগে কে তুমি আয়োজক? তুমি ও কবি? না
কবিরও নির্মাতা? তবে তুমি যে অনিঃশেষ সুন্দর আমি তা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করো প্রভু।
এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মেও সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কুরআনে এসে উপনীত হয়েছি। …
ফররুখ আহমদকে একঘরে করে রাখা, তার সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সাহিত্যিক পরিণাম জানা সত্ত্বেও
ইসলামকে আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি।
(‘আমি ও আমার কবিতা’, দৈনিকসংগ্রাম, ১৪ জুলাই, ১৯৯৫, ঢাকা)

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আল মাহমুদ জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ সম্পাদনার মাধ্যমে পেশা জীবন শুরু করেন। গণকণ্ঠ ছিল তৎকালীন সরকার বিরোধী একমাত্র পত্রিকা। পত্রিকা সম্পাদনার সূত্রে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করেন। কারাগারে অবস্থানকালে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের তুলনামূলক অধ্যয়নে ঐশী মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ফলে তাঁর মতাদর্শগত পরিবর্তন ঘটে।
আল মাহমুদের কাব্যচর্চার প্রথম দিকের বন্ধুমহল, যাঁরা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী; তারা তার এই কেন্দ্র পরিবর্তনের বিষয়কে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলারই তার এই মত পরিবর্তনের প্রধান কারণ। তিনি তাদের এই মতকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন-
আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অলৌকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। মার্কসবাদ সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ
হয়ে। আমার এই অগ্রগতির জন্য কোন রূপ পেট্রোডলঅর পাইনি। কোথায় পাবো, কে আমাকে এমন মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রা শুধু ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্যই দেবে? আমি মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, মানব প্রজাতির শ্রম ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিস্ময়কর ব্যাখ্যা, শ্রেণীদ্বন্দ্ব ও পুঁজিগঠনের দুঃসাহসিক র্বণনার সাথে উদ্বৃত্ত পুঁজির কেন্দ্রীভূত হওয়ার গূঢ় কারণ সমূহের পঠন-পাঠন একদা গভীর অভিনিবেশ সহকারে করে ছিলাম বলেই পবিত্র কুরআন হৃদয়াম করা সহজ হয়েছে।

আল মাহমুদ বিশশতকের আশির দশক থেকে উপন্যাস রচনায় হাত দিলে তার উপন্যাসে এই মতাদর্শগত চিন্তা- চেতনা প্রতিফলিত হলেও তা কখনো মুখ্যভাবে পরিস্ফুটিত নয়। জীবনের একটি অনুষঙ্গ হিসেবে ধর্ম বা ইসলামী জীবনাদর্শ এসেছে ঠিকই, তবে মানবজীবনের বৃহত্তর আঙিনাই এখানে প্রধান। সম-সাময়িক জীবন যাত্রা, বাঙালির গৌরবময় ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধের সফল রূপায়ণ এবং নর নারীর সম্পর্ক বিশ্লেষণই তাঁর উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য।

 

আরও পড়ুন