ও.বি.ই. (আউট অব বডি এক্সপেরিয়েন্স)

হাসিবুর রহমান ভাসানী

আচ্ছা,আপনার সাথে এমনটা ঘটেছে কখনো,
যেমন ধরুন,আপনি আপনাকেই দেখতে পাচ্ছেন; মানে আপনারই সামনে আর একটা আপনি। আয়নায় নয় বাস্তবেই।
ভয় পাবেন নিশ্চয়ই কিংবা ধরে নেবেন ভূত প্রেত অথবা আপনার আত্মা আপনার সামনে হাজির।

নাহ,এর কোনোটিই নয়।
এটি হচ্ছে Out-of-Body Experience সংক্ষেপে OBE.

Out-of-body experience বাংলাতে দাঁড়ায়,সশরীরে উপস্থিত না থেকেও কোথাও অবস্থান করার অনুভূতি/অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে মানুষ এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়।

ইংলিশ অভিনেতা স্টিফেন গ্রাহামকে তো অনেকেই চিনেন,তিনি নিজেও OBE এর সম্মুখীন হয়েছিলেন আঠেরো বছর বয়সে।
তিনি তার মা এবং বাবার সাথে স্টেজে একটা নাটক করছিলেন।
হঠাৎ তিনি তার অবিকল আর একটা নিজেকে দেখতে পেলেন স্টেজের সামনে দর্শকদের সাথে কথা বলছেন।
তার ভাষ্যমতে তার সাথে এটা অনেকবার ঘটেছে।

১৯৮৪ সালের জুলাইয়ে Journal Society of Psychial Research এর একটা প্রতিবেদনে OBE এর সম্মুখীন হওয়া একজন ব্যক্তি,তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
“হঠাৎ আমি নিজের দুটো অস্তিত্ব দেখতে পাই,
একটাতে আমি সোফায় অনুভূতিহীনভাবে বসে আছি আর অন্যটা দেখতে পাচ্ছিলাম একটু সামনেই যে নড়াচড়া করছিলো।
আসলে ওই সময়টাতে আমি মূলত সোফাতেই বসা ছিলাম।”
গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি দশ জনে একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় এক বা একাধিকবার OBE এর সম্মুখীন হন।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কি জন্য হয় এটা বা কখন হয় ?
অবশ্যই উত্তর আছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এটা ঘটে আর কিছু ক্ষেত্রে নিজের কর্মদোষে।

স্বাভাবিকভাবে যেগুলো হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা হচ্ছে,
যখন আপনি ঘুমাবেন,মানে গভীর ঘুমে নিমগ্ন হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে।
অথবা হতে পারে আপনি কোথাও ঘুমোচ্ছেন তবে আশেপাশে শব্দ কিংবা অন্য যে কোনো কারণে ঘুমটা ঠিকঠাক হচ্ছেনা বা আধোঘুম ভাব বিরাজ করছে,ঠিক তখনই আপনার একটা জেরক্স কপি সে অন্য কোথাও গিয়ে কিছু একটা করছে,করছে বললে ভুল হবে তবে আপনি অনুভব করতে পারছেন কিংবা আপনার ওই জেরক্স কপি যেখানে গিয়েছে সেখানের সবকিছু আপনি একদম জীবন্ত দেখতে পাচ্ছেন বা আপনার সামনেই সে ঘোরাঘুরি করছে।

আর একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে,যখন আপনি খুব গুরুতর একটা অ্যাকসিডেন্ট করলেন এবং আপনার ব্রেইন এ ভারী আঘাত লাগলো,আপনি দীর্ঘ সময়ের জন্য অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
ঠিক ওই সময়টাতে অধিকাংশ মানুষই OBE এর সম্মুখীন হয়;
সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে অথচ সে দেখতে পাচ্ছে সে বিভিন্ন ধরনের কাজকর্ম করছে যেগুলো সে স্বাভাবিক জীবনে করতো।

এবার আসি Near Death experience এ।
একটা উদাহরণ দিয়ে বলি,আপনি ধরুন ডুবে যাচ্ছেন পানিতে অথবা যে কোনো কিছু ঘটছে যাতে আপনি সমূহ মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো,ঠিক ওই সময়টায় আপনি আপনার ওই জেরক্স কপিকে দেখতে পাবেন।
Near Death experience এর অধিকাংশ মানুষই এটার সম্মুখীন হয়েছেন।
এছাড়াও কিছু কিছু ড্রাগ আছে যেগুলোর ফলে OBE এর সম্মুখীন হতে পারেন।
আবার যারা ধ্যান করেন,
তাদের ব্যাপারটা তো আমরা প্রায় সবাই ই জানি যে,তারা এমন বেশকিছু ব্যাপার আয়ত্ত করে নেন, যেটাকে Astral Projection বলে।
এছাড়াও অ্যানাস্থেসিয়া(অনুভূতি নাশক),সন্তান জন্ম দানের সময় বা হিপনোটাইজেও কিছু কিছু মানুষ OBE এর সম্মুখীন হন।

খুব সম্প্রতি একটা গবেষণায় দেখা গেছে,মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোব,মানে কান বরাবর মধ্যে
মস্তিষ্কের যেই অংশটা থাকে তার অস্থিতিশীলতার (instabilities) কারনে এই সমস্যাটা হয়ে থাকে।

OBE শব্দটা সর্বপ্রথম G.N.M Tyrrell তার Apparitions বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন ১৯৪৩ সালে।

OBE নিয়ে আরও কিছু মজার তথ্য দেই,
৩৬ বছর বয়সী একজন আমেরিকান পুলিশ অফিসার তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
আমার চাকরি জীবনের প্রথমদিনেই ছিলো নাইট ডিউটি।
আমি এবং আরও তিনজন পুলিশ অফিসার গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম,ঠিক তখনই কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেখে গাড়িটা থামাই এবং নেমে পড়ি।
ওই সময়টাতে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই,এবং তৎক্ষণাৎ মনে হলো আমি আমার শরীর থেকে বেরিয়ে ২০ ফুট উপরে চলে এসেছি,এবং আমার শরীরে ঠান্ডা অনুভূতি হচ্ছিলো।আমি সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম,আমি আমার নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলাম;
আমি ঠিক ওগুলোই করছি যেগুলো আমাকে ট্রেনিং এ শেখানো হয়েছিলো।

OBE পাইলট বা মহাকাশচারীদের অনেক বেশি হয়।
অতিমাত্রায় মহাকর্ষীয় শক্তিকে অতিক্রম করার সময় কিছু রক্ত মস্তিষ্কের একটা অংশে জমা হয় যাকে বলে,
“Gravity induced loss of consciousness”

Col.Dan Fulgham নামক একজন পাইলট তার একটা অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
“আমি সেখানে ছিলাম অথচ মনে হচ্ছিলো আমি সেখানে নেই। আমি ভাসছি । আমি আমার নিজেকে আমার বাইরে দেখতে পাচ্ছিলাম। ”

ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে,”যা দেখছো তা,
তা নয়”

পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ টির মতো মানসিক সমস্যার কথা জানা গেছে।

যাইহোক,একটা মজার তথ্য দিয়ে লেখাটা শেষ করি,
Out-of-body experience নিয়ে বাংলা ভাষাতেই একটা সিনেমা হয়েছে ২০১৭ সালে
‘আমি জয় চ্যাটার্জি’ শিরোনামে, যেখানে এই OBE ব্যাপারটা আবির চট্টোপাধ্যায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

লেখক: সাহিত্যিক ও মেডিকেল ছাত্র

আরও পড়ুন