পশ্চিমারা তুরস্কের কাছে কি চায়?

 

মুলঃ মুহিত্তিন আতামান

ইংরেজি থেকে ভাষান্তরঃ নুরে আলম মুকতা।

গত সপ্তাহের লেখায় আমি বলতে চেয়েছিলাম, ফরাসীরা কেন তুরস্কের দিকে ঝুকছে? আমি আসলে বোঝাতে চেয়েছি,পশ্চিমারা কেন তুরস্কের দিকে নজর দিচ্ছে। আজ ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত আকারে বলার চেষ্টা করি। পশ্চিমারা তুরস্ককে কেন বাগে আনতে একাট্টা হচ্ছে? তুরস্কবিরোধী মনোভাব কেন পশ্চিমারা পোষন করবে? এর উৎস ই বা কি? যে সব মুসলিম দেশে গনতন্ত্রের চর্চা হয় সেখানে পশ্চিমারা নাক গলায় কেন? প্রকৃত কথাটি হলো বর্তমান ইসলামোফোবিয়ার সাথে তুর্কোফোবিয়া যুক্ত। পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্ক উন্নয়ন পার্টি (এ কে)এর বিরুদ্ধে সোচ্চার কেন? ওরা কি ভয় পাচ্ছে তার্কী মুল্লুক জেগে যাবার জন্য। পশ্চিমারা মনে করছে আরব দেশগুলো যখন নিজেদের শাসন ব্যবস্থা আর গনতন্ত্রের বিষয়ে নড়া চড়া শুরু করেছে। অস্থিরতা বেড়েছে কয়েক যুগ ধরে। আরব বসন্ত শেষ হয়ে চরম শীতকাল শুরু হয়েছে তখন তুরস্কের ভুমিকাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অস্থির অবস্থাটির শুরু ২০১৩ সালে মিশরে মিলিটারি অভ্যু্থানের মধ্যদিয়ে। এ অস্থিরতা ছড়িয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য আর পূর্ব ভুমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে। পশ্চিমা দেশগুলো তখন থেকেই তুরস্ককে আরব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের অঙ্গুলি তখন থেকেই ওরা তুরস্কের দিকে তুলে রেখেছে। ২০১১ তে যখন আরব বিশ্বে অস্থিরতা শুরু হয় তখন থেকে পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্ক কে বিব্রতকর পরিস্থিতি তে ফেলার চেষ্টায় রত। চুক্তি অনুযায়ী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমও ওরা তুরস্ককে সরবরাহ বন্দ করে দেয়। ন্যাটোর কিছু সদস্য দেশ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে সহায়তা করতে শুরু করে। নিরুপায় হয়ে তুরস্ক তখন তার নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমা জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার জন্য। তারা তুরস্ক কে হতাশ করে। উপায় না পেয়ে চীনের দিকে হাত বাড়ায় তুরস্ক সরকার। কিন্তু চুক্তির মাঝপথে ইউরোপের দেশ গুলো বাগড়া দেয়। তখন তুরস্ক বাধ্য হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে এক বিশাল চুক্তি সম্পন্ন করে। তখন পশ্চিমা দেশগুলোর চুলকানি শুরু হয়ে যায়। তুরস্ক সরকার নিরাপত্তা,প্রতিরক্ষা আর বৈদেশিক নীতির বিষয়ে ইউরোপীয় ধ্যান ধারনা বাদ দিয়ে নিজস্ব নীতির বিষয়ে মনোযোগী হতে শুরু করে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওরা কাজ করে। আর আরব বিশ্বের স্থিরতার জন্য তুরস্ক সরকার চায়না-রাশিয়ার দিকে নজর নিবিষ্ট করে। পশ্চিমা দেশগুলো গনতন্ত্রকামী মুসলিম বিশ্বকে অস্থির করে একনায়ক মুসলিম দেশগুলোকে নিজ স্বার্থেই সমর্থন করে। এটি আসলে ওদের ইসলাম আর তুরস্ক বিরোধী ফোবিয়া। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য পশ্চিমা দেশগুলো আবুধাবীর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বীন জায়েদ,সৌদী ক্রাউন প্রিন্স সালমান আর লিবিয়ার জেনারেল খলিফা হাফতার আর মিশরের ফাতাহ আল সিসি কে প্রচুর সহায়তা দেয়।
ওরা এটি ঠান্ডা মাথায় করে, মধ্যপ্রাচ্য যেনো কিছুদিনের জন্যেও অস্থিরতার মধ্যে পড়ে।
পশ্চিমা দেশগুলো কখনও চায় না তুরস্ক অন্য মুসলিম দেশের জন্য একটি মডেল হিসাবে গড়ে উঠুক। তারা প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে চলে যেতে চায় এবং তাদের বিদেশনীতিতে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন চায়। অন্যান্য রাজ্যগুলিও যদি তুরস্কের পদক্ষেপে চলতে শুরু করে তাহলে পশ্চিমা দেশগুলো পুরো মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটির ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। এজন্য পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্কের প্রচেষ্টা বানচাল করতে বদ্ধপরিকর।
আঞ্চলিক সরকারগুলিকে স্বাধীন বিদেশ নীতি অনুসরণ করতে বাধা এবং ওদের সরকারগুলোকে পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল রাখার লক্ষ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও মিশরের মতো কিছু সরকারকেও পশ্চিমারা কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। আসলে ওরা ওদের ঐতিহ্যবাহী উপনিবেশবাদী নীতি অব্যাহত রাখতে অনড়। আর এজন্য আঞ্চলিক প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ প্রয়োজন। তবে আশার কথা হলো মধ্যপ্রাচ্য ওদের আঞ্চলিক গতিশীলতা আনার জন্য ওদের বিদেশ নীতির দিকে দৃষ্টি ফেরাতে শুরু করেছে। বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সাথে নিজেদের বহু দিনের সম্পর্ক যাঁচাই বাছাই করে দেখছে যে আসলে এগুলো ওই অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা আর উন্নয়নের জন্য কতটুকু দরকার। আরব দেশগুলোর বিদ্রোহের অবসান আর শান্তির জন্য এ বিশাল প্রেক্ষাপটে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি বড় নিয়ামক শক্তি। এখানে তুরস্কের তো আর নিজেদের বড় রকমের স্বার্থ যুক্ত নেই।

(ডেইলী সাবাহ,১৬.০৯.২০২০
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শারমীন আখতার,সম্পাদক, মহীয়সী)

লেখকঃ নুরে আলম মুক্তা,, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন