বিশ্বকবির শিশুকিশোর ভাবনা

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর

সাহিত্য জীবনের কথা বলে। জীবন ও কর্মের সাথে সাহিত্যের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। সাহিত্য জীবনকে বদলাতে সহযোগিতা করে। মন ও মানসের বিকাস সাধনে সাহিত্য যুগান্তকারী ভুমিকা রাখে। সাহিত্যের জমিনে শিশুকিশোর সাহিত্য একটি বিশেষ পাঠ। বিশ্বের প্রায় সকল কবি সাহিত্যিকেরাই শিশুকিশোরদের জন্য কিছু না কিছু অবদান রেখে গেছেন এবং বর্তমানেও রাখছেন। ক্রমাগত সময়ে এধারা চলমান থাকবে এতে কোন সন্দেহ নাই। শিশুকিশোরসাহিত্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও রয়েছে অসামান্য অবদান। সেটি যেমন আছে ছড়া-কবিতায় ঠিক তেমনটি রয়েছে ছোট গল্পেও। ভুমিকা রেখেছেন উপন্যাসের পাতায় আর নাটকের সংলাপেও। আলোচ্য প্রবন্ধে ছড়া সাহিত্যে বিশ্বকবির শিশুকিশোর ভাবনা নিয়ে যৎসামান্য আলোকপাত করার প্রয়াশ পাব।

একজন কবি অতীত থেকে যেমন উপাদান সংগ্রহ করেন ঠিক তেমনি ভবিষ্যতের স্বপ্নও আঁকেন তার লেখায়। স্বপ্নের বীজ বোনেন কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে। ছড়ার পত্র পল্লবে। আঁকিবুকির পরতে পরতে। বিশ্বকবি শিশুকিশোরদের নিয়ে ভেবেছেন অনেক করে। ভেবেছেন একান্ত আপনার করে। আপনার শিশুসত্বার অতীত থেকে উপাদান আহরণ করেছেন তিনি। কবি ছোটদের আলোর সন্ধান দিতে চেয়েছেন। আলোর নাচনের দোলায় নাচতে পথ দেখিয়েছেন শিশুকিশোরদেরকে। এই আলো দিয়েই ভালোর সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করেছেন ছোটদের। আলোর বানে প্রাণে বুনতে বলেছেন সত্যের বীজ। কবি আলোর স্রোতে শিশুকিশোরদের পাল তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। কবি মল্লিকা মালতীর মতোই শিশুকিশোরদের আলোর ঢেউয়ে নাচতে দেখেছেন। কবির ভাষায়-
আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা,
আলো নয়ন-ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা।
নাচে আলো নাচে, ও ভাই, আমার প্রাণের কাছে-
বাজে আলো বাজে, ও ভাই, হৃদয় বীণার মাঝে-
জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা।
আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।
মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই, যায়না মানিক গোনা-
পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই, পুলক রাশি রাশি-
সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা।
(আলো আমার আলো)

হ্যাঁ, কবি শিশুকিশোরদেরকে সোনা আর মানিক ভেবেছেন। যা গুনে গুনে শেষ করা যায় না। এরা ধরার পাতায় পাতায় রাশি রাশি হাসির পুলক ছড়ায়। নদীতে এরা বয়ে চলে কুলুকুলু ছন্দে। এরা নদীর ছন্দে ছন্দে সুধা ঝরায়। কবির স্বপ্ন বলে কথা! কবির স্বপ্ন সত্যি হোক সেই কামনাই করি।

কবি শিশুকিশোরদের মনের আকুতি বোঝেন। ভাবেন শিশুকিশোরদের ইচ্ছামতীর কথা। শিশুকিশোরদের সূর্য-নদীর সাথে খেলার স্বপ্ন আঁকেন ছড়া-কবিতায়। কবি শিশুকিশোরদের দিন ও রাতের সাথে কথা বলার আকুতি খুঁজে পান কবিতার পরতে পরতে। ছড়ার ছন্দ মালায়। ছড়ার ডালিতে। কবির ভাষায়-
যখন যেমন মনে করি
তাই হতে পাই যদি
আমি তবে এক্ষনি হই
ইচ্ছামতী নদী।
রইবে আমার দখিন ধারে
সূর্য ওঠার পার
বাঁয়ের ধারে সন্ধ্যেবেলায়
নামবে অন্ধকার।
আমি কইব মনের কথা
দুই পারেরই সাথে
আধেক কথা দিনের বেলায়
আধেক কথা রাতে।
(ইচ্ছামতী)

কবি নিজেও যেন নদীর সাথে কথা বলেন। সূর্য ওঠা আর ডোবার সাথে আছে কবির মিতালী। তাইতো শিশুকিশোরমনের আকুতি উঠে তাঁর ছন্দ ছড়ায়। ছড়ার গাঁথুনিতে। আমরাও কবির সাথে একাত্বতা ঘোষণা করছি।

একজন কবি শিশুকিশোরকে যেমন আদর্শবান করে গড়ে তুলতে চান, ঠিক তেমনি দেশপ্রেমও জাগ্রত করতে চান শিশুকিশোরের কোমল হৃদয় মনে। তাইতো কবি দেশকে নিয়ে ভাবেন। ভাবেন দেশের মাটি ও মানুষকে নিয়ে। কবির ভাবনা সুদূরে। কবি নিজের জন্মভূমিকে মায়ের সাথে তুলনা করেছেন। কবি তার দেশের ধন সম্পদকে রানীর মত করে ভেবেছেন। এদেশের গাছের ছায়ায় এসে কবির অঙ্গ জুড়ায়। কবির ভাষায়-
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে।
জানি নে তোর ধনরতন আছে কি না রানীর মতন,
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।
কোন বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।
আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,
ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।
(সার্থক জনম আমার)

আমরা জানি দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। সবুজ শ্যামল মায়ায় ঘেরা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ। এদেশের ফুল, পাখি, নদী-নালা, খাল-বিল, চাঁদ-সুরুজ বন-বাদারের সবকিছুই আমাদের আকুল করে। আপনার করে কাছে টানে। হৃদয়ের একটি পাশে আপনার করে ভাবতে শেখায়। শিশুকিশোরেরা যাতে জীবন চলার শুরু থেকেই দেশ প্রেমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে কবির চাওয়া তাই। কবির আশার বাতিঘর এখানেই। আমরাও আমাদের দেশকে আপনার করে ভালোবাসব। দেশের কল্যাণে কাজ করব।

দেশ নিয়ে শত্রুতা করে অনেকেই। এদেশের স্বাধিনতা অনেকের কাছেই ভালো লাগেনা। ‘যে দেশে জন্ম সে দেশ নিয়েই শত্রুতা’ কবি সেটা মেনে নিতে পারেন নি। তাই কবি ওদেরকে ঘৃণা করেন। ওদেরকে কীট ভাবেন!কবির চিন্তায় ওরা অমানুষ। ওদের চরিত্র কালিমায় ভরা। ওদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন কবি। কবি ওদেরকে চুপ করতে বলেছেন। কবির ভাষায়-
কেঁচো কয়, নিচ মাটি, কালো তার রূপ।
কবি তারে রাগ করে বলে, চুপ চুপ!
তুমি যে মাটির কীট, খাও তারি রস,
মাটির নিন্দায় বাড়ে তোমার কি যশ!
(স্বদেশদ্বেষী)

আমরা একটু সচেতন হলে দেখব এরকম অনেক মানুষ রয়েছে, যারা মুখে মুখে দেশ প্রেমের বুলি ফুটায় অথচ ওদের মনে রয়েছে দেশের শত্রুতা। এদের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে আমাদেরকে। সচেতন করতে হবে আমাদের জাতির ভবিষ্যত কান্ডারী শিশুকিশোরদেরকে।

সময় মানুষের জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। সময় জ্ঞান নাই যাদের তারা জীবনে সফল হতে পারে না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হতে হলে সময়ের স্বদব্যবহার করতে হবে। শিশুকিশোরেরা সময় সচেতন হবে না, সময়ের সদ্ব্যবহার করতে শিখবে না এমনটি কোন কবিই আশা করেন না। তাই সময়ের ব্যাপারে শিশুকিশোরেরা যাতে সচেতন হতে পারে সেদিকেও নজর দিয়েছেন বিশ্বকবি। হাস্যচ্ছলে শিশুকিশোরদের সচেতন করেছেন সময়ের ব্যাপারে। কবির ভাষায়-
যত ঘন্টা, যত মিনিট, সব আছে যত
শেষ যদি হয় চিরকালের মতো,
তখন স্কুলে নেই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ,
আমি বলব, ‘দশটা বাজাই বন্ধ।’
তাধিন তাধিন তাধিন।
শুই নে বলে রাগিস যদি, আমি বলব তোরে,
‘রাত না হলে রাত হবে কী করে।
নটা বাজাই থামল যখন, কেমন করে শুই?
দেরি বলে নেই তো মা কিচ্ছুই।’
তাধিন তাধিন তাধিন।
(সময়হারা)

শিশুকিশোরদের বায়নার শেষ নাই। হাজারো অজুহাত দাঁড় করায় ওরা। যুক্তিরও শেষ নাই ওদের। তবে ওরা সহজ সরল। ওদের প্রাণটা কাঁচা। কাঁচা হৃদয়ের বাগানে যাতে ভালো ফুল ফুটতে পারে সেজন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। জাগ্রত করতে হবে আমাদের জ্ঞানের বাতিকে। ইয়ারকির ছলে কবি আমাদের শিশুকিশোরদেরকে সময় সচেতন করতে উদ্ভুদ্ব করেছেন। আসুন আমরাও শিশুকিশোরদের পাশাপাশি সময়ের প্রতি সচেতন হই।

বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী। জীবন চলার পথে বিপদ আসবে এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই বলে কী ভেঙে পরবে শিশুকিশোরেরা? ওরা কী হতাশায় ভুগবে? নাকি সাহসী ভুমিকা নিয়ে এগিয়ে যাবে সামনে! কবির যুক্তি ভয়ের কিছু নাই। এগিয়ে যেতে হবে সামনে। ক্রমাগত বিজয়ের মঞ্জিল পানে। কেউ শান্তনার বানী নিয়ে এগিয়ে না এলেও শিশুকিশোরকে আগাতে হবে। দুঃখকে করতে হবে জয়। বিজয়ের মালা পরতে হবে গলায়। স্বপ্ন বীজ বুনতে হবে মানুষের হৃদয় জমিনে। হৃদয়ের গহীণে। কবির ভাষায়-
বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থণা
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যাথিত চিতে
নাই-বা দিলে সান্তনা,
দুঃখ যেন করতে পারি জয়।
(আত্নত্রাণ)

নিজের পায়ে দাঁড়ানো একজন সফল মানুষের বৈশিষ্ট। অপরের ওপর ভরসা করে বসে থাকা কাপুরুষের কাজ। কবি আমাদের সবাইকে পুরুষ হতে বলেছেন। বিপদ আপদে ভরকে যাওয়া উচিত নয়। সাহস নিয়ে কাজে নেমে পড়াই আদর্শ মানুষের কাজ। কবি শিশুকিশোরদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আহবান জানিয়েছেন।

পরের জন্য ভালো অনেক কিছুই করতে হবে। অন্যের ক্ষতি করতে নেই কিছুতেই। সৃষ্টিকর্তা যেমন সবাইকে ভালোবাসেন, কারও ক্ষতি করেন না তিনি, ঠিক তেমনি কবিও শিশুকিশোরদেরকে পরের কল্যাণে কাজ করতে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করেছেন। অন্যের জন্য কিছু করতে হলে নিজের জীবনে ক্ষতি হতেই পারে। এটাকে কবি মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করেছেন। কবির ভাষায়-
এই করেছ ভালো, নিঠুর,
এই করেছ ভালো।
এমনি করে হৃদয়ে মোর
তীব্র দহন জ্বালো।
আমার এ ধূপ না পোড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছুই আলো।
(এই করেছ ভালো)

চাঁদ যেমন অপরকে আলো দেয়, সূর্য যেমন দুনিয়ায় নিঃস্বার্থভাবে উত্তাপ দান করে কবি শিশুকিশোরদেরকেও ঠিক সেভাবেই নিঃস্বার্থভাবে গড়ে ওঠার আহবান জানিয়েছেন। নিজের কষ্ট হলেও পরের কল্যাণে কাজ করতে বলেছেন কবি। আমাদের শিশুকিশোরদেরকেও সেভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন কবি। আলোকিত মানুষ হোক আমাদের শিশুকিশোরেরা সেই আশাই করি।

একজন কবি স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতের। ভালো কিছু করতে চান কবিরা। কবিদের চেতনায় স্বপ্নের বীজ বোপিত হয়। আর সেই বীজ থেকেই অংকুরিত হয় সুবিশাল বটবৃক্ষ। যে বৃক্ষের ছায়ায় এসে প্রশান্তি পায় হাজারো পিপাসিত পথিক। একটু জিড়িয়ে নেয় বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে। পথিক আবার ফিরে চলে নিজের গন্তব্যের পানে। অনাগত মঞ্জিলপানে। কবি অনাগত শিশুকিশোরদেরকেও বটবৃক্ষের মতো করেই গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অসহায়দের পাশে এগিয়ে আসবে আজকের শিশুকিশোরেরাও। ওরাই হবে বীর সেনানী। বীরের বেশে ওরাই ফুল ফুটাবে জনতার মাঝে। স্বপ্নভাঙ্গা অসহায়দের পাশে সোনার তরী ভিরাবে শিশুকিশোরেরাই। ওরা স্বপ্ন পাখি। কবির ভাষায়-
হাতে লাঠি মাথায় ঝাঁকড়া চুল,
কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল।
আমি বলি, ‘দাঁড়া খবরদার!
এক পা কাছে আসিস যদি আর-
এই চেয়ে দেখ আমার তলোয়ার,
টুকরো করে দেব তোদের সেরে।’
শুনে তারা লম্ফ দিয়ে উঠে
চেঁচিয়ে উঠল,’হা রে,রে রে রে রে।’
(বীর পুরুষ)

আজকে আমাদের সমাজে অনেক খারাপ কাজ সংগঠিত হচ্ছে। অন্যের হক নষ্ট হচ্ছে অহরহ। আগের মতো করে গরীব-অসহায়দের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই যেন। তাই আজকের শিশুকিশোরদেরকে এগিয়ে আসতে হবে সত্যের আহবানে। সততার জয়গানে গেয়ে উঠতে হবে বিজয়ের গান। সাম্যের সমাজ গঠনে আমাদের পথচলা করতে হবে আরো শানিত। আরো বেগবান হতে হবে আমাদের উদ্যোগী ভুমিকা। জয়হোক শিশুকিশোরদের। বিশ্বকবি রবী ঠাকুরের,’বীর পুরুষেরা’ জেগে উঠুক আপন স্বত্তায়। নিজস্ত প্রতিভায়। জাতি গঠনে আবারো শিশুকিশোরেরা এগিয়ে আসুক আপনার করে। একান্ত নিজের করে। ওদের প্রচেষ্টায় শান্তির নিবাস হোক আমাদের এই ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ বসুন্ধরা।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন