বুক রিভিউঃ সমাজ ও জীবন (দিনাজপুরের লোকনাট্য পালাটিয়া)

শারমিন সুমীঃ

বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের কোনো না কোনো ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার অস্তিত্ব রয়েছে যেমন- চাঁপাই নবাবগঞ্জের গম্ভীরা, রাজশাহীর আলকাপ, কুষ্টিয়ার ভাসানগান, রংপুরের কুশানগান ইত্যাদি। এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা যেমন সারাদেশে তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে সেই সঙ্গে স্ব-স্ব অঞ্চলের পরিচিতিতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা আজ বিলুপ্তির পথে। এ প্রসঙ্গে দিনাজপুরের লোকনাট্য ‘পালাটিয়া’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের গ্রামীণ সমাজ কর্তৃক এ অঞ্চলের উপভাষায় মৌখিক বা লেখ্যরূপে রচিত, গ্রামীণ সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় দর্শক পরিবেষ্টিত আসরে পরিবেশিত, নৃত্য-গীত-বাদ্য সমন্বিত, ঐতিহ্যানুসারী বিষয়, অঙ্গসজ্জা, অভিনয়রীতি প্রকরণাদি অনুবর্তিত বা কালানুক্রমে পরিবর্তিত হয়ে স্বতঃস্ফুর্ত ধারায় দিনাজপুরের লোকজীবন ও লোকমানসকে প্রতিভাসিত করে যে দৃশ্যকলা, তা-ই দিনাজপুরের লোকনাট্য পালাটিয়া।
পালাটিয়ার উৎস ভারতের উত্তরবঙ্গের তরাই অঞ্চলে। প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার পালাটিয়া দিনাজপুরের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় চর্চিত হচ্ছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দিনাজপুরের কয়েকটি উপজেলায় এই লোকনাট্যটির সার্বিক বিলুপ্তি ঘটেছে। তাছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিশিল্পের বিপর্যস্ত অবস্থা, নগরায়ণ, অধুনা সংস্কৃতির তুমুল প্রতাপ ও অর্থনৈতিক কারণে পালাটিয়া শিল্পের উপস্থাপনা ও আঙ্গিক বিবর্তন সাধিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে পালাটিয়া দিনাজপুরের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তথা বাঙালির প্রতিবাদী মানসের অভিব্যক্তি যা বাংলাদেশের লোকনাট্যকে বহুমাত্রিক গুরুত্বের অধিকারী করেছে। পালাটিয়ায় দিনাজপুরের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সুখ-দুঃখের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবনের সমস্যাই শুধু নয় সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের প্রতিবাদ ও লোকমানসের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শিত হয়। পালাটিয়ায় অভিব্যক্ত প্রতিবাদ লোকমানসে পরোক্ষ ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনৌচিত্য ও দায়-দায়িত্ব বোধের বিকাশ ঘটিয়ে মানুষকে সমাজসচেতন করে তোলে। বাস্তবজীবনে যে মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পায়, পালাটিয়ার মঞ্চে সে মানুষ নির্ভীক, অপ্রতিরোধ্য, নির্মম নিরপেক্ষ বিচারক। পালাটিয়ার বন্দনা থেকে শুরু করে কাহিনী বিন্যাস এমনকি শেষাংশের মিলনগীতির পরেও যেন দর্শকরা তারই প্রতিফলন খুঁজে পায়। সর্বোপরি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারাবাহিকতার পরম্পরায় লালন ও কর্ষণ করে আসছে দিনাজপুরের পালাটিয়া শিল্পীরা তাই বাংলাদেশের অন্যান্য লোকনাট্যের মতো পালাটিয়ার গুরুত্ব অসরিসীম।

লেখক পরিচিতি

ড. সৈয়দ রেদওয়ান টিটো
নিজ জেলা দিনাজপুর তবে জন্ম ২৪ এপ্রিল ১৯৬৭ খ্রি. মাতুলালয় কুড়িগ্রাম জেলার কাঁঠালবাড়ি গ্রামে। এ প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল লেখক ও গবেষক। শৈশব থেকেই সংগীত, নাটক ও লেখালেখিতে ঝোঁক। রাত জেগে পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, কান্দনি বিষহরার পালা দেখার বাতিক আছে এখনও। গান, পথনাটক, মঞ্চনাটক, বেতার নাটক ও টেলিভিশন নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন এবং পরিচালনা করেছেন। তাঁর রচনা ও নির্দেশনায় সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণমূলক নাটক ‘আ লে হঁ দিশমলে স্বাধীনাকাদা’ এবং তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী নেতা হাজি মোহাম্মদ দানেশ এর সংগ্রামী জীবনভিত্তিক নাটক ‘দানেশ উপাখ্যান’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যমঞ্চে প্রদর্শিত হয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। দেশী-বিদেশী পত্রিকা ও গ্রন্থে নাটক, লোকনাট্য কিংবা বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ লিখে তিনি সমাদৃত হয়েছেন সুধীসমাজে। তাঁর রচিত দর্শকনন্দিত নাটকগুলো হলো সমীকরণ, গর্ত, চক্রব্যুহ, সেঙ্গেল, ইতুত্, ক্ষয়, উপলব্ধি ইত্যাদি। বর্তমানে তিনি সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণমূলক নাটক ‘বীরবান্টা’ নিয়ে কাজ করছেন।
‘বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: দিনাজপুর’ গ্রন্থটি প্রণয়নে তিনি গবেষক ও সংকলকের কাজ করেছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রণীত মুক্তিযুদ্ধের নাট্যসংকলন গ্রন্থে তাঁর লেখা নাটক প্রকাশিত হয়েছে। UNESCO Participation Program 2014-15  এর আওতাধীন Presentation and Promotion of  the songs of Abdul Alim, the legendary folk singer of Bangladesh  শীর্ষক গবেষণার জন্য ‘আবদুল আলীম ফাউন্ডেশন’ তাঁকে গবেষক সম্মাননা স্মারক প্রদান করেছেন। প্রকাশিতব্য ‘দিনাজপুর জেলা গেজেটিয়ার’ এর ‘‘দিনাজপুরের লোকসংস্কৃতি” বিষয়ক প্রাবন্ধিক এবং সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিতব্য ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এনসাইক্লোপিডিয়া’ গ্রন্থের প্রাবন্ধিক ও গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি সমকাল নাট্যচক্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাক্তন সভাপতি ও আজীবন সদস্য; শিল্পকলা একাডেমি, দিনাজপুর জেলা শাখার ফোকলোর সেল এর আহ্বায়ক; ভৈরবী, দিনাজপুর এর নাট্য প্রশিক্ষক এবং দিনাজপুরের শতবর্ষী নাট্যসংগঠন নাট্যসমিতির নাট্য পরিচালকসহ অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য। পেশাগতভাবে আদর্শ মহাবিদ্যালয়, দিনাজপুর এর অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।
১৯৯০ খ্রি. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ থেকে সম্মানসহ  স্নাতকোত্তর  ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১১ খ্রি. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন।

বইয়ের নাম- সমাজ ও জীবন
(দিনাজপুরের লোকনাট্য ও পালাটিয়া)

লেখক -ড.টিটো রেদোয়ান
প্রকাশনা -দেশ পাবলিকেশন্স
মুল্য-২৫০/-

শারমিন সুমী লেখক, গবেষক ও সঙ্গীতশিল্পী।

আরও পড়ুন