মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে

সুফিয়ান আহমেদ

যে অজ্ঞতা আমাদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে অবরুদ্ধ রেখেছে, তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার এই যে হতাশা ও নৈরাশ্য মুসলিমদের চেতনাশক্তিকে বিকল করে দিয়েছে। এই হতাশা ও নৈরাশ্য মুসলিম উম্মাহর বর্তমান যুগের কিছু কার্যকলাপের প্রতিফল। এতে কোনাে সন্দেহ নেই যে, ইসলামি বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান অনেকের হৃদয়ে যাতনার সৃষ্টি করবে, যেমন শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এমনকি চারিত্রিক অবস্থা এতটা শােচনীয় পর্যায়ে পৌছেছে যা মুসলিম উম্মাহর মতাে একটি সভ্য উন্নত জাতির জন্য মােটেই মানানসই নয়। এ বিষয়গুলাে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং আমাদের চিত্তকে এমন হতাশা ও অবসন্নতায় ডুবিয়ে দেয় যা গ্রহণযােগ্য নয়, উপযােগীও নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক হলাে আমাদের শেকড়ে ফিরে যাওয়া; আমাদের ইতিহাস পাঠ করা, আমাদের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার কার্যকারণগুলাে অনুধাবন করা। এই উম্মাহর সূচনাকাল যা-কিছু দ্বারা উৎকর্ষমণ্ডিত হয়েছিল, তার পরবর্তীকালও সেসব বিষয় দ্বারাই উৎকর্ষমণ্ডিত হবে। এ কারণে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চায় কাজে লাগানাের জন্য এই ইতিহাস পাঠ করব না এবং এই সভ্যতায় পাণ্ডিত্য অর্জন করব না; বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলাে, সেই ভিত্তিভূমিকে ফিরিয়ে আনা, ভেঙে পড়া টুকরােগুলােকে পুনর্নির্মাণ করা এবং মুসলিমজাতিকে সঠিক গন্তব্যপথে ফিরিয়ে আনা। একইভাবে আমাদের লক্ষ্য হলাে, মানবসভ্যতার যাত্রায় আমাদের অবদান এবং মানবজীবনে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিশ্বকে অবহিত করা। এটা অনুগ্রহ ফলানাে নয় এবং অহংকারেরও বিষয় নয়। বরং এটা সত্যকে তার উপযুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা এবং শ্রেষ্ঠ ধর্মের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানাে, যে ধর্ম বিশ্বমানবের জন্য একটি সর্বোত্তম জাতি নির্মাণ করেছে।

বিষয়টি অত্যন্ত প্রিয় হওয়া এবং এ বিষয়ে লিখতে আমার আগ্রহ-উৎসাহ থাকা সত্ত্বেও আমি প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে গােপন করব না যে, এ বিষয়ে কলম ধরা অত্যন্ত শক্ত কাজ। বিভিন্ন কারণে এই কাঠিন্য সৃষ্টি হয়েছে : সভ্যতার সংজ্ঞা নির্মাণে চিন্তাবিদ ও লেখকগণের মতভিন্নতা, মানবসভ্যতার শত শত বিষয়ে মুসলিমদের ব্যাপক অবদান, যে সময়কে ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি তার বিপুল বিস্তৃতি, কারণ আমরা চৌদ্দ শতাব্দীরও বেশি সময়ের প্রচেষ্টা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি। আরও একটি কারণ এই যে, আমরা পশ্চিমের দেশ স্পেন থেকে নিয়ে প্রাচ্যের দেশ চীনসহ অসংখ্য ভূখণ্ড সম্পর্কে আলােচনা করব, যেখানে মুসলিমগণ শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বংশবিস্তার করেছেন।

এসব জটিলতা বইটিতে বারবার বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করেছে। যখনই আমি বইটির অধ্যায় ও অনুচ্ছেদগুলাে বিন্যাসের একটি রূপরেখা দাঁড় করেছি, আমাকে অন্য একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে হয়েছে। অবশেষে এটি বক্ষ্যমাণ অবস্থায় রূপ নিয়েছে। আমার মনে হয়, যদি আরেকবার দৃষ্টি বােলাতাম, তবে আমাকে আরেকবার বিন্যস্ত করতে হতাে।

ড. রাগিব সারজানি
মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে ( চার খণ্ড)
ড. রাগিব সারজানি
মুদ্রিত মূল্য: ২৯০০

আরও পড়ুন