Ads

সত্য কখনও কখনও কল্পনার চেয়েও ভয়ঙ্কর এবং আকর্ষণীয় ।। আশরাফ আল দীন

‘গুজরাট ফাইলস’ মূল বইটি ইংরেজিতে লেখা। লিখেছেন, রানা আইয়ুব। “GUJARAT FILES: Anatomy of a Cover Up” by Rana Ayyub. ২০০২ সালের কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গার উপর লেখা এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে শহীদ আজমী ও মুকুল সিনহার নামে এবং এর ভূমিকা লিখেছেন, বিচারপতি বি এন শ্রীকৃষ্ণ। এই বইয়ের বাংলা অনুবাদ “গুজরাট ফাইলস: এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের ময়নাতদন্ত” প্রকাশ করেছে ‘প্রজন্ম পাবলিকেশন’। ভাষান্তর করেছেন সুমন দত্ত এবং সম্পাদনা করেছে ‘টিম প্রজন্ম’। দুই শত পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ধরা হয়েছেঃ মাত্র তিনশত টাকা।

নানান আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত তথ্যানুসন্ধানী নারী সাংবাদিক ‘রানা আইয়ুবে’র লেখা ‘গুজরাট ফাইলস: এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের ময়নাতদন্ত’ বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে বিশ্বাস জন্মালো যে, সত্য কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর এবং নির্মম, অথচ আকর্ষণীয় হতে পারে! বইটি পড়তে গিয়ে আপনারও মনে হতে পারে যে, আপনি কোন রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনী পড়ছেন।

২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০০২ তারিখের সকালবেলা সবরমতী এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি অযোধ্যা থেকে আহমেদাবাদ ফিরছিল। গোধরা রেল স্টেশনে এটি যাত্রাবিরতি করে। যাত্রীদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু করসেবক যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের স্থানে হিন্দু-ধর্মীয় কর্মকান্ড শেষ করে ফিরছিল। রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম ট্রেন যাত্রী এবং হকারদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা ও পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কোন এক অজানা কারণে ট্রেনের চারখানা বগিতে আগুন ধরে যায়। অনেক যাত্রী এতে আটকে পড়ে এবং ফলাফল হিসেবে ৯ জন পুরুষ, ২৫ জন মহিলা এবং ২৫ জন শিশু সহ মোট ৫৯ জন আগুনে পুড়ে মৃত্যু বরণ করে।

এদিকে, হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা রটিয়ে দেয় যে, মুসলমানরাই ট্রেনের বগিতে আগুন দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলে দলে হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীরা স্থানীয় নিরীহ মুসলমানদের উপর চড়াও হয়, এবং এলাহাবাদসহ গুজরাটের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গতিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ঘর-বাড়ীতে অগ্নি সংযোগ করে মুসলমানদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও ব্যাপক লুটতরাজ চালানো হয় এবং সশস্ত্র ক্যাডার লেলিয়ে দিয়ে শিশু ও নারীসহ অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করা হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েসহ অনেক মহিলাকে গণধর্ষণের পর আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। গর্ভবতী মায়েদের পেট চিরে সন্তান বের করে আনা, স্তন কেটে নেয়া এবং শিশু সন্তানদের তলোয়ারের মাথায় গেঁথে প্রজ্জলিত আগুনে ছুঁড়ে ফেলার মতো অকল্পনীয় বর্বরতার কাহিনীও ঘটেছে। টানা তিন দিন ধরে গুজরাট পুলিশের ছত্রছায়ায় ও সরকারের নীরব সম্মতিতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয় অত্যন্ত তীব্র গতিতে। এরপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা স্থানে অগ্নি সংযোগ, লুটতরাজ ও হত্যাকান্ড চলতে থাকে দিনের পর দিন। কোথাও কোথাও সরকারি মদদের অথবা নিষ্ক্রিয়তার ছাপ সুস্পষ্ট। তলোয়ার ও অন্যান্য অস্ত্র সজ্জিত হিন্দুদের বড় বড় দল আক্রমণকারী এবং সংখ্যালঘু মুসলমানরাই আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের গুলিতে নিহত প্রায় সকলেই মুসলমান! মোদি সরকার ও মিডিয়ার মিথ্যাচরের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য গোপন করা হয়। অন্যদিকে সাহসী সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কন্ঠ রোধ করা হয়।

গুজরাট প্রাদেশিক সরকার এই ঘটনা তদন্তের জন্য গুজরাট হাই কোর্টের বিচারপতি কে জি শাহ্কে দিয়ে একটি ‘এক সদস্য বিশিষ্ট কমিশন’ গঠন করে। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী মোদির সাথে মিস্টার শাহর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে গণবিক্ষোভের মুখে এই কমিশনকে দুই সদস্য বিশিষ্ট করা হয় এবং এর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জি টি নানাবতীকে।

তারপরও আন্তর্জাতিকভাবে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয় এবং “গুজরাটের কসাই” হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দাযে মার্কিন যক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে মোদির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ও ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রববাহিত করার জন্য পরবর্তীকালে সুপরিকল্পিতভাবে আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনকে প্রভাবিত করা হয় এবং সরকারিভাবে অনেক সাজানো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটানো হয়। এইসব এনকা্উন্টার ও ক্রসফায়ারের ঘটণায় প্রধাণত মুসলমান পুরুষ-নারীকেই হত্যা করা হয়। উদ্দেশ্য, এটা প্রমাণ করা যে, পাকিস্তানের গোয়েন্দা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ও প্রশিক্ষিত মুসলমান সন্ত্রাসীরাই গোধরা অগ্নিকান্ড ও পরবর্তী অরাজকতা ঘটিয়েছে। শুরু থেকেই এটাই ছিল সরকারী বয়ান! যদিও এর সপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্য প্রমাণও খুঁজে পাওয়া যায়নি!

২০০৩ সালে, সচেতন নাগরিক সমাজে (Concerned Citizens Tribunal -CCT)- এর তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, ট্রেনের অগ্নিকান্ডটা ছিল একটি দুর্ঘটনা মাত্র। অন্য অনেক স্বাধীন সংস্থার পক্ষ থেকেও জানানো হয় যে, এই অগ্নিকাণ্ড ট্রেনের বগির অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাই ছিল এবং বাইরে থেকে কেউ অগ্নিসংযোগ করেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে গুজরাট সরকারের অফিশিয়াল বয়ান হচ্ছেঃ “এই অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে পরিকল্পিতভাবে কিছু লোকের দ্বারা যারা সরাসরি পাকিস্তানের নির্দেশে এই ষড়যন্ত্র করেছে।” ঐতিহাসিক আইনসলি থমাস এমব্রি (Ainslie Thomas Embree) গুজরাট সরকারের এই বর্ণনাকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তৎকালীন ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার ২০০৫ সালে গোধরা ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি উমেশচন্দ্র ব্যানার্জির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই তদন্তের রিপোর্টে বলা হয়েছে হয় যে, “আগুনের ঘটনাটা ঘটেছিল ট্রেনের বগির ভেতর থেকেই এবং খুব সম্ভবতঃ দুর্ঘটনাবশত।” কিন্তু ২০০৬ সালে গুজরাট হাইকোর্ট এই তদন্ত কমিশনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং বলে যে, এটা কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন বিষয় নয়।

ঘটনার দীর্ঘ ছয় বছর পর গুজরাটের মোদি সরকারের গঠন করা “নানাবতী-শাহ কমিশন” তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে বর্ণনা করে যে, “এই ঘটনাটি ছিল হাজার হাজার উত্তেজিত স্থানীয় জনতার অগ্নিসংযোগের ঘটনা।” এই অগ্নিসংযোগের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয় গোধরার প্রখ্যাত আলেম মৌলভী হোসেইন হাজী ইব্রাহিম উমারজী এবং সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স থেকে বরখাস্তকৃত অফিসার নানুমিয়া-র নাম। মোট ২৪ বার সময় বৃদ্ধির পর এই কমিশন ১৮ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে তাদের ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করে। কিন্তু “তেহেলকা” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটা ভিডিও প্রমাণ করে দেয় যে, এই কমিশনের রিপোর্ট সম্পূর্ণভাবে ভুয়া, বানোয়াট এবং মোদি সরকারের ইচ্ছেমাফিক তৈরি করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘নানাবতী-শাহ কমিশন’ ভারতীয় জনতা পার্টির বক্তব্য তুলে ধরেছে, কারণ মিস্টার শাহ্ “তাদের লোক” এবং নানাবতীকে ঘুষ দেয়া হয়েছে।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মোট ৩১ জনকে শাস্তি প্রদান করে এবং ৬৩ জনকে বেকসুর খালাস দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, এটি ছিল “পূর্ব পরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্র”! এর মধ্যে ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এই ৩১ জনের সকলেই শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার অপরাধে কল্পিত এবং বানোয়াট অভিযোগে প্রাণ দিল এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করলো! নানাবতী-শাহ কমিশন যাকে প্রথমে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ঘোষণা করেছিল সেই মৌলভী উমারজীর বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় তাঁকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

পুরো দুনিয়া জানে যে, এই ঘটনার ও দুর্ঘটনার মূল কাহিনী কখনোই প্রকাশিত হয়নি! যা প্রকাশিত হয়েছে তা হলো ধর্মান্ধ মিডিয়া এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের একপাক্ষিক বর্ণনা এবং ফলাফল হলোঃ ব্যাপকভাবে মুসলিম দমন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও ঘৃণার বিস্তার।

অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই ঘটনার আসল কাহিনী উদঘাটন করে আনার এক রোমাঞ্চকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন রানা আইউব। সেই সাহসী তথ্যানুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দলিল হলোঃ গুজরাট ফাইলস। কিন্তু ২৬ বছর বয়সের একজন মুসলমান নারী সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে একাজ করার উপায় ছিল না তার পক্ষে। তাই, ছদ্মবেশ গ্রহণ কতে হলো! রানা আইয়ুব হয়ে গেলেন ‘মৈথিলী ত্যাগী’। কানপুরের এক কায়স্থ পরিবারের মেয়ে; আমেরিকায় ফিল্মের উপর পড়াশোনা করছে। মৈথিলী দেশে ফিরে এসেছে গুজরাটের উন্নয়ন এবং সারা পৃথিবীতে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বিষয়ক সিনেমা বানানোর জন্য। ভিজিটিং কার্ডে লেখা হলোঃ
মৈথিলী ত্যাগী
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার,
আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট কনজারভেটরি।
সাথে সহকারি হিসেবে রাখলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সের মাইক নামের পূর্বপরিচিত ও বিশ্বস্থ এক লম্বা-ফর্সা ফরাসী নাগরিককে। দীর্ঘসময় ধরে এই তদন্ত অভিযান চালাতে হবে এবং ব্যবহার করতে হবে পরচুলা, স্পাই ক্যামেরা ও গোপন রেকর্ডার।

রানা আইয়ুব ১৯৮৪ সালের পহেলা মে ভারতের মুম্বাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯২-৯৩এ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময় তার পরিবার শহর ছেড়ে মুসলিম প্রধান অঞ্চল দেওনার-এ চলে যায়। রানা এখানেই বেড়ে ওঠেন। পড়াশোনা করেন দিল্লির জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিডিয়া ও জার্নালিজমে’র উপর। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় আগ্রহ থেকেই নামকরা ম্যাগাজিন “তেহেলকা”য় যোগ দেন রানা। বর্তমানে তিনি ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, ফরেন পলিসি সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন তিনি। অসাধারন সাহসী এই মহিলা সাংবাদিক এত অল্প বয়সেই অনেক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। ২০১০ সালে ‘দেশভাগের পর ভারতের শীর্ষ প্রভাবশালী ৫০ মুসলিম’ এর তালিকায় উঠে আসে রানা আইয়ুবের নাম। ২০১১ সালে তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্কৃতি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ২০১৬ সালে ‘এম এম জার্নালিস্ট অফ দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড, ২০১৭ সালে ‘গ্লোবাল শাইনিং লাইট’ অ্যাওয়ার্ড এবং ২০১৮ সালে ‘মোস্ট রিজিয়েলেন্ট গ্লোবাল জার্নালিস্ট’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন রানা আইয়ুব।

গুজরাট গিয়ে তিনি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী, প্রাক্তন সরকারি ও পুলিশ কর্মকর্তা, বিশিষ্ঠ নাগরিক যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুজরাট ম্যাসাকারের সাথে, সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে, সম্পৃক্ত ছিলেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যমে তিনি তাদের মুখ থেকেই শুনেছেন অগ্নিকান্ড, দাঙ্গা, এবং এনকাউন্টারগুলোর আসল ঘটণা। অডিও এবং ভিডিও রেকর্ডগুলোসহ তিনি সফলভাবে ফিরে আসেন বম্বে শহরে। কিন্তু অবাক হওয়া মতো তথ্য হলোঃ তেহেলকা পত্রিকা সাহস করলো না এই ‘সত্যগুলো’ প্রকাশ করতে! কারণ, এরই মধ্যে এক যুগ সময় পার হয়ে গেছে এবং দাঙ্গাকালীন সময়ের ‘মুখ্যমন্ত্রী’ গুজরাট থেকে চলে গেছেন দিল্লীতে এবং হয়ে গেছেন আরো বেশী ক্ষমতাধর ‘প্রধানমন্ত্রী’! মোদির নিষ্ঠুরতায় তেহেলকা পত্রিকার অস্থিত্ব মুছে যেতে পারে এই ভয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আর ওই পথে এগোয় নি। মনের দুঃখে ও প্রতিবাদে রাণা আইয়ুব তেহেলকা থেকে পদত্যাগ করেন এবং সাহসী ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান দেখানোর খাতিরে প্রকাশ করেনঃ “গুজরাট ফাইলস”।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া লেখিকা ও বুদ্ধিজীবী অরুন্ধতী রায় ‘গুজরাট ফাইলস’ সম্পর্কে লিখেছেনঃ
“উচ্চ পদস্থ আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পর্কে এই বইতে যা বলা হয়েছে তা আমাদের দেশের বিভন্ন আদালতে মুলতবি হয়ে থাকা মামলাসমূহের সাথে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। এই বই থেকে ঐ সকল মামলা সংশ্লিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ সম্পর্কেও একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়। এতে উল্লেখিত অপরাধসমূহ রীতিমত ভয়ঙ্কর। কিন্তু এখানে প্রশ্ন এই যে, আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরাই যদি অপরাধী হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে আমাদের কী করা উচিত? আর আমরা যারা তাদের এই ক্ষমতা দিয়েছি, আমাদের কী বিচার হওয়া উচিত?”

শত শত বছর ধরে ভারত ছিল হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত! বিশেষত প্রায় সাত শত বছরের মুসলিম শাসনের কল্যাণে। ব্রিটিশ শাসনের মধ্য ভাগে ব্রিটিশদের ডিভাইড এন্ড রুল নীতির কারণে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রধানত, কিছু কট্টর হিন্দুত্ববাদীর জন্ম হয়, যারা ব্যাপকভাবে নিজেদের মধ্যে মুসলিম বিরোধী ঘৃণা প্রচার করতে থাকে। এমনকি ধর্মের আচার আচরণের মধ্যেও এই ঘৃনাকে তারা প্রবিষ্ট করে দেয়, যেমন: ‘গোমাতা’ ধারণা, যা আদি সনাতন ধর্মে কখনো ছিল না এবং একটি ভুয়া ও পবর্তীকালে উদ্দেশ্যমুলকভাবে সংযোজিত কনসেপ্ট। বলছি এজন্যে যে, পূর্বকালে সনাতন ধর্মের মুনি ও সাধুপুরুষরাও ব্যাপকভাবে গোমাংস ভক্ষণ করতেন। ষড়যন্ত্রটা খুবই স্পষ্ট! হাজার বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বেড়ে ওঠা দু’টি ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মুখোমুখি ও বৈরী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়া!
সে যা’ই হোক, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে অনুশীলন সমিতি আর বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরএসএস (রাষ্টীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) এবং কালক্রমে সংঘ পরিবারের জন্ম হয়েছে একই ধারাবাহিকতায়। মিশন একটাই:
“মুসলমানরা বহিরাগত। ওদেরকে ভারত থেকে তাড়াতে হবে। ওদেরকে ঘৃণা করা যায়! ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া যায়, এমন কি ওদের হত্যাও করা যায়! এতে কোন পাপ নেই।”
দীর্ঘদিন থেকে প্রচারিত ও অনুশীলিত এই মন্ত্রে দীক্ষিত বিভিন্ন প্রজন্মের অসংখ্য আরএসএস সদস্য আজ ভারতের সরকারি বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের নানা পর্যায়ে বর্তমান। ভারতে ভালোমানুষ অনেক। কিন্তু এই কট্টরপন্থীরা, সংখ্যায় কম হলেও, এরা এত উগ্র ও নিষ্ঠুর যে, তাদের সামনে অন্য কেউ দাঁড়াতে পারে না! আর, রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র মাধমে এই কট্টরপন্থীরাই এখন ভারতীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত! এই ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদী দল উগ্র সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসেবে প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করেছে আরএসএস-এর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে বেড়ে ওঠা নরেন্দ্র মোদির গুজরাটকে। পরবর্তীকালে, বিজেপির মাধ্যমে ওরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে আরো বেশ কয়েকটি রাজ্যে।

রানা আইউব-এর লেখা “গুজরাট ফাইলস” বইটা পড়ে দেখুন। বুঝতে পারবেন, ওদের মিশন কেবল শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি! অথচ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানরা এ ধরণের পরিস্থিতি মোকাবেলায় অপ্রস্তুত এবং সম্পূর্ণ অন্ধকারে! তাদেরকে শিক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে উগ্রতা ও সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে।

রানা আইয়ুবকে এই বই লেখার উদ্দেশ্য একবাক্যে প্রকাশের অনুরোধ করা হলে তিনি বলেছিলেনঃ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (অতীত অপরাধ ও ভন্ডামীর) মুখোশ উম্মোচন করা।
অনুবাদ গ্রন্থখানা সুখপাঠ্য।

#আশরাফ_আল_দীন

আরও পড়ুন