বুক রিভিউঃ রাখাল

মৌলী আখন্দঃ

প্রতি বইমেলায় বিশ থেকে পঁচিশটার মত বই কেনা হয়। নিজের বই কেনার সুবাদে এবারের বইমেলায় বেশ কয়েকদিন যাওয়া হয়েছে বলে ২০২০ সালের বইমেলায় কেনা বইয়ের সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়েছে। বন্ধু তালিকায় লেখকের সংখ্যা বেড়েছে, তাদের অনেকের বই মেলা থেকে কেনার সময় হয়নি বলে রকমারি থেকে কিংবা অন্য বুকশপ থেকে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কেনা হয়েছে। এই সবগুলো বইয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বইয়ের আসন দিতে হবে লতিফুল ইসলাম শিবলী রচিত “রাখাল’কে।
কেন?
প্রথমত, এর অভিনব বিষয় নির্বাচন। প্রাচীন ভারতের নির্মম প্রথা সতীদাহের শেষ শিকারকে নিয়ে লেখা এই উপন্যাস। এই বিষয় নিয়ে লেখা আর কোনো উপন্যাস ইতোপূর্বে লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
দ্বিতীয়ত, এর কাহিনীবিন্যাস ও ভাষা মাধুর্য। ইতিহাস নিয়ে হৃদয়গ্রাহী উপন্যাস লেখা নিতান্ত সহজ কর্ম নয়। একদিকে তথ্যের পর্যাপ্ততা ও যথার্থতার দিকে লক্ষ্য রাখতে হয় অন্যদিকে তথ্যের ভারে কাহিনীর শৈল্পিক গুণ যেন ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হয়। লেখক এই কঠিন পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
এ এমন এক আলেখ্য যা সমান্তরালে বর্ণনা করে গেছে বনের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি, আমাদের আচ্ছন্ন করেছে এক অনন্য দার্শনিকতায়, বিমোহিত করেছে এক অসম্পূর্ণ প্রেমে।
লেখকের লেখনী শৈলীর কিছু উদাহরণ না দিলেই নয়ঃ
“নীরবতার ভেতরে শোনা যায় বয়ে যাওয়া বাতাসের আওয়াজ, দূরের জঙ্গল আর উপত্যকা থেকে ভেসে আসে পাখির মৃদু শব্দ। ওদের ঠিক মাথার উপরের আকাশে রাজসিক গাম্ভীর্য নিয়ে চক্রাকারে উড়ছে একটা ঈগল, যেন তার হারানো সাম্রাজ্যের দিকে তাকিয়ে ফেলছে দীর্ঘশ্বাস।“
বইয়ের শেষ লাইনটিঃ
“সঙ্গী পেলে পাখি বানায় বাসা, মানুষ বানায় ঘর।“
পড়া শেষ করে পাঠক নিজেকে আবিষ্কার করবেন এক অনন্য উচ্চতায়, যেখান থেকে সহসাই এই ধুলোমাটির পৃথিবীতে নেমে আসা সম্ভব হবে না।
কিছু সমালোচনাঃ
যদিও হয়ত আমার পক্ষে এসব বলা ধৃষ্টতা হয়ে যায়, তবে কিনা যে বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা আছে “সত্যের জন্য বাঁচো সত্যের জন্য মরো” সে বইয়ের রিভিউয়ে সততার পরিচয় দিতে হবে বৈকি, বইয়ের সম্মান রক্ষার্থেই।
প্রথমত, মাধবচন্দ্রের চরিত্রের আরও একটু বিকাশ করা প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বইটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও লেখক আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন বলেই বানান ভুলগুলো চোখে লেগেছে। আশা করি লেখক ভবিষ্যতে প্রুফ রিডিং এর বিষয়ে আরও সতর্ক হবেন।
তৃতীয়ত, এই পয়েন্টটি লিখব কিনা এই নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলাম, একবার লিখে মুছে দিয়েও আবার লিখছি। এই বইয়ের প্রচ্ছদে “from the bestselling author of Darbish, Dokhol and Asman” কথাটি লেখা আমার সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, বাহুল্য ও বইয়ের প্রতি অপমানকর বলে মনে হয়েছে। যদিও পুঁজিবাদী সমাজে সবকিছুই পণ্য, সবকিছুই ব্যবসার দামে বিকোয়, তারপরও আমরা যারা বই ভালোবাসি, এই ধরণের বাক্য প্রচ্ছদে লেখা থাকাটা আমাদের সামান্য হলেও আহত করে বৈকি। এই বাক্যটি সিনেমার পোস্টারে চলতে পারে বইয়ের প্রচ্ছদে নয়। (কাউকে আহত করে থাকলে বা সীমা লঙ্ঘন করে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।)
সব মিলিয়ে, বইটি বেস্ট সেলার হওয়ারই যোগ্য এবং হয়েছেও তাই। সতীদাহ প্রথা, প্রাচীন ভারতের সত্য ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিচিত্র এই বইটি সকল বইপ্রেমীর সংগ্রহে রাখা উচিত।
এক নজরেঃ
বইয়ের নামঃ রাখাল
লেখকঃ লতিফুল ইসলাম শিবলী
প্রচ্ছদঃ মাজহারুল ইসলাম শুভ
প্রকাশনীঃ নালন্দা
মলাট মূল্যঃ ৩০০ টাকা।
রেটিংঃ ৯.৫/১০

আরও পড়ুন