বুক রিভিউঃ তৃতীয় পক্ষ

মৌলী আখন্দঃ

শক্তিশালী লেখক ফরহাদ হোসেনের লেখার একটা আকর্ষণীয় দিক হলো তার বিশেষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ব্যবহার করে পুরো একটা প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করে ফেলা। পড়ে নিজেকেই মনে হয় ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছি, গিয়ে চোখের সামনে সব কিছু ঘটতে দেখতে পাচ্ছি। সব কিছু চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে।
তার লেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের জীবনের বৈচিত্র্যময় চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে পারা।
তার লেখা পড়ে আমি মনে মনে নিজেই তার সাথে সাথে চলে গেছি ডালাসে, ঘুরে এসেছি টিভিতে প্রচারিত জায়গাগুলো থেকে। তার “তৃতীয় পক্ষ” বইটিতে থাকা “মেয়েটি এখন কোথায় যাবে ” আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পগুলোর একটি। গল্পের মেয়েটির জন্য চিন্তিত হয়ে যাই আমরাও, তার সাথে একাত্ম হয়ে যাই, তার সাথে সাথে সংকটে পতিত হয়ে যাই। কী হবে এখন? কোথায় যাবো এখন? লেখক আমাদের চিন্তার জগতে আলোড়ন তৈরি করে ফেলতে পারেন অনায়াসে, কি সহজেই! তার লেখা ছোট ছোট সংলাপে গল্প এগিয়ে যেতে থাকে তরতর করে, উঁচু থেকে গড়িয়ে পড়ে যাওয়া জলপ্রপাতের মতো স্বচ্ছন্দ গতিতে। তার বিশেষ গুণ, তার গল্পগুলো পড়ে মনে হয় সব জিম করে বের হয়েছে, এমনই মেদহীন, ঝরঝরে! ভাত রান্নার কাজ যেমন নিখুঁত রাঁধুনির, ফরহাদ হোসেন ভাইয়ের লেখাও তাই! একটা ভাতের সঙ্গে আরেকটা লেগে যাবে না, না নরম না শক্ত, গোগ্রাসে গিলতে হবে!
এই গল্প সংকলনে আমার আরও একটা প্রিয় গল্প হচ্ছে “হৃদয়ে আগন্তুক “। এই গল্পের প্লট, কাহিনী সবই একদম পরিচিত। অতীতে এই কাহিনী নিয়ে অনেক গল্প লেখা হয়েছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক হবে। যা নতুন তা হলো, ফরহাদ হোসেন ভাইয়ের লেখায় ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন। মানুষের মনের আবেগের ওঠাপড়া, গল্পের টান টান প্রাণবন্ত উপস্থাপন এই গল্পকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
” তৃতীয় পক্ষ ” বইয়ের তৃতীয় গল্প “অপেক্ষা”। এই গল্পের শুরু দমকা বাতাস আর ঝমঝম বৃষ্টির বর্ণনা দিয়ে। চতুর্থ গল্প “কী ঘটেছিল লাস ভেগাসে”, যা রহস্যে মোড়া। পঞ্চম গল্প “একজন আজমল হোসেন”, যা পড়া শেষ হলেও মনে রেশ থেকে যায়।
বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের চোখে আমেরিকা হচ্ছে স্বপ্নের দেশ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ল্যাণ্ড অফ অপরচুনিটি নামে খ্যাত এই দেশে পা রাখে। সবার স্বপ্নই এক ও অভিন্ন-নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা।
লক্ষ্যপূরণের আশায় প্রবাসে পাড়ি জমানো এই মানুসগুলোকে জীবনের শুরুতেই জীবন ও জীবিকার জন্য নেমে পড়তে হয় সীমাহীন সংগ্রামে। কেউ প্রতিষ্ঠিত হয়, কেউ বা আবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায় বিফল মনোরথে। আবার কারো সংগ্রাম থাকে অব্যাহত, হার না মানার অদম্য ইচ্ছায় চালিয়ে যায় জীবন যুদ্ধ।
এই প্রতিটা মানুষের জীবনেই থাকে একটা করে গল্প। এমনই কয়েক লক্ষ প্রবাসী বাঙালির জনা কয়েকের গল্প নিয়েই এই গ্রন্থের কাহিনীবিন্যাস। যেখানে থাকেন একজন পুরুষ, থাকেন একজন নারী, এবং তাদের মাঝে আবির্ভাব ঘটে একজন তৃতীয় পক্ষের। তিনি কখনো বা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, কখনো বা তার কারণেই সম্পর্কের দেয়ালে ভাঙন ধরে। মানবজীবনে এই তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো জীবনগল্পে তাদের অবদান উপেক্ষা করার মত নয়।
গ্রন্থভুক্ত গল্পগাথাগুলোরও মূল উপজীব্য এই তৃতীয়জনেরাই। প্রবাস, প্রকৃতি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন এই বইটিকে করেছে উপভোগ্য। সবগুলোই এমন যে পড়তে শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না।
দারুণ এই গল্প সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে। বইটি পড়তে মিস করলে ভুল করবেন।
এক নজরেঃ
বইয়ের নামঃ তৃতীয় পক্ষ
লেখকঃ ফরহাদ হোসেন
প্রকাশনীঃ অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ শিল্পীঃ মোস্তাফিজ কারিগর
মলাট মূল্যঃ ৪০০ টাকা।

রিভিউ লেখকঃ সাহিত্যক ও চিকিৎসক।

আরও পড়ুন