জাতীয় শোক দিবস

 

আজ ১৫ আগষ্ট। বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর একটি দিন। আজ থেকে ঠিক ৪৩ বছর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। একই সাথে আবদুর রব সেরনিয়াবত এবং শেখ ফজলুল হক মনিকেও সপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যাকান্ড পূর্ব পরিকল্পিত; দীর্ঘ মেয়াদে সাজানো একটি নৃশংস ষড়যন্ত্র, জাতির জন্য ট্রাজেডী। বাঙ্গালীর স্বাধীনতা ও এগিয়ে যাবার পথে প্রথম ও সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাত। এই ঘৃন্য হত্যাকান্ডের বিচার দীর্ঘদিন কুখ্যাত ইনডেমনিটি এ্যাক্ট দ্বারা নিষিদ্ধ ছিলো। শেষ পর্যন্ত হত্যাকান্ডের একুশ বছর পরে ১৯৯৬ সালে এর আনুষ্ঠানিক বিচারকার্য শুরু হয় এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রায় এবং রায়ের আংশিক বাস্তবায়ন ঘটে। আজ আমরা একটু ইতিহাসের পাতায় চড়ে হত্যাকান্ড পূর্ব পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপট বিশ্লেষন করতে প্রয়াস পাই। আবার বর্তমানে দাড়িয়েও বিশ্লেষন করে দেখি কতটুকুই তার বাস্তবায়ন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ব্রিটিশ ভারতে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুসলিম ছাত্র লীগের কনভেনার ছিলেন, যেখানেই সমগ্র ভারতবর্ষের মাঝে একমাত্র প্রদেশ হিসেবে ভারত বিভাগ পূর্ব সাধারন নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিজয়লাভ হয়। মুসলিম লীগের এই সাফল্যে ছাত্র ফ্রন্ট বা মুজিবের তৃনমুল পর্যায়ে অবদান ছিলো। মুজিবের এই সাফল্য দেশ বিভাগের পরও ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন, আওয়ামী লীগ গঠন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ছয়দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র, গন অভ্যূত্থান, জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, পার্লামেন্ট অধিবেশন বাতিল, ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় — ধারাবাহিক ঘটনাপুন্জের সবগুলোতেই মুজিব ছিলেন অত্যন্ত তৎপর; বিশেষ করে ধারাবাহিক ভাবে রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রূপান্তরিত মুজিব ছিলেন ভীষন শক্তিশালী; এমনকি মুক্তিযুদ্ধে সশরীরে অনুপস্থিত মুজিবও ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী। পুরো দেশ তার কথায় চলতো, প্রতি মুহুর্তে জাতি তাকে স্মরন করতো, তার জন্য কায়মনবাক্যে দুআ করতো।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, পুরো বাংলাদেশের দায়ভার তার চওড়া বুকে নিয়ে নেন। রজনৈতিক মুজিবের দ্বিতীয় অধ্যায়– ক্ষমতাসীন মুজিব।
রাজনীতির অনিবার্য পরিনতি অনুযায়ী ইতিহাসে ক্ষমতাসীন বঙ্গবন্ধু অধ্যায়ের পক্ষে বিপক্ষে বিস্তর মতামত রয়েছে। আমরা ৭২-৭৫ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষন করলে দেখি—
# বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে মিত্র বাহিনীর অধীন ভারতীয় বাহিনীকে ভারতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করেন। দেশে আসার যাত্রাপথেই অসামান্য কূটনৈতিক এপ্রোচের মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধীকে রাজি করান সেনাদের ফিরে যাওয়ায়। বঙ্গবন্ধু মিসেস গান্ধীকে বলেন,”বাঙ্গালী অতিথিপরায়ন জাতি, কিন্তু এই সাহায্যকারী সেনাদের দুবেলা আপ্যায়নের ক্ষমতা এই মুহুর্তে আমার দেশের নাই। ”

# বঙ্গবন্ধু ভারতে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে কোলকাতায় বিদ্রোহী কবি নজরুলকে দেখতে যান। রুটিন চিকিৎসা ও পথ্যের অভাবে নজরুলের শোচনীয় অবস্থা দেখে বঙ্গবন্ধু হাহাকার করে ওঠেন। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তেই তিনি নজরুলকে সাথে করেই বাংলাদেশে আনেন ২৪ মে, ১৯৭২ এ। ধানমন্ডির একটি বাড়ি নজরুলকে দিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তীতে ওখানেই নজরুল ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠে। নজরুলের শারীরিক অবস্থা সাপেক্ষে পিজি হাসপাতালে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।

# এক বছরের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রনয়ন করা হয়, যেখানে গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলো মুলনীতি হিসেব। সংসদীয় গনতন্ত্র ছিলো বাহাত্তুরের সংবিধানের মৌল চরিত্র।

# যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে দ্রুততম সময়ে অবকাঠামোগত সংস্কার ও উন্নয়ন কার্য চালান, যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো অত্যন্ত নাজুক।

# তিনি সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। এতে বিপুল পরিমান অস্ত্র উদ্ধার হয়। অবশ্য তিনি একাজ শেষ করে যেতে পারেননি।

# তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার জন্য জোড়ালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালান। সোভিয়েত ব্লকের অধিকাংশ দেশের সাথেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রগুলো প্রায় সবাই তাকে স্বীকৃতি দানে বিরত ছিলো। নিরলস বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের মত বৈরী রাষ্ট্রেও ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যান স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষে।

# ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনিষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। এবং শীর্ষ নেতৃবর্গের মাঝে শুধুমাত্র খন্দকার মোশতাক প্রায় সব সেন্টারে পরাজিত হয়েও অলৌকিক উপায়ে নির্বাচিত হন। মিজান চৌধুরী সহ মাঝারী ছোট অনেক নেতার নামেই কারচুপির ভয়ানক অভিযোগ ওঠে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্বেও তাই এ নির্বাচন রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশ আনতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়।
# বঙ্গবন্ধু সীমাহীন আন্তর্জাতিক খ্যাতিলাভ করেন। বিশ্ব শান্তিতে অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদকে ভূষিত করা হয়। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেন, “আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি।” কিউবার সাথে বাংলাদেশ একটি বিনিময় চুক্তি করেছিলো। আমরা পাট রপ্তানি করবো আর কিউবা থেকে মেডিকেল এসিসট্যানস নিবো।
# তিনি চুয়াত্তরের ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ মোকাবেলা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে একই বছরে খরা ও বন্যা হলে মারাত্মক খাদ্য সংকটে পরে দেশ। রেড ক্রসের মাধ্যমে সারা বিশ্ব থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমান খাদ্য বহনকারী জাহাজ মার্কিন নির্দেশনায় বাংলাদেশে আসতে দেয়া হয় না। ঘটনাটি ঘটে বাংলাদেশ কিউবার বিনিময় চুক্তির মার্কিনী বিরুদ্ধাচরন হিসেবে।
# পরবর্তীতে রেডক্রসের জাহাজ বাংলাদেশে আসে; খাদ্যের বদলে কম্বল নিয়ে। এই কম্বল আসে, সাথে কম্বল পাচারের দিক নির্দেশনাও আসে। তাই হতাশ বঙ্গবন্ধু বলেন, “সাড়ে সাত কোটি কম্বল এলো; আমার কম্বল গেলো কই?”
# ১৯৭২ সালে ছাত্রলীগ ভেঙে জাসদ ছাত্রলীগ গঠিত হয়। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষে গনবাহিনী গঠিত হয়। তাত্বিক সিরাজুল আলম খানের তত্ব নিয়ে মাঠে নামেন জাসদ গনবাহিনী।
পাশাপাশি সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে সর্বহারা পার্টি নকশাল আদলে দেশে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি চালু করে। চোরাগুপ্তা হামলা খুন খারাবি লুটতরাজ, বিশেষ করে অনেকগুলো থানা লুটের ঘটনা ঘটে। আধা সামরিক মিলিশিয়া রক্ষী বাহিনী গঠন করে এই গনবাহিনী সর্বহারা পার্টি দমন করতে চেষ্টা চালানো হয়।
# পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে মবিয়া হয়ে বঙ্গবন্ধু এক পর্যায়ে জরুরী অবস্থা ঘোষনা করে সারাদেশে সামরিক বাহিনী নামিয়ে দেন। চোরাকারবারের ব্যপকতা ছিলো ভয়াবহ। সামরিক অভিযানেও পুরোপুরি সাফল্য আসে নাই, বরং অনেক ধৃত অপরাধীকে ছেড়ে দেবার ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরী করে।
# পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে বঙ্গবন্ধু আকস্মিক ভাবে বাকশাল কায়েম করেন। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার বদলে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু হয়। সামরিক বেসামরিক আমলারাও সরাসরি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট তথা বাকশাল সদস্য হন। নিম্ন আদালতের বিচারক দের সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়, চারটি জাতীয় দৈনিক রেখে বাকী সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। আধা সমাজতন্র ছিলো বাকশালে। উৎপাদন জাতীয়করন হলেও বিপনন, পারমিট এগুলো ছিলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে, যা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সাথে যায় না। পুরো দেশের ক্রমশঃ নাজুক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি বাকশাল কায়েম করেন। কিন্তু এই বাকশাল কায়েমের মাধ্যমেই তার বিপুল জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়।
# বঙ্গবন্ধু হাল ছাড়েন নি আমৃত্যু। শাহাদত বরনের মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি পাকিস্তান সরকারের দেয়া শেল কোম্পানির ইজারা তুলে নেন ১৭.৫ কোটি টাকার বিনিময়ে, ৯ আগষ্ট, ১৯৭৫। ফলে জাতীয় মালিকানায় চলে আসে সবগুলো গ্যাস ক্ষেত্র। তিতাস, বখরাবাদ, হরিপুর সহ এসব গ্যাস ক্ষেত্র থেকে লক্ষাধিক কোটি টাকার গ্যাস আমরা ইতিমধ্যে উত্তোলন করেছি। বর্তমান বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র তার এই দূরাদর্শী পদক্ষেপেই।
# দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ঠেকিয়ে রাখার পর ভারত সরকারকে অস্থায়ী পরীক্ষামূলক ভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে দেন তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে।
# তার সাড়ে তিন বছর সময়কাল কেটে যায় নানামুখী দ্বন্দ্ব মোকাবেলায়। অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংসদের বাইরে, এককথায় চরম পন্থায় চলে যায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরনে তিনি নানামুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হন। পরাজিত পাকিস্তান এবং মার্কিন তৎপরতায় কোন মুসলিম দেশ স্বীকৃতি দেয় না। সংবিধানে সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা থাকায় নাখোশ তারা। জুলিও কুরি পদক প্রাপ্তিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুর জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। আবার একদা মার্কিন ঘেঁষা বঙ্গবন্ধুর ৭১ পরবর্তী বাস্তবতায় সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সাথে বন্ধুত্ব পশ্চিমা মোড়লগোষ্ঠী মেনে নেয় নি। তাই তাকে সমুলে সপরিবারে হত্যার নীলনকশা আঁকা হয়ে যায়।
# আওয়ামী লীগ দলের অভ্যন্তরেও ষড়যন্ত্র ছিলো; মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানকারী তাজউদ্দীন কেবিনেটে থাকতে পারেন নি, যদিও খন্দকার মেশতাক কেবিনেটে ছিলেন পুরো মুজিব শাসন কালেই।
# আন্তর্জাতিক ভাবে বন্ধুরাষ্ট্র ভারত বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। মার্কিনীরা ছিলো সরাসরি ঘাতকদের সহযোগিতায়, যা তাদের পরবর্তীকালে প্রকাশিত নথিতেই স্পষ্ট হয়।
# কর্নেল আবদুর রশীদ ক্যান্টনমেন্টে বসেই মুল অভিযান পরিচালনা করেন; অভিযানের নেতৃত্বে কর্নেল ফারুক। মেজর হুদা এবং মেজর মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরে, মেজর নূর চৌধিরী আবদুর রব সেরনিয়াবতের বাসায় এবং রিসালদার মুসলেমউদ্দিনের নেতৃত্বে শেখ ফজলুল হক মনির বাসায় নৃশংস হামলা চালানো হয়। সেনাপ্রধানকে ফোন দেবার পরেও কোন রকম তৎপরতা দৃশ্যমান হয় না। এমনকি রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টারের সামনে দিয়েই কর্নেল ফারুকের নেতৃত্বে ফাঁকা ট্যাংক নিয়ে বিক্ষিপ্ত সেনাদল বেরিয়ে যায়, কোন প্রতিরোধ ছাড়াই। তবে একজন কর্নেল জামিল আহমেদ প্রতিরোধের প্রয়াস করেছিলেন। তিনি পোস্তগোলা বাসা থেকে সংবাদ পেয়ে রাতের অন্ধকারে সশস্ত্র অবস্থায় ৩২ নম্বরের কাছে এসেই প্রতিরোধ যুদ্ধে নামেন এবং বীরের মত শাহাদাত বরন করেন। ৩২ নম্বরে শেখ কামাল বন্দুক নিয়ে প্রতিরোধ শুরু করেন এবং শুরুতেই মৃত্যুবরন করেন। সেনা প্রধানকে দ্বিতীয়বার ফোন করার পর বাড়ির ফোনের লাইন ছিড়ে ফেলা হয়। একটি ছবিতে দেখা যায়, মেজর হুদা এবং মহিউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নীচে নামছিলেন, যা জীবিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শেষ ছবিও বটে। পরবর্তী ঘটনা অতি দ্রুত। আবদুর রব সেরনিয়াবতের বাড়ির প্রায় সব সদস্যকে হত্যা করে মেজর নূর চৌধুরী হাজির ৩২ নম্বরে, ঠিক যেই মুহূর্তে সিঁড়ির মাথায় নীচে নামতে উদ্যত বঙ্গবন্ধু, পিছনে হুদা ও মহিউদ্দীন। get aside বলে চিৎকার করে মুহূর্তের মাঝে বুকের এক জায়গাতেই ১৪ টি গুলি করে মেজর নূর। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার একেবারে নিজস্ব লোক বলে পরিচিত, শুটিংএ বিশেষ পারদর্শী।

# দলের মাঝেও ছিলো মীরজাফরের গোষ্ঠী। তাই হত্যাকান্ডের পরপরই যে নোতুন সরকার গঠিত হয়, সেখানে খন্দকার মোশতাক সহ সবাই বাকশাল বা সাবেক আওয়ামী লীগার। এদের অনেককেই বন্দুকের নলের সামনে আনা হলেও সবাইকে দায়মুক্ত বলার কোন সুযোগ নেই। বরং জেল হত্যার চারজন জাতীয় নেতার শাহাদাতবরন মোশতাক সরকারকে বিশ্বাসঘাতক প্রমানের জন্য যথেষ্ট।

১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ এর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিচার কাজ একুশ বছর পরে আলোর মুখ দেখে। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে কর্নেল ফারুক, মেজর হুদা, মেজর মহিউদ্দীন আহমেদ, শাহরিয়ার রশিদ, একেএম মহিউদ্দীন, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৫ জনকে ফাঁসী দেয়া হয়। একজন বিদেশেই মারা যান। বাকি ছয়জন এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এই ছয়জনের মধ্যেই রয়েছে সরাসরি কিলার মেজর নূর চৌধুরী এবং সার্বিক পরিকল্পনার মুল হোতা কর্নেল আবদুর রশীদ। এছাড়া মেজর ডালিম, মুসলেমউদ্দিন সহ আরও দুজন। বিশেষ করে নূর চৌধুরী ও আবদুর রশীদের ফাঁসি ছাড়া এই রায় বাস্তবায়িত হয়েছে, বলার কোন অবকাশ নেই। সেই সাথে খুনী চক্রের দোসর, দলের মাঝেই ঘাপটি মেরে থাকা সার্থান্বেষী মহলকে একযোগে না বলা ছাড়া বিচারের রায় বাস্তবায়ন সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত দিবসে সবাইকে শপথ নিতে হবে, মুজিবের রক্তের সাথে বেঈমানী করা দেশবিরোধী অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে হব।

 

মোস্তফা মাসুম তৌফিক- কবিও সাহিত্যিক।  

আরও পড়ুন