বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী

-নুরে আলম মুকতা

গভীর রাতে মাইকের ভেজা ব্যাটারীর মতো বাক্স মাথায় করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় সোজা হেঁটে চলেছে কয়েকজন যুবক। পরনে তেমন কিছু নেই। কারো লুঙ্গি কোঁচা মারা। বলিষ্ঠ ওদের শরীর। রূঢ় ওদের চেহারা। দেখে মনে হয় প্রতিশোধের আগুন দৃষ্টি থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে। কারো সামনে ওরা দাঁড়ায় না। কারো সঙ্গে কথা বলে না। ওরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নিজের কাজে। আর হাসান ভাই হলে তো কথাই নেই। ইস্পাত দৃঢ় ওর মানসিকতা। হাসানের ন্যায়-নীতি পরায়নতার কাহিনী এ অঞ্চলের লোকমুখে এখনও শোনা যায়। অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা দুর্দান্ত সাঁতারু ছিলেন। একবারে চার পাঁচ কিলোমিটার সাঁতরে পাড়ি দিতেন প্রমত্তা ভরা ভাদরের মহানন্দা। অবিশ্বাস্য গতি সম্পন্ন সাঁতারু। ১৯৪৯ সালে জন্ম নেয়া এ বীর মুক্তিযোদ্ধা আপোষহীন আর অসম্ভব কর্মতৎপর ছিলেন। ট্রুপ কমান্ডার হিসেবে চালিয়েছেন অনেক গেরিলা আক্রমন। চাঁপাই নবাবগঞ্জের ভোলাহাট ভারতীয় সীমা সংলগ্ন হওয়ার জন্য মিত্রদেশ থেকে বিভিন্ন সামরিক আর বেসামরিক সরঞ্জাম বহন করার বিশ্বস্ত সেনা ছিলেন হাসান। ঐ ব্যাটারীর মতো ওগুলো দেখার জন্য পিছু নিতাম আমি। ছোট শিশু এ ভাইকে হাসান কোলে নিয়ে সামরিক মহড়ার পাশে ভাঙ্গা চেয়ারে বসিয়ে নিজের কাজ শুরু করে দিলেন। রাতে কিছু দেখা যায় না। টিপ টিপ করে বেশ দূরে কেরোসিন হ্যারিকেনের আলো আসছে। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছেন। মাথা সবার জঙ্গল দিয়ে ঢাকা। কনুইয়ের শক্তি দিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছেন। দেখে বুক শিউরে উঠছে। পিঠে বেশ ভারি বোঝা। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাজ লিডার হাসানের পছন্দ হলো না। এবার তিনি সবার আগে শুয়ে গেলেন মাটিতে। মুখে কি যেন একটি শব্দ বেশ জোরে বলে উঠলেন। কেঁপে উঠলো নীরব নিঃশব্দ আমবাগানের স্তব্ধ পরিবেশ। সামনে একটি বিশাল পুকুর। বেশ পুরনো। তিনজন মুক্তিযোদ্ধা একসাথে ঝাঁপ দিলেন পানিতে। আমি ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। আব্বা-আম্মা অনেক খুঁজবেন এজন্য একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। ঐ পুকুরটি আমাদের এলাকায় পঁচা পুকুর হিসেবে পরিচিত। জল টলটলে স্বচ্ছ কিন্তু পঁচা কেন নাম হলো কেউ বলতে পারেনি। কালের সাক্ষী হয়ে আজও বুকে ধারণ করে আছে এক বিশাল জলরাশি। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান নিজ দায়িত্বে গড়ে তুলেছিলেন জল পথে যুদ্ধ চালানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধের একদল অসমসাহসী যোদ্ধা। এ দলটি বিভিন্ন সময় পাকবাহিনীর গতি রোধ করে দিয়েছিলো।
আমি প্রায় সব সময়ই আম্মাকে অসম্ভব বিরক্ত করতাম। সবসময় শাড়ির আঁচলের একটি কোণা আঙ্গুলে পেঁচিয়ে ধরে রাখতাম। ভীষন রোগা আর খিটখিটে মেজাজের ছিলাম। আম্মা যেন কোথাও না যান এজন্যে ধরে থাকতাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তীব্র আকার ধারন করেছে। বড় ভাই আর হাসান ভাইকে নিয়ে আম্মার দুঃশ্চিতার অন্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধ আরো তীব্রতর হয়েছে এমন একদিন আম্মা রান্না নিয়ে ব্যস্ত। হাসান আলী রক্তাক্ত সামরিক পোষাকে আম্মার সামনে দাঁড়িয়ে। আম্মা হাতের রান্না সরঞ্জাম ফেলে আর্ত চিৎকার করে ভাইকে জড়িয়ে ধরলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানের দৃঢ় অবয়বের দুটো চোখে অশ্রু। আম্মা আমার চাচাতো ভাইকে নিজের ছেলের চাইতেও বেশি ভালোবাসতেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান ভাই বললেন, ছোট মা, আমার কিছু হয়নি। কিন্তু কামাল চাচা কে…..আর কোন শব্দ মুখ দিয়ে বের করতে পারেন নি। লড়াই অঙ্গন থেকে কামাল চাচার লাশ কাঁধে করে বাড়ি আনা দলের সাহসী এ লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী। খেলার মাঠে যখন কোন খেলোয়াড় জেতার জন্য লড়াই করে দর্শক আনন্দে মাতিয়ে তোলে তখন ঐ খোলোয়াড়ের নেশা কে পবিত্র ধরা হয়। পাকিস্তানি হায়েনার রক্তচক্ষু উপেক্ষাকারী অসম সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী ব্যাডমিন্টন মাঠে খেলতে খেলতে আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ২০০২ সালের ১২ জানুয়ারি ক্ষনজন্মা এ মহাপুরুষ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে আচমকা বিদায় নেন। রেখে যান অনেক কাহিনী যা আমরা সারাজীবন বইতে থাকবো। সালাম তোমায় বীর। স্যালুট তোমাকে। আমি আজো শুনি লেফট-রাইট, লেফট-রাইট, এ্যাটেনশন পজিশন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, তোমাদের জন্য হ্যাটস অফ্।

নুরে আলম মুকতা সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

আরও পড়ুন