মচমইল জমিদার বাড়ি

হোসনে আরা মেঘনা

আমাদের চৌদ্দ দিন ব্যাপী “লিডারশীপ ” প্রশিক্ষণ চলছিল উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, বাগমারা, রাজশাহীতে।
প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে সকল শিক্ষকগণকে ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণের নিমিত্তে আশেপাশের ভাল কোন স্কুল পরিদর্শনের জন্য পাঠানো হয়, যাতে প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে সুষ্ঠুভাবে সর্বাঙ্গীন দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন প্রধান শিক্ষকগণ।
আমাদের ইউ আর সি’র সুযোগ্য কর্ণধার, সুদক্ষ, বিচক্ষণ এবং সৎ ইনস্ট্রাক্টর জনাব মোঃ মকলেছুর রহমান স্যার যাতায়াত ব্যবস্থা, রিসোর্স সেন্টার হতে দূরত্ব এবং বিদ্যালয়ের অবস্থা ও ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী রোঞ্জিত স্যারের ট্যালেন্ট, পজিটিভ মেন্টালিটি, অমায়িক আচরণ এবং বিদ্যালয়ের ভাল রেজাল্টের দিক বিবেচনা করে আমাদেরকে মচমইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য দলে ভাগ করে দিলেন। প্রতিটি দলে ছয় জন করে মোট পাঁচটি দল আমরা।

সেদিন ছিল ২০১৯ সালের ১লা এপ্রিল। আমরা দল-বল নিয়ে মহা সমারোহে উৎফুল্ল চিত্তে হৈহৈ করে ছুটলাম মচমইল সপ্রাবি’এর পথে। যেন বান্ধনহীন এক ঝাঁক সুখের পায়রা উড়ে চলেছি আমরা নীলাম্বর পেরিয়ে কোন এক অজানা গন্তব্যে। খুব মজাই লাগছিল। ছক বাঁধানো দায়িত্ব পালনের পরও সেদিন অনেক ইনজয় করেছিলাম আমরা। কয়েক জন মিলে বিদ্যালয়ের ক্লাস দেখার এক ফাঁকে ঘুরতে বেরোলাম বাইরের চার পাশে।

হঠাৎ চোখে পড়লো বহু যুগের পুরাতন রাজা/ জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ। বেশীর ভাগই ধ্বসে পড়েছে অযত্ন আর অবহেলার কষ্ট নিয়ে। ভেতরে উপজাতি অধিবাসীরা গরুর গোবরের জ্বালানী খড়ি, খড়কুটো রেখেছে। কোথাও আবার ঝোপ-ঝাড়। বাইরের দেয়ালের গায়ে গোবরের চাপড়া দেওয়া দেখলাম। প্রাসাদের চূড়ায় কিছু পরগাছা উদ্ভিদ নির্বিঘ্নে ঠাঁই করে নিয়েছে বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ চন্দ্রবিন্দুর মত। এত উপরে থাকতে পেরে বোধ হয় নিজেদের খুব ধন্য মনে করছে পরগাছাগুলো।

প্রাসাদের আশেপাশে উপজাতিরা বাস করে। কোন্ উপজাতি জানা হয়নি। দেখলাম ওদের ঘরের ধারি, চুলার পার, টিউবওয়েলের পার, পুকুর ঘাট —- সব খানে সেই ইটের গাঁধুনী যেটা জমিদার বাড়ির দেওয়ালে গাঁথা আছে। এক উপজাতি মহিলাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম —এই ইটগুলো প্রাসাদ হতে খুলে লাগানো হয়েছে। কিছুটা কষ্ট পেলাম জেনে। বার বার মনে হয়েছিল প্রাসাদটি যদি পূনঃনির্মাণের ব্যবস্থা করা যেত, বাগমারার একটা পুরাতন ঐতিহ্য রক্ষা পেত, কালের স্বাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো যুগ-যুগান্তর। বাইরে থেকে অনেক পর্যটক আসতো দেখার জন্য। কিন্ত সে কি আর হবে কখনও !
তাৎক্ষণিক ভাবলাম দু’একটা সেলফি আর ছবি নিলে মন্দ হয়না। পরে লেখালেখির কাজে আসতে পারে।
আমি কয়েক জন শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলাম —–
—– এখানকার জমিদারের নাম কি ছিল?
—– তাঁর সন্তানাদি কতজন ছিল?
—- তাঁর স্থায়িত্বকাল কত থেকে কত সাল?
—– তিনি এখান থেকে কবে এবং কোথায় চলে গেছেন ?
——- তাঁর বংশধরদের এখন কি অবস্থান বিরাজমান?
তখন এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর পাইনি। পরেও আর সময় করে জানা হয়ে ওঠেনি। প্রাইমারীর হেডমাস্টার কিনা, রাজ্যের দায়িত্বভার!

শত দায়িত্বের ভীড়েও এই পুরাতন ঐতিহ্যগুলো কেন যেন আমাকে ভাবায়। আমাদের বাগমারায় এমন আরও ঐতিহ্য বিরাজমান। যেমন—
—-নামকানের লাহিড়ীর মঠ,
— গোয়ালকান্দির রাজবাড়ি,
— বীরকুৎসার হাজার দুয়ারী রাজবাড়ি।
যখন দেখি তখনই খুব আফসোস হয়,
এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো যদি সংরক্ষণ করা যেত !

সরকার বাহাদুরের নিকট আমি আমার লেখার মাধ্যমে জানাতে চাই— এই পুরাতন ঐতিহ্যকে জাগরুক করে রাখার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হোক। পরবর্তী প্রজন্মরা যেন বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে কিছুটা হলেও সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারে। বাংলার প্রাচীন এবং বর্তমান অবস্থার মিল- গড়মিল, সাদৃশ্য -বৈসাদৃশ্য, উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, স্বাধীনতা -পরাধীনীনতা, ভাল-মন্দ ইত্যাদি বিষয়ে তুলনা করে যেন নিজেদের অবস্থান বুঝতে সক্ষম হয়।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষক

 

আরও পড়ুন