সবুজে মাখামাখি জীবন

কুলসুম আক্তার সুমি

আমার জন্ম বেড়ে উঠা অজ পাড়াগাঁয়ে। সেখানে অভাব-অনটন, দু:খ-দারিদ্রের চেয়েও যা বেশি ছিল; তা হল সবুজ প্রকৃতি, ঝোপ-জঙ্গল, গাছপালা। আর সেই সবুজে মাখামাখি করেই অতিবাহিত হয়েছে আমার শৈশব, কৈশোর।

ব্রিটিশ আমলে আমাদের গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুসিত। ১৯৪৭ সালের পর হিন্দুদের কাছ থেকে বাড়ি কিনে নিয়ে আশপাশের গ্রামের মুসলমানরা বসতি গড়ে তোলে। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আমাদের বাড়িটি কেনা হয়। আমাদের লাগোয়া বাড়িটি পাশের গ্রামের যিনি কিনেন কিছু বছর পর তিনি তার শ্বশুরের এলাকা ময়মনসিংহ চলে যাবার মনস্থির করেন। পাশাপাশি বলে এ বাড়িটি ও আব্বা কিনেন। ফলে দুটো বাড়ি মিলে আমাদের বাড়ির সীমানা বেশ বড়। আর তাতে ছিল ফল-ফুল গাছের বিশাল সম্ভার।

#ফল#
অর্ধ শতাধিক আম গাছ আমি দেখেছি বলে স্মৃতিতে আসে। ফাল্গুন মাসের দিকে আম গাছে গাছে মুকুল ধরলে কি সুন্দর ঘ্রাণ লাগতো নাকে, তা বলার ভাষা নেই। মনে আছে একেকবার, কাল বৈশাখী ঝড়ে ঝরে পড়া কাঁচা আম কুড়িয়ে রান্নাঘর ভর্তি করে ফেলতাম। আম্মা বিরক্ত হতেন, এত কাঁচা আম দিয়ে কি হবে!? তখন তো আর কাঁচা আম দিয়ে আচার বানাতে জানতাম না।

তাছাড়া একটার পর একটা ফল বার মাসই থাকে, সংরক্ষণ করে খাবার খুব একটা প্রয়োজন ও ছিল না। শুধু আম কেটে রোদে শুকিয়ে রাখা হত, যাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় হল্লি বলা হত। সম্ভবত: ফালি শব্দ থেকে ফলি, ফল্লি পরে হল্লি শব্দটি এসেছে। অন্য সময় যা পানিতে ভিজিয়ে শরবত করে বা ছোট মাছের সাথে রান্না করে খাওয়া হত। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাস আমি মোটামুটি আম খেয়েই কাটাতাম। মাটিতে পড়া পাকা আম খেয়েই শেষ করতে পারতাম না, তবু গাছে উঠে আম পাড়তাম। পাকা আম দিয়ে আমসত্ত্ব করে রাখা হত। একেকটা গাছের আমের একেক রকম আকৃতি, স্বাদ, রং, ঘ্রাণ।এখন ভাবলে সেসবকে নিজের কাছেই রূপকথা বলে মনে হয়।

মেঝো ভাইয়া যখন বলতেন, আমাদের যা আম বাদুড় খেত বা আশপাশের গ্রামের বাচ্চারা কুড়িয়ে নিত তুই (মানে আমি) তা সারা জীবনে দেখিই নি, খাওয়া তো দূরের কথা। কথাটা ছোটবেলায় বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হত। এখন বিশ্বাস হয়, কারণ আমি ছোটবেলায় যা আম খেয়েছি, আমার পরের প্রজন্ম (ভাতিজা ভাতিজিরা) তা সারা জীবনে (কখনো বাগানে গিয়ে না দেখলে) দেখবে ও না।

আমাদের জাম গাছ ছিল একটাই, বেশ বড়। আমি তাতে উঠে পড়তাম অনায়াসে। সে নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। ভাবি প্রেগনেন্ট। জাম ভর্তা খেতে চাইলেন, আমি গাছে উঠে জাম পাড়ছি। পাশের বাড়ির জামাল (আমার থেকে কিছুটা ছোট) এসে বলল, আপা আপনি জাম পাড়েন, আমি কুড়িয়ে নিচ্ছি। লুঙ্গিতে সে জাম জমা করল। আমি গাছ থেকে নামতে উদ্ধত হতেই সে দিল ছুট। সারা মাঠ তাকে দৌড়িয়েও ধরতে পারলাম না।
সন্ধ্যা হল খালা (জামালের আম্মা) নফল রোজা রেখেছেন। বাপের বাড়ির কলের পানিতে ইফতার করবেন। জামাল গেছে পানি আনতে। আমি এলাচ বাগানের পেছনে লুকিয়ে। যেই জামাল যাচ্ছে, বের হয়ে পানির জগ ধরে ধস্তাধস্তি করে পানি ফেলে দিচ্ছি। এভাবে দু’তিন বার। ইফতারের সময় পার হয়ে গেছে, জামাল কান্না জুড়ে দিয়েছে। আজ ওকে মার খাওয়াব, আমার ভাবীর জন্য পাড়া জাম ও নিয়ে গেছে! এমন সময় অন্য বাড়ির নওয়াব আলী ভাই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সব শুনে উনি বললেন, আজকে ওকে ছেড়ে দে, আজ ও এমনিতেই মার খাবে নিশ্চিত। আর কাল ও জাম পেড়ে দেবে। ও না দিলে আমি দিব। তবু ছাড়ছিলাম না, সেই ঘটনার পর থেকে নওয়াব আলী ভাই আমায় দারোগা বলে ডাকতেন।

কাঁঠাল গাছ ছিল ডজন খানেক। কোন কোনটায় শ’খানেক কাঁঠাল পর্যন্ত ধরত। তবু দক্ষিন পাশের বাড়ির নানীবুড়ির গাছের কাঁঠাল চুরি করে খেতাম। গাছটা ছোট, কাঁঠাল ও ছিল ছোট ছোট। গাছটা আমাদের সীমানা লাগোয়া। আর তাই চুরি টা ছিল এক রকম মজা করেই। কাঁঠালের মাঝখানের ডাঁটা টা গাছেই ঝুলে থাকত। পুরো কাঁঠাল খেয়ে ঠিক নিচ বরাবর চামড়াটা রেখে দিতাম আর চারপাশে ছড়িয়ে রাখতাম বিচিগুলো। বাদুড় খায় কাঁঠাল এই হল বিষয়।

একদিন নানী কাউকে খুঁজছিলেন কাঁঠাল পাড়ার জন্য। আমি বললাম নানী আমিই পারব। একলাফে গাছে উঠে গেলাম, কাঁঠাল কেটে দিলাম।

আম্মার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করল, বাদুড়ের কাঁঠাল খাওয়া আর আমার তরতরিয়ে গাছে উঠে যাওয়ার সমীকরণ। আম্মা পাহারায় থাকলেন এবং একদিন ঠিক ঠিক বাদুড়টা গাছের উপর হাতেনাতে ধরা পড়ল। আম্মা পণ করালেন আর কোনদিন কারো জিনিস না বলে খাব না। না বলে নেওয়া ই চুরি।

আরো অনেক রকমের ফল গাছ ছিল আমাদের বাড়িতে। শুধু আমাদের বাড়িতে নয় পুরো গ্রামে প্রায় সবারই ছিল কমবেশি। বরই, পেয়ারা, খেজুর, দেশি গাব (যা দিয়ে মূলত মাছ ধরার জাল শক্ত করা হত), বিলেতি গাব, ডেউয়া, জাম্বুরা, আনারস, কাউ, তাল, চালতা ইত্যাদি। বারমাসি ফল কলা, নারকেল তো ছিলই, এখনো আছে।

একবার বেপারি বাড়ি এলে আম্মা সব নারকেল (পঞ্চাশ জোড়া সম্ভবত) একসাথে বিক্রি করে দিলেন। দু’একদিনের মধ্যেই আবার কাউকে দিয়ে পাড়িয়ে নিবেন এই ইচ্ছা। পরদিন মৌসুমের প্রথম তাল পড়ল। তাল রান্নায় আমাদের এলাকায় নারকেল সাথে দেওয়া হয়। ঘরে নারকেল নেই, আম্মার অনুশোচনা হচ্ছে কেন সব নারকেল বিক্রি করলেন! কাউকে পাওয়া ও যাচ্ছে না, গাছে উঠার মতো। এমন সময় পুকুরের পাড়ের গাছ থেকে নারকেল পড়ল, ভাবি দৌড়ে গেলেন। আম্মা ও খুব খুশি, সময় মতো একটা নারকেল পড়েছে। নারকেল নিয়ে ভাবি বাড়ির দিকে ফিরতেই আরেকটা। ততক্ষণে আম্মা ও এগিয়ে এসেছেন। উপরে তাকিয়ে দু’জনই হতবাক।

আমাদের খেজুর গাছ ছিল ডজনখানেক। কারো কারো বিশ/পঁচিশটাও ছিল। শীতকালে খেজুর গাছের ছাল কেটে হাড়ি বসানো হত রসের জন্য। সে রস আমরা এমনি খেতাম, আগুনে জাল দিয়ে গুড় করা হত, চাল দিয়ে পায়েস রান্না হত। আমার জ্বিহ্বে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু’টি স্বাদের একটি আম্মার হাতের কবুতরের বাচ্চার মাংস আর অন্যটি কাঁচা খেজুর রস। আমরা মানুষ জটিল হয়ে রোগ বালাই এনে এখন আর মানুষ বাদুড় বাহিত রোগের ভয়ে খেজুর রস খেতে চায়না বা পারে না। সেসব স্বাদ তাই বর্তমান প্রজন্মের অচেনাই রয়ে যাবে।

ঐ যেদিন নানীর কাঁঠাল গাছে আম্মার হাতে ধরা পড়েছিলাম, তারপর আর অন্যের জিনিস চুরি করিনি। চুরি করেছি নিজেদের বাড়ির ফল, বন্ধুদের নিয়ে খেতে। একবার সাব্যস্ত হল চারা ওয়ালা নারকেল চুরি করব, ভেতরের নরম ফোসকা খাওয়ার জন্য। চুরি করবে পাশের গ্রামের দুই বান্ধবী, আমি পথে দাঁড়িয়ে পাহারা দেব। (সোমবার হাঁটের দিন, আমি বাজার করতে গিয়ে একটু দেরি করে বাড়ি ফিরব। সন্ধ্যায় অভিযান।) কাউকে আসতে দেখলে সিগনাল দেব, ওরা পালাবে। যেখানে নারকেল রাখা আছে সেখান থেকে নারকেল নিয়ে বেশ বড় সুপারি বাগান পার হয়ে পথে আসতে হবে।
সেখানে শুকনো পাতার মচমচ শব্দে কেউ না কেউ টের পেয়ে যেতে পারে। এই কারণে দুই বান্ধবী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বদল করে পাশের বাড়ির খালার একজোড়া নারকেল নিয়ে এল। যা ছিল একদম পথের পাশেই। ওদের নির্দিষ্ট পথ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। পরদিন সকাল বেলা স্কুলে যাবার সময় দেখি আমাদের নারকেল তো ঠিকঠাক আছে পাশের বাড়ির খালাদের নারকেল চুরি হয়েছে। যা বুঝার বুঝলাম। তিনমাস আগে আম্মার সাথে ভিডিও কলে কথা বলার সময় খালাকে বলেছি সেই চুরির কথা। ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি।

আমি জন্মের দস্যিপনা করে কাটিয়েছি আমার কিশোরীবেলা। আমাদের একটা আমড়া গাছ ছিল। তত মজার নয় ‘আঁটি আর চামড়া’ সর্বস্ব। তবু সে গাছটা ছিল আমার ও সমবয়সীদের ভীষণ প্রিয়। পুকুরের দিকে ঝুঁকে থাকা সে গাছ থেকে আমরা পানিতে ঝাঁপ দিতাম। তাই গ্রীষ্মের পুরো সময় আমড়া গাছের গোড়াটা ভেজা থাকত।

বাতাবিলেবু গাছ ছিল আমাদের বাড়িতে অনেক প্রকারের। অন্যান্য বাড়িতেও ছিল। একটার নাম ছিল কাগজি লেবু, একটা শুধু লেবু আরেকটা জামির। তিনটার তিন রকমের ঘ্রাণ। ডুমুর গাছ ছিল আমাদের এবং সবার। দু’রকমের ডুমুর। একটা দেশি ডুমুর, ওটা পাকলে কালেভদ্রে আমরা খেতাম। অন্যটাকে বলতাম বন্যা ডুমুর। বন্য থেকে বন্যা…. বনে বাদাড়ে এত এত ধরে থাকত, কেউ তো খেতই না; উল্টো আমরা বলতাম বন্যা ডুমুর খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। আসলে ডুমুর যে একটা ফল এটাই জেনেছি অনেক পরে। শুধু ডায়রিয়া হলে কচি ডুমুর সিদ্ধ করে পাটায় পিষে সামান্য জিরা আর গোলমরিচ দিয়ে অল্প তেলে ভেজে ভাত খেতে দিত। ডায়রিয়া ভাল হয়ে যেত।

আমাদের বেলগাছ ছিল না। পাশের বাড়ির নানীর ছিল। পেটের পীড়ার জন্য বেলের শরবত ও খাওয়ানো হত। বেতমুড়া ছিল আমাদের, বেথুন হত। পরে কাঁটার যন্ত্রণায় কেটে সাফ করে ফেলা হয়েছে বেতঝাঁড়। বাঁশমুড়া ছিল, এখনো আছে। বৈচি, জামরুল, লিচু, ডালিম, কামরাঙ্গা, আতাফল, তেতুল ছিল না আমাদের, অন্যবাড়িতে ছিল। তেতুল গাছ নিয়ে মজার একটা কাহিনী আছে।

পাশের বাড়ির খালাদের তেতুল গাছ পুকুরের পশ্চিমপাড়ে জঙ্গলের ভেতর। উত্তরপাড়ে ও ঝোঁপজঙ্গল, দক্ষিণপাড়ে আমাদের বাঁশঝাঁড়। তার পশ্চিম মাথায় আমার আপার কবর। দিনের বেলায়ও সেখানে সূর্যের আলো প্রবেশ করেনা, কেউ সহজে যায়ও না। একদিন আমার পুতুল খেলার সাথী শানু, জামাল আর আমি ‘মিশন তেতুল’ এ বের হলাম। শানু আর আমি গাছে উঠলাম জামাল নিচে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর জামাল বলল, আমার ভয় করছে। আমি যাই বলে এক দৌড়ে বাড়িতে। বাড়ি গেল তো গেল, আম্মাকে বলে দিল সবকিছু। বাড়ি যেতেই আম্মা বকা শুরু করল, তোর এত বড় সাহস এই ভরদুপুরে তুই তেতুল গাছে উঠস? তোরে আমি তেতুল এনে দিতাম গাছে উঠতে গেলি কেন? তোরে যদি ভুতে ধরত!? আমি দূরে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলি, ভুতে আমারে কি ধরবে, ভুত দেখলে তো আমিই ধরতাম!? দেখলাম না তো! আস্তে আস্তে আম্মার দিকে আসতে থাকি আর বলি, আচ্ছা আম্মা আমার এমন ফেরেশতার মতো বোনের কবরের কাছে ভুত থাকবে কেন? থাকলে জ্বীন, পরী থাকবে; ওকে দেখে রাখবে। আমার কথায় আম্মার মন অন্যদিকে চলে যায়, আপার কবরে ঠিকমতো মাটি আছে কিনা এসব জিজ্ঞেস করতে থাকে, বকাঝকা মূহুর্তেই শেষ।

#ফুল#
আমাদের পুরো গ্রাম জুড়ে ছিল নানা রকমের ফুল গাছ। দুই ধরনের জবা ফুল ছিল। একটা কে আমরা জবা আর অন্যটা কে রক্তজবা বলতাম। ছোটবেলায় আমরা চারটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চারকোনা ঘর বানাতাম। তারপর তাতে জবা ফুল দিয়ে সাজিয়ে পুতুল পুতুল খেলতাম। আমার সবসময় মেয়ে পুতুল থাকত, শানুর ছেলে, ওদের বিয়ে দিতাম কিন্তু কখনোই শানুদের বাড়ি নিতে দিতাম না আমার মেয়ে পুতুলকে। সে নিয়ে শানুর অনেক অভিমান ছিল আমার উপর।

বাড়িতে টগর ফুলের গাছ ছিল একটা, বেশ বড়। হলুদ সে ফুল দিয়ে মালা বানাতাম আর তার বিচি দিয়ে পাঁচগুটি (আঞ্চলিক ভাষায় যাকে ধাপ্পা খেলা বলত) খেলতাম।

আমাদের বাড়িতে বিশাল বড় এক বকুল ফুলের গাছ ছিল, এখনো আছে। বকুল আমার শৈশবের প্রথম প্রেম। আমার প্রিয় ফুল। আমার শৈশবের সবচেয়ে মধুর অনুভূতিগুলো তাকে ঘিরে। আম্মার কাছে সবচেয়ে বেশি বকুনিও শুনেছি এরই কারণে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আম্মা কাঁথা সেলাইয়ের জন্য মানুষ ডাকবেন, সে জন্য আগেই সুঁই কিনে কেরোসিন তেলে ভিজিয়ে রাখতেন। আমি বকুল ফুলের মালা গাঁথতে গিয়ে একটা দুটো করে কখনো কখনো সবগুলো সুঁইই হারিয়ে ফেলতাম। আম্মা খুব রাগ করতেন, বকাও দিতেন।

আমার কৈশোরে এলাকার ছেলে মেয়ে বয়স্ক লোক মানে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলকেই আমি বকুল ফুলের মালা দিতাম। আট দশটা মালা দু’হাতে, গলায় পেঁচিয়ে স্কুলে যেতাম, ফেরার সময় একটা/ দুটোর বেশি থাকতো না। সে এক অন্য রকম আবেগ আর আনন্দের বিষয় ছিল। কত স্মৃতি এই মালাকে ঘিরে…….
ক্লাস সেভেনের বছর একদিন মৌলানা স্যার ক্লাসে এসেই বললেন, কিরে সুমী আমারে মালা দিবি না? শেষ মালাটাই তখন আমার বাম হাতে পেঁচানো; একদম দিতে ইচ্ছা করছিল না, সত্যি! নেয়ায়েৎ স্যার মুখ ফুটে চাইলেন, অনিচ্ছায় দিয়ে এলাম। পরদিন শুক্রবার, তারপর দুদিন স্যার স্কুলে এলেন না। সোমবার সন্ধ্যায় মাইকিং হচ্ছিল, স্যার মারা গেছেন। নিজের কানকে বহুবছর আমি বিশ্বাস করাতে পারিনি, ঐ হাতে আমি আর মালা দেব না। সেদিন শেষ মালাটা স্যারকে না দিলে আমি সারাজীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলতাম।

আমাদের ছাতিম গাছ ছিল। এই ফুলের ঘ্রাণের তীব্রতা বলে বুঝানো যাবেনা। ছাতিম ফুলের ডাল ভেঙ্গে ঘরে এনে রাখতাম। একদিন ছোট ভাইয়া বললেন, ছাতিম ফুলের ঘ্রাণে সাপ আসে। বিশ্বাস করতে চাইনি, পরে একদিন গাছে
সুতানলি সাপ দেখে বিশ্বাস করেছি। সেই থেকে এই ফুল ঘরে আনা বাদ দিয়েছিলাম।

শিমুল গাছ ছিল আমাদের। গ্রামের প্রায় সবারই ছিল দু’তিনটা করে। শিমুলের ফুল ফোটার সময় আমাদের এক আনন্দ হত, শিমুল তুলা তোলার সময়ও। আমরা ছোট রা তুলা উড়িয়ে মজা করতাম, বড়রা বকাঝকা করত।

কদম গাছ ছিল অনেকগুলো। ছিল সোনালু গাছও। কত রকমের খেলা হত এসব ফুল দিয়ে। কদমের পাপড়ি দিয়ে সেমাই রান্না হত। সোনালুর পাপড়িতে বিনা সুতোর মালা। এসব গাছ-ফুলের কথা মনে এলেই আমি ভেসে যাই শৈশবের সবুজ জীবনে। গন্ধরাজ, শিউলি, কাঁঠালচাঁপা, মাধবী, গাঁদা, টাইমফুল, নটার ফুল, গেইটফুলসহ নাম না জানা আরো কত রকমের ফুল ছিল আমাদের গ্রাম জুড়ে।

৯২ সালের শুরুর দিকে দাদী মারা গেলেন। নতুন মাটি ফেলে কবরস্থান করে দাদীকে কবর দেওয়া হল। সেবছর কবরস্থানে কয়েক জাতের গাঁদা, টাইমফুল আর ঠিক দাদীর মাথার কাছে একটা গন্ধরাজ লাগিয়েছিলাম। গন্ধরাজ গাছটা এখনো আছে, প্রতি বর্ষায় ফুলের সুবাস বইয়ে দেয় আমার দাদী, আব্বা আর ছোট ভাইয়ার কবরের কাছটা জুড়ে।

আমাদের স্কুলের আঙ্গিনায় রাস্তার পাশে ছিল কৃষ্ণচূড়ার গাছ। জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মাসে সারি সারি ঐ গাছগুলোতে যেন আগুনের ফুলকি লেগে থাকত। পৃথিবীর খুব কম সৌন্দর্যই আমার কাছে ঐ বিশেষ সুন্দরের সাথে তুলনীয় হবে/হত। রাস্তা প্রশস্ত করার সময় সবগুলো গাছ কাটা পড়েছে। কৃষ্ণচূড়াবিহীন চন্দনা বাজারকে আমার কাছে অচেনা, রুক্ষ, মৃত মনে হয়।

আমার শৈশব কৈশোরে আরো কত কত ফুল দেখেছি, নাম জানিনি কখনো। সটি ফুল, হলুদের ফুল, ঢোল কলমির ফুল, এলাচ ফুল কিংবা কচুরিপানার ফুল এসবকে ফুল বলে মর্যাদাই দিতাম না। বনে বাদাড়ে সমানে ফুটে থাকত। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারির দিনে এসব ফুলের কদর হত। আমাদের পুকুরে শাপলা ছিলনা, গ্রামের বেশ কয়েক বাড়িতে ছিল। আর বর্ষার সময় ধানক্ষেতে মাইলকে মাইল হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ শাপলা ফুল ফুটে থাকত। আমরা সেসব ফুল দিয়ে খেলতাম, আর শাপলা দিয়ে তরকারি রান্না হত।

আমাদের গ্রামের কারো পুকুরে পদ্ম ছিল না। পাশের গ্রামের শীল বাড়ির পুকুরে পদ্ম ছিল। ওটাকে শীল বাড়ির পদ্মপুকুর নামেই ডাকতাম আমরা। কী যে তার সৌন্দর্য! অন্যদিকে শীত মৌসুমে শর্ষের বিশাল মাঠ, ফুল আমার শৈশবের চোখে দেখা পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরতম দৃশ্য।

#ঔষধি গাছ#
নানান জাতের ঔষধি গাছ ছিল আমাদের গ্রামে। আমাদের ছিল না, অন্য বাড়িতে হরিতকি, আমলকি, গন্ধবাদালি গাছ ছিল।
আমাদের ঠিক পশ্চিম পাশের বাড়িতে ছিল হরিতকি, আমলকি গাছ। প্রতি ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ওগুলো কুড়িয়ে আনতাম, স্কুলে নিয়ে অন্য গ্রামের ছেলেমেয়েদের দিতাম। স্কুলে যাওয়ার সময় বাড়ির সামনে দিয়ে যেতাম আর চিৎকার করে বলতাম নানী আমলকি, হরিতকি পাইছি, নিয়ে যাচ্ছি। নানা ছিলেন কুমিল্লা বোর্ডের কর্মকর্তা। আদর করে বুবু ডাকতেন। একবার ছুটিতে তিনি বাড়ি ছিলেন। ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আশপাশের পাঁচ গাঁয়ের বাচ্চারা হরিতকি/ আমলকি নিয়ে বাড়ির পেছনের পথ দিয়ে চলে যায়। আচ্ছা বুবু আপনি কেন বাড়ির সামনে দিয়ে যান, বলে যান!? বললাম, নানা আম্মা বলেছেন না বলে নিলেই চুরি। তাই বলে নিই, নানীর সামনে দিয়ে নিই। নানা বললেন, আম্মা তো ঠিকই বলেছেন, আজকে থেকে আপনাকে অগ্রিম অনুমতি দেওয়া হল, যখন গাছ তলায় যা পাবেন (বকুল ফুল, হরিতকি, আমলকি, চালতা) সব আপনার। কেউ আপনাকে কিচ্ছু বলবেনা। তখন আজকের মতো ফরমাল ধন্যবাদ জানতাম না আমরা, তাই “আচ্ছা ঠিক আছে নানা” বলেই স্কুলের পথে পা বাড়িয়েছিলাম। আজ নানা, নানী কেউ নেই শুধু ভালবাসার স্মৃতিটা বয়ে বেড়াচ্ছি অন্তরে।

আমাদেরএলাচ বাগান ছিল, আরেক বাড়িতে ছিল তেজপাতা গাছ। পেটে পীড়া হলে আমরা একধরনের পাতার রসের শরবত খেতাম (স্যালাইনের বিকল্প) মেন্দা পাতা বলত ওটাকে। আর গন্ধবাদালি পাতার ভর্তা। সর্দি জ্বর হলে সজনে গাছের ছাল বা সজনে ফুলের ভর্তা করে খেলে ভাল হয়ে যেত। কোথায় হারিয়ে গেছে এসব, আজকের দিনের বাচ্চারা এসবের নাম ও শোনেনি।

ভাইয়ারা বলেন, আমাদের বাড়িটা কেনার সময় বা তারপরে তার পঞ্চাশ শতাংশ ঝোঁপজঙ্গল পরিষ্কার করা হয়েছে। আমি বুঝের হওয়ার সময় পর্যন্ত পুরো গ্রামেরই সত্তর শতাংশ সাফ করা হয়ে গিয়েছিল। বাকি ত্রিশ শতাংশের মধ্যেই ছোট নেকড়ে বাঘ (স্থানীয়ভাবে আমরা তাকে বাঘডাস বলতাম) থাকতে পারত। বন কাটার ফলে বাঘটার খাদ্যাভাব দেখা দেয়। গ্রামের মানুষদের হাঁস-মুরগী এমনকি ছাগলের বাচ্চা নিয়ে যাওয়া শুরু করে। ফলে গ্রামের যুবকরা যারা নাইন টেনে পড়ত তারা বাঘটাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। ‘৮৮ সালের বন্যার সময় চারদিকে থৈ থৈ পানি তখন সবাই মিলে জঙ্গল ঘেরাও করে। বাঘটা বাঁচার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করেছিল। তিন গ্রাম তাড়া করেছিল ওরা বাঘটাকে। আমার বয়সীরা বাঘ তাড়া করছে বলে ভয়ে যখন ঘরের কোণে লুকিয়ে ছিল, আমি বড় ভাইদের পিছন পিছন তিন গ্রাম দৌড়েছিলাম। ছোট ছিলাম বলে সেই হত্যাযজ্ঞে অংশ নিতে পারিনি, কিন্তু আনন্দোল্লাস করেছিলাম। তখন সেটা ছিল মজা, কৌতুহল আর কিঞ্চিত বীরত্বের, বড়দের পিছু পিছু আমিও বাঘটাকে তাড়া করেছিলাম কিনা! এখন মনে হলেই কষ্ট পাই।

#শহুরে আমি#
তারপর বদলে যাওয়া আমি শহরে গেলাম। সেখানেও সবুজের মোহ আমি ছাড়তে পারিনি কখনো, কোনদিন। চট্টগ্রাম সেনানিবাস উচ্চ বিদ্যালয়ের সবুজ চত্তর, আর চট্টগ্রাম পাবলিক কলেজের সবুজে চোখ রেখে এগিয়েছে আমার শিক্ষাজীবন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আমাদের বাসার পাশেই ছিল ছোট ছোট পাহাড়। ভাতিজি সমবয়সীদের সাথে পাহাড়ে উঠত, আমি তাকে ডেকে আনতে যেতাম। নিচ থেকে না ডেকে উল্টো নিজেই উঠতাম, তারপর বলতাম চল আরো উপরে উঠি। বাসায় বলবিনা, তাহলে আর কখনো আসতে দিব না। স্কুল, কলেজের চার বছরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের অপরূপ শ্যামলিমা প্রাণভরে দু’চোখে দেখেছি আমি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পড়ার সময়কাল পর্যন্ত ১৯৯৬-২০০১) বেশ সবুজ দেখা যেত। মল চত্তর, হাকিম চত্তর, টিএসসির সড়ক দ্বিপ, কার্জন হলের পুকুর পাড় কিংবা ফুলার রোড়ের দিকে অনেক গাছ ছিল। কুয়েত-মৈত্রী হলের সামনে ছিল বিশাল সবুজ খোলা মাঠ। এখন সেখানে নতুন হল হয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ইট-সুরকির ঠাঁসবুননে কোনঠাসা হচ্ছে সবুজ।

ছাত্রাবস্থা থেকেই আমার ঘরে একটি হলেও গাছ থাকত সবসময়। ভেতরটা জংলী বলেই হয়তো একটু সবুজ চোখে না পড়লে ভাল লাগতো না, লাগে না।সবুজ আমার প্রাণ বাঁচায়, আমাকে আমি রাখে। লতায়-পাতায় জড়িয়ে, বনে-বাদাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ে উঠেছি বলেই ইট পাথরের শহুরে সভ্যতার চেয়ে সবুজের ঐশ্বর্য ই আমাকে বারবার করে, বেশি বেশি করে পিছুটানে।।

প্রাবাসে এসেও আমি আর গাছপালা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। বছর খানেক আগেও আমার দুই রুমের বাসায় ডাইনিং টেবিলে গাছ, টি টেবিলে গাছ, বাথরুমে গাছ, জানালার স্টান্ডে গাছ, জুতার তাঁকে গাছ, বেডরুমে গাছ, কিচেনে গাছ। এক কথায়, কোথায় গাছ নেই, সবখানেই গাছ।

এখন (নিউজার্সিতে) নিজের বাড়িতে আমার গাছ লাগানোয় কোন বাধা নেই। আমি সোনা-দানা, জামা-জুতা এসবের প্রতি কেন জানি আকর্ষণ বোধ করিনা, করিনি কখনো। শপিং মলে গেলে (নিজের প্রশংসা নিজেই করছি, একটু লজ্জা লাগছে) আমার মেয়ে হা করে তাকায় বইয়ের দোকানের দিকে, আমি হা করে তাকাই গাছ পালার দিকে।

আমার বাড়িতে আপেল, পিয়ার ফল, গোলাপ, বেলি ফুল, অর্কিড, এলোভেরা, ক্যাকটাস, মানি প্লান্ট, মানি ট্রি, লাকি ব্যাম্বো, সাকুলেন্ট আরো কত কি গাছ আনছি, লাগাচ্ছি… নামও জানি না। এই গ্রীস্মে কত সব্জি লাগালাম… লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়স, সিম, বরবটি, পুঁইশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, মুলাশাক, মিষ্টি আলু, গোল আলু, ধনে পাতা, দু’রকমের বেগুন, তিন রকমের টমেটো, ক্যাপসিকাম, ঝালমরিচ, কচুশাক। কতটা ফল ধরবে, কতটা ফসল হবে সে নিয়ে ভাবি না, গাছই যে আনন্দ। একটু একটু করে গাছগুলো বড় হয়, আমার আনন্দরাও ডালপালা মেলে ওদের সাথে সাথে।

মাঝেমধ্যে আমাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য আমার জামাই বলে, “যেখানেই নিয়ে রাখি না কেন তুমি সেই জংলী ই রয়ে গেলে! আমার টাকার গুষ্টি সব জলে গেল!” আমি বলি, জলে কই বল জঙ্গলে গেল। আর যেভাবেই তুমি বল বা ভাব না কেন, সবুজে মাখামাখি সরল জীবন ই আমার পছন্দ। ওখানেই আমি সত্যিকারের আমাকে খুঁজে পাই পুরোপুরি না হোক কিছুটা হলেও।

কুলসুম আক্তার সুমি-সাহিত্যিক ও প্রবাসী বাংলাদেশী।

আরও পড়ুন