ধারাবাহিক উপন্যাসঃ – ডাংগুলি (পর্বঃ দশ)

-খোশবুর আলীঃ

কয়েক মাসের মধ্যে সোহেল চৌধুরীর বাড়ির কাজ শেষ হয়ে গেল। বাড়িতে সব নতুন ফার্নিচার দিয়ে সাজানো হলো। আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা যেমন, পানির লাইন, টেলিফোন লাইন ইত্যাদি সংযোগ করা হল। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব অনেকে দেখতে এলো বাড়িটি। সবাইকে সোহেল চৌধুরী মিষ্টিমুখ করে পাঠালেন। সবাই   খুব খুশি হল। গ্যারেজে গাড়ী, গাড়িতে ড্রাইভার, গেটে দারোয়ান, সবকিছুই নিয়োগ দেয়া হল। বাড়িতে কাজের লোক এলো, বাজার করার জন্য লোক এলো মোট কথা তাদের খাওয়া দাওয়া, ঘুমানো, আর দেখাশোনা করা ছাড়া কোন কাজ নেই। বাড়িতে এসে এখন মনাকে তাঁর গৃহ শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে যায়। ফলে মনার পড়াশোনা আরও ভাল ভাবে চলতে লাগলো।

মানুষ ভাবে এক, কিন্তু বিধাতার করে আরেক। মানুষ যাকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করল, আল্লাহ তাঁকে কোথায় পৌঁছিয়ে দিলেন এটা কেউ কোন দিন ভাবতেই পারেনি।

মনা এখন সাহেবের ঘরে, সাহেব জাদা হয়ে বড় হতে লাগল।

মনা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এস,এস,সি পরিক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগ নিয়ে পাশ করল। এবার কলেজে ভর্তির পালা। কিন্তু নাটোরে তেমন ভাল কলেজ নাই। বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গের শিক্ষা নগরী বলা হয় রাজশাহীকে। এখানে সরকারী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যলয় আছে।

তাই মনাকে রাজশাহী কলেজে ভর্তি করার জন্য নিয়ে আসা হল। সোহেল  চৌধুরী তাঁর রাজশাহীর বন্ধু যার সাথে দীর্ঘ দিন যাবত ব্যবসা করে আসছে সেই খোকন মিঞার সহায়তায় একটি ভাল মানের মেসের ব্যাবস্থা করলেন। আর মনাকে   বললেন তোমার কোন অসুবিধা হলে পাশেই আমার বাড়ি চলে আসবে। খোকন মিঞাও বেশ বড়লোক মানুষ। রাজশাহী সপুরায় তাঁর বিশাল ধান-চালের আড়ত আছে। সেই সুত্রেই সোহেল চৌধুরীর সাথে তাঁর পরিচয় এবং ব্যবসা। তিনি সোহেল চৌধুরীর পরিবার সম্পর্কে সব কিছু জানতেন। তিনিও কয়েকবার মনাদের বাড়িতে গেছেন, তাই মনা খোকন চাচ্চুকে ভালভাবে চিনত। সোহেল ছৌধুরীর টেলিফোন পেয়ে খোকন মিঞা আগে থেকেই সব কিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। খোকন মিঞা মনাকে তাঁর বাড়িতে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু সোহেল চৌধুরী তাঁকে কষ্ট দিতে চান নি। ফলে তিনি মেসের ব্যাবস্থা করেছিলেন।

সোহেল চৌধুরী ও মনা রাজশাহীতে পৌছালে, খোকন মিঞা বললেন—

খোকন মিঞাঃ এখন থেকে আমি তোমার আরেক বাবা, তোমার সকল আবদার আমার নিকট করতে পার।

মনাঃ জি চাচ্চু।

সোহেল চৌধুরীঃ তোমার চাচ্চুকে সব সময় জ্বালাতোন করবে না। আর বন্ধু তুমি শুধু একটু দেখে রেখ তাহলেই হবে। মনা খুব ভাল ছেলে, ও পড়ালেখাতেও ভাল।

খোকন মিঞাঃ আমি জানি বন্ধু, তোমার ছেলের কোনই অসুবিধা হবে না।

মনার এক মাসের সকল খরচা পাতি দিয়ে সোহেল চৌধুরী ড্রাইভারকে গাড়ি  ঘুরাতে বললেন। ড্রাইভার গাড়ি ঘুরালে তিনি শেষবারের মত মনার মাথায় হাত বুলিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। অল্পক্ষনের মধ্যেই গাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল।মনা খোকন চাচার থেকে বিদায় নিয়ে মেসের বন্ধুদের সাথে তাঁর রুমে চলে গেল, ফলে খোকন মিঞাও তাঁর বাড়িতে চলে গেলেন।

রাজশাহী কলেজে ফাষ্ট ইয়ারের প্রথম ক্লাস। শান্ত শিষ্ট মনা ক্লাসে একটু সকাল সকাল এসেছে। তাঁর চারপাশে সকল ছাত্ররাই নতুন। কেউ রাজশাহী শহরের আবার অনেকে রাজশাহীর বাইরে থেকে এসেছে।

বাংলা ক্লাসে সকল বিভাগের ছাত্র ছাত্রি উপস্থিত থাকে। সবাই স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে এসেছে।

শিক্ষক নিজের পরিচয় দিয়ে একে একে ছাত্রদের পরিচয় নিতে লাগলেন। সবাই নিজের নাম এবং কোথায় থেকে এসেছে সেটা বলছে।

এবার মনার পালা, মনা দাঁড়ালো এবং তাঁর নাম বলল মইনুল ইসলাম (মনা) পিতার নাম সোহেল চৌধুরী এবং আমি নাটোর থেকে এসেছি।

তাঁর নামের শেষে মনা বলাতে কয়েকজন খিল খিল করে হাঁসছিল।

স্যার ধমক দিয়ে বাঁকিদের পরিচয় নিলেন।

সেদিন সবকটি ক্লাস ভালভাবে করে মনা মেসে ফিরে এল। মেসের বুয়া রান্না করে রেখেছিল। অন্যান্যদের সাথে মনা খাওয়া দাওয়া করে রুমে ফিরে গেল।

বিশ্রাম নিতে গিয়ে মনার প্রথম ক্লাশের কথা মনে পড়ে গেল। কয়েকজন ছেলে মেয়ে তাঁর নাম শুনে হাসছিল। কিন্তু এ নামটি তাঁর আপন বাবার দেয়া। ছোট্ট বেলায় গরু চরাতে গিয়ে সব রাখাল বালকেরা তাঁকে মনা বলেই ডাকত। কিন্তু সে তাঁর বাবাকে হারিয়েছে এই রাজশাহী স্টেশনে।

তাই মনা ভাবল, এখন যখন এসে পড়েছি এই রাজশাহীতে তখন সেই স্টেশনটি আজই একবার ঘুরে দেখতে চাই।

মনার মনটা কেমন যেন সেই আগের মনায় ফিরে গেল। মনটা ছটফট করতে লাগল কখন স্টেশনে যাবে সে।

বিকেল হতে না হতেই মনা বেরিয়ে পড়ল স্টেশনের উদ্দেশ্যে। রাজশাহী নিউমার্কেট হতে স্টেশন পায়ে হাঁটা পথ। এতোদিনে স্টেশনটির অনেক পরিবর্তন  হয়েছে। সেই আগের চেহারা আর নেই।  বই এর দোকানটির কথা শুধু মনার মনে পড়ল।  বাঁকি সব নতুন। অনেক বড় স্টেশন, তাই চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।

স্টেশন ঘুরে দেখার সময় মনার সেই ছোট্ট বেলার দিনগুলি বার বার মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছিল। মনা উদাস মনে ধীর পায়ে দেখছিল সব। সে বুঝতে পারছে না এই স্টেশনে তাঁর বাবার সাথে কোন দিক থেকে এসেছিল। তাঁর বাড়ি রাজশাহী জেলার কোন থানায় সে জানে না। শুধু গ্রামের নাম বৈতপুর এটুকুই তাঁর মনে আছে।

মনা ভাবতে লাগল তাঁর বাবা এখন কোথায় আছে কিভাবে আছে, তাঁর মা ছোট ভাই বোন তাঁরা কি এখনও সেই বৈতপুর গ্রামেই থাকে কি না। এসব কিছু  ভাবতে ভাবতে মনা সেই বই এর দোকানের সামনে গেল। মনে মনে ভাবল দোকান্দারকে জিজ্ঞাসা করলে কিছু জানা যাবে কি না? এক পা দুই পা করে এগিয়ে গেল মনা। সাহস করে প্রথমে সালাম দিল। সালামের জবাব দিয়ে দোকানদার বলল-

দোকান্দারঃ কি লাগবে তোমার?

মনাঃ আপনি কতদিন থেকে এখানে দোকান করেন চাচা।

দোকান্দারঃ এই ধর প্রায় স্বাধীনের পর থেকেই।

মনাঃ তাহলে তো আপনি অনেক কিছুই জানেন এই স্টেশনের।

দোকান্দারঃ হাঁ, জানি তো।

মনাঃ আচ্ছা চাচা, আপনার জীবনে কোন মানুষকে কি দেখেছেন যে এই স্টেশনে হারিয়ে গেছে অথবা ট্রেনের নিচে পড়ে মারা গেছে?

দোকান্দারঃ বহুত দেখেছি বাবা। কত মানুষ হারালো ট্রেনের নিচে কাটা পড়ল, তার হিসাব করে বলা যাবে না।

মনাঃ আচ্ছা চাচা, এই ধরুন প্রায় দশ বছর আগে গরমের সময় কোন মানুষ  কি ট্রেনের নিচে কাটা পড়েছিল কি? যাকে কেউ চিনতে পারেনি?

দোকান্দারঃ এমন কত লোক প্রায় বছরই কাটা পড়েছে। তা কি আর মনে থাকে বাবা, তা এসব কথা কেন বলছ তুমি?

মনাঃ না মানে এমনি?

কিন্তু মনার ছলছলে চোখের দিক চেয়ে অভিজ্ঞ দোকানদার ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, কোন একটা ঘটনার সাথে এই ছেলের জীবনের কিছু একটা সম্পর্ক আছে।

তাই তিনি আজ থেকে দশ বছর আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলি মনে করার চেষ্টা করলেন।

দোকান্দারঃ আচ্ছা বলতো তুমি ঠিক কোন ঘটনার কথা বলতে চাইছ?

মনাঃ জানিনা চাচা। তবে আজ থেকে দশ বছর আগে আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি এই স্টেশনে, আজও তাঁর কোন খবর পাইনি।

দোকান্দারঃ ওহ, আচ্ছা। হারিয়ে গেছে না?

মনাঃ আমি ঠিক জানিনা। আমাকে ট্রেনে বসিয়ে খাবার কেনার জন্য নিচে  নেমে যান, ট্রেন ছেড়ে দেয় , উনি আর ট্রেনে ফিরে আসেন নি?

দোকান্দারঃ তুমি একাই বাড়ি পৌঁছেছ, কিন্তু তোমার বাবা আর বাড়ি যায়নি এই তো ?

মনাঃ না চাচা, বাড়ি না, আমরা অন্য কোথাও যাচ্ছিলাম। কিন্তু কোথায় যাচ্ছিলাম, তা একমাত্র বাবাই জানতেন।

কথা বলতে বলতে মনা তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা সংক্ষেপে বর্ননা করলে মনার প্রতি দোকানদারের কেমন যেন মায়া পড়ে গেল। তাই দোকানদার  পাশের চা এর দোকানে হাঁক দিয়ে দু’কাপ চা দিতে বললেন।

চা এলে, চা খেতে খেতে আরও অনেক গল্প হল । দোকানদারের সাথে মনার বেশ ভাব হয়ে গেল। মনা চা এর দাম দিতে চাইলে দোকানদার বাধা দিলেন এবং নিজেই চা এর দাম দিলেন।

মনা সালাম দিয়ে উঠতে চাইলে দোকানদার মনাকে মাঝে মাঝে তাঁর দোকানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। মনা এমটায় চাইছিল । কারণ এভাবে খুঁজতে খুঁজতে হইতো একদিন খোঁজ পাওয়া যাবে। মনা খুশি হয়ে মেসে ফিরে গেল।

চলবে…

আগের পর্বঃ

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ – ডাংগুলি (পর্বঃ নয়)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন