আনিসুর মামা

-নুরে আলম মুকতা

চরম দুষ্টু ছেলেটিই মাকে রক্ষা করে। আনিসুর মামা ছোটবেলা থেকেই দূর্দান্ত প্রকৃতির ছিলেন। নানা ওকে কোনমতেই পড়ার টেবিলমুখী করতে পারছিলেন না। যত রকমের কসরত ছিলো সব যখন শেষ তখন আর উপায় কি? জামাই কে বলো। কিছু করা যায় কি না। আব্বা শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এ এক কঠিন দায়িত্ব। কেউ নিতে চায় না। মানুষকে মানুষ করার দায়িত্ব নেয়া কি যে মুশকিল! মানুষকে মানুষ বানানো৷! প্রাণপণ চেষ্টায় তো মানুষ। আব্বা আর আম্মার কাছে আনিসুর মামা এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন। আব্বার আইন তো কঠোর। কিন্তু অদ্ভুত এক ভালোলাগা ছিলো এখানে। জীবন কে চেনা যায়। জীবন তৈরির সব অনুষঙ্গ আব্বার জানা ছিলো। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি যা কিছু সহ পাঠ্যক্রমিক কারিকুলাম সব আব্বার জানা। অমানবিক কার্যকলাপের মধ্যে গেলেই সমস্যা। আনিসুর মামা আব্বা আম্মার স্নেহ ভালোবাসায় বশ্যতা স্বীকার না করে পারেননি। মামার উন্নতি দেখে সবাই খুশি। নানা তো যার পর নেই খুশী। দূর্দান্ত আনিসুর কদিন পর ম্যাট্রিক পাশ করে নিয়েছে। কেউ বিশ্বাস করতে চাইছিলো না। আব্বা কিভাবে এটি সম্ভব করেছিলেন? কোন মন্ত্রনায় আমরা এ জারিজুরি কিছুই অর্জন করতে পারলাম না। অনেক ছাত্র একদম বখে যাওয়া,বিভ্রান্ত,কক্ষচ্যুত তারাও আব্বার সংস্পর্শে এসে ম্যাট্রিকুলেশন অর্জন করে ফেলতো। এ যেন পরশ পাথরের কাহিনী। আনিসুর মামা তখন ইন্টারমেডিয়েট এর গন্ডি পেরিয়ে গিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের পথে। তরপরও বাড়ি যান না। ছুটি পেলেই আম্মার কাছে। পরে কারনটি আমরা জেনেছিলাম। কিন্তু আব্বা ওটি স্বীকার করেন নি। আব্বা বলতেন, হাঁ ওটি একটি কারন। কিন্তু ও আমার আর তোমাদের আম্মার সংস্কৃতিটি নিজের জীবনে একান্ত করে নিয়েছিলো বলে ওর নিজ বাড়ি ওকে ভালো লাগতো না। আমি পরে মামাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ও বাড়িতে তো সবাই সিগারেটের ব্যবসা করতো তাই যেতাম না। মায়ের সাথে দেখা করে আমি আপার কাছে চলে আসতাম। কি ভালোবাসা আর প্রেম? আনিসুর মামা আমাদের বাড়িতে থাকার সময় আমাদের এক খালাম্মার প্রেমে পড়ে যান। আব্বা বিষয়টি জানার পরেও কিছু বলেন নি। আম্মাকে আব্বা যুক্তি দিয়েছিলেন,তোমার বোনের যোগ্য আনিসুর। ও বি এ পড়ছে। আর কি চাও? মামা আর খালাম্মার প্রেম ভালোবাসা তখন চুড়ান্ত পর্যায়ে । আব্বা এর সফল পরিনতির ছক কষছেন ঠিক তখনই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে বেজে গেলো যুদ্ধের দামামা। মামা কি আর বসে থাকার মানুষ? শুরু হলো মুক্তি সংগ্রাম। আব্বার অনেক ছাত্র সাথে নিয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা দাঁপিয়ে বেড়াতেন মামা। সম্মুখ যোদ্ধা, স্বশস্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের নীতি নির্ধারক আনিসুর। ভয়ানক আর সাহসী। মামাকে দেখলেই বোঝা যেত লড়াকু কাকে বলে। পেটানো শরীর আর বলিষ্ঠ। কিন্তু ধীর আর শান্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন কাজের অজুহাতে আব্বা আর আম্মার কাছে চলে আসতেন। একদিন মধ্যদুপুর। আব্বা আর আম্মা যোহর নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমি ছোট শিশু কি যেনো খেলছিলাম। মামা পোশাকি শরীরে অস্ত্র কাঁধে হাজির। আপা তাড়াতাড়ি ভাত দেন বলে পোশাক খুলে ফেলে আব্বার লুঙ্গী পেঁচিয়ে হাত-মুখ ধুঁতে চলে গিয়েছেন। আম্মা , আব্বার মুখের দিকে চেয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। আব্বা বুঝে গিয়ে আম্মাকে বলেছিলেন, বাড়িতে দুপুরের খানা যা অবশিষ্ট আছে তাতে আনিসুরের হবে না। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ভাবীর কাছ থেকে ভাত তরকারি যা পাই আনছি। বাড়ির গুলো বেড়ে রেডি করো। ভাবী তো তোমাকে কিছু বলবেনা। কিন্তু ওদের বড় পরিবার। যদি? আম্মার যদি তে পাত্তা দেয়ার লোক আব্বা ছিলেন না। তাই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আব্বা জানতেন, আনিসুরকে তখন পেট পুরে ভাত দিতে হবে। আম্মা ইতিমধ্যে নামাজ শেষ করেছেন। মামা একটি কাগজ হাতে নিয়ে আঁকিবুকি কি যেন দেখতে ব্যাস্ত। পরে মামার কাছ থেকে জেনেছিলাম ওটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমর কৌশলের হাতে আঁকা মানচিত্র ছিলো। পরে আব্বার সহযোগিতায় মানচিত্রটি মামা বুঝে নিয়েছিলেন। আব্বা একটি গামলাভর্তি ভাত-তরকারি কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরলে আম্মা তাঁর চিরন্তন স্বর্গীয় মুচকি হাসি দিয়ে আব্বার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমার শিশু মনের চরম কৌতুহল তখন আব্বার বিছানায় রাখা মামার হাতিয়ারটির দিকে। আব্বা নামাজে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। আম্মা মামার জন্য ভাত বাড়ার কাছে ব্যাস্ত। মামা মনোযোগ দিয়ে মানচিত্রটি দেখছেন। আমি হাতিয়ারটিতে হাত দিতেই খুট করে যেই একটি শব্দ উঠেছে ওমনি মামা এক লাফে আমাকে এসে কোলে তুলে নিয়ে থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছেন। আব্বা সালাম ফিরিয়ে মামা আর আমার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে বলেছিলেন। কি হলো? এখনি সব শেষ হয়ে যেত দুলাভাই। লোড এসএমজির ট্রিগারে ও হাত দিয়ে দিয়েছিলো। আব্বা আমাকে দ্রুত কোলে নিয়ে বলেছিলেন, আনলোড কর। মামা কাঁপা হাতে আনলোড করা কার্তুজ গুলোর কাছে হাতিয়ারটি রেখে আব্বার কোল থেকে আমাকে বিছানায় নামিয়ে বলেছিলেন, খেল এবার কতো খেলবি। কিছুক্ষণ আগে তোর জীবনের খেলা শেষ হয়ে যেতো। আম্মা আর আব্বা ততক্ষনে বিছানার সামনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। আমিতো কিছুই তেমন বুঝিনি। আমার চোখের সামনে এখনো ঐ চকচকে কার্তুজগুলো মাঝে মাঝে ভেসে বেড়ায়। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুর রহমান গত বছর আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আমরা একজন বিশাল অভিভাবক হারিয়েছি। আম্মা-আব্বা পরপারে চলে যাবার পরেও আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করার সময় মামা জোরে আর ভরাট গলায় বলতেন,আপা দরজা খোলেন আমি আনিসুর।

নুরে আলম মুকতা কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক,  মহীয়সী।

আরও পড়ুন