আমাদের বাবু ও বই

ডঃ উম্মে বুশরা সুমনা

রুপার ছেলে বাবু আজ পুরো মাতাল হয়ে ঘরে ঢুকেছে, ঘর বাড়ি তোলপাড় করেছে, গালি গালাজ করছে। রুপার নিজের ছেলেকে নিজেরই মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে।একে সে পেটে ধরেছে! ছিঃ ঘৃণায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।

আজকে শাশুড়ির কথা খুব মনে পড়ছে। এইমহিলাটাকে সে একদম সহ্য করতে পারত না, কিন্তু তিনি ভুল ছিলেন না, এখন তাসে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
বিয়ের সাত বছর পর রুপার ছেলে বাবুর জন্ম হয়েছিল। তাই আহ্লাদ একটু বেশিই ছিল। কখনো শাসন করে নি। যা চেয়েছেতাই দিয়েছে।‘শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন’নীতিতে সে বিশ্বাসী ছিল। সে কখনো না বলেনি কারণ তাতে যদি বাবুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

বাবুর যখন ৮ বছর, তখন সে চার তলা বিল্ডিং এর ছাদ থেকে সেজে ছাতা খুলে প্যারাসুট বানিয়ে লাফ দিতে ধরেছিল,ভাগ্যিস,কাজের ছেলে কালুটা ওকে আটকে ধরে চিৎকার দিয়েছিল। সেদিন বাবুর দাদি ইচ্ছে মতোরুপাকে কথা শুনিয়েছিল,‘বৌমা,আজকে হ্যাঁ বললে না যে ? বাবু আগুনে হাত দিতে চাইলে কি তুমি না করবে না ? ওর ভালোর জন্যই তোমাকে শাসন করতে হবে,অপরাধের শাস্তি ও দিতে হবে।ওর মধ্যে শাস্তির ভয় ঢুকাতে হবে।ভালো কাজের পুরস্কার আর মন্দের শাস্তি দিতে হবে, বুঝলে?’

ওনার কথা গুলো সেদিন রুপার খুব অসহ্য ঠেকেছিল। রুপা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলেছিল, ‘আপনি সাত ছেলের মা আর আমি সাত বছরের অপেক্ষার প্রাপ্তি একটা মাত্র ছেলের মা। আপনি আর আমি এক নই। আমার বাবুকে ওভাবে কঠোরভাবে আমি মানুষ করতে পারব না।ও এভাবে আদরেই বড় হবে।ও কাঁদলে, কষ্ট পেলে আমার বুকটা ফেটে যায়। আপনার তো সাতটা ছেলে, আপনি এই কষ্ট বুঝবেন না।’

বাবুকে নিয়ে শাশুড়ির সাথে প্রতিটা ক্ষেত্রে রুপাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। নিজেকে ‘সাস ভি কাভি বউ থি’সিরিয়ালের তুলসীর মতো সংগ্রামী মনে হতো তার। বাবুর স্কুলের হাজারটা বই,তার মধ্যে তিনি হুজুর ডেকে আরবি শেখাতে চাইতেন।নামাজ,রোজা করাতে চাইতেন।কিন্তু এগুলোর সময় কোথায়? বাবুকে এ প্লাস পেতেই হবে,ওর সাথে রুপাও দিন রাত খেটে ছিল, বাবু তার মান রেখেছিল। তখন রুপা তার শাশুড়িকে বেশ কথা শুনিয়েছিল। বাবু যে ভালো ছাত্র, ও যে খারাপ ছেলে না তা বুঝিয়ে দিয়েছিল।

তারপর একদিন নৈতিক আর ধর্মহীন শিক্ষায় উজ্জীবিত এ প্লাসধারী বাবু কিভাবে যেন অন্ধকার জগৎএ হারিয়ে গেল রুপা টেরও পেল না।
বাবু সেক্যুলারিজম,নাস্তিকতা আর আধুনিকতা শিখেছে।ধর্মীয় নীতি নৈতিকতা কিছুই শেখেনি,পাপ পুণ্যের পার্থক্য শেখেনি।কারণ এটাকে রুপা গোঁড়ামি হিসেবে নিয়েছিল। রুপার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আজাদের ‘বই’নামক কবিতাটা পড়ে তার মনে হয়েছিল, আসলেই তো ধর্মীয় বই শুধু ভয়ই দেখায়, বাচ্চাকে এত ভয়, এত অনুশাসনের মধ্যে রাখলে বাচ্চা বিগড়ে যাবে।

যে-বই তোমায় দেখায় ভয়
সেগুলো কোনো বই-ই নয়
সে-বই তুমি পড়বে না।
যে-বই তোমায় অন্ধ করে
যে-বই তোমায় বন্ধ করে
সে-বই তুমি ধরবে না।

এই কবিতাটি পড়ে রুপার মনে হয়েছিল যে আসলেই আমাদের ধর্ম গ্রন্থ আমাদের ভয় দেখায়,শাস্তির ভয় দেখায়,চুরির শাস্তি হাতকর্তন,ব্যভিচারের শাস্তি নর-নারী দুজনকেই সম্মুখে একশত বেত্রাঘাত,অন্যায় ভাবে হত্যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড,এসব ইহকালীন শাস্তির প্রয়োগের আদেশ আবার গান-বাজনা, কনসার্ট, বেপর্দা, সাজ-সজ্জা, ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্ব সব কিছুতেই শুধু নিষেধাজ্ঞা। প্রতিটা ক্ষেত্রে পরকালীন শাস্তির শুধু ভয় আর ভয়। বাচ্চাকে এত ভয় দেখালে তার তো মুক্তবুদ্ধির বিকাশ হবে না। এসব ভেবে রুপা কখনো বাবুকে কোনো ধর্মীয় বই পড়তে দেয় নি। বাবু উদারমনা আর বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে বেড়ে উঠবে, তার মধ্যে কোনো গোঁড়ামি থাকবে না।এটাই রুপার চাওয়া ছিল।

বাবু সে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেছিল।বাবু এখন এতটাই উদার মানসিকতার যে সে ছেলে আর মেয়েতে কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না, আজ এই গার্লফ্রেন্ড তো কাল আরেক গার্লফ্রেন্ড নিয়ে রাত কাটায়। সে পানির মতো মদ গিলে। গালিবিদ্যা আর গাঞ্জাবিদ্যায় সে তুখোড়। রাতে ছাদে সব বন্ধু মিলে হল্লা করে, গিটার বাজায় আর গাঞ্জা ফুঁকে।মাঝে মাঝে উচ্চ ভলিউমে গান ছেড়ে দিয়ে নাচে। প্রতিবেশীরা বিরক্ত হয়ে অভিযোগ করলে সে তেড়ে আসে। ভয় পেয়ে সবাই চলে যায়।
রুপা নিজেও এখন ছেলেকে ভয় পায়। অপমানিত হবার ভয়ে সে চুপ হয়ে থাকে।আজ সে মাতাল অবস্থায় রুপাকে মারতে এসেছিল। হায়, তার এ প্লাসধারী সোনার ছেলে! গালিবিদ্যা আর গাঞ্জাবিদ্যায় তুখোড় সোনার ছেলে!

টিকাঃ ‘শিশুদের ভয় দেখাতে নেই। ভয় দেখনোর বইগুলো পড়াতেও নাই।’ এসব বলে অনেকেই শিশুদের ধর্ম গ্রন্থ থেকে দূরে রাখেন। আমাদের ধর্ম গ্রন্থ আমাদের ভয় দেখায়,শাস্তির ভয় দেখায়। যেমনঃ চুরির শাস্তি হাতকর্তন (রেফঃ সূরা মায়েদা: আয়াত ৩৮), ব্যভিচারের শাস্তি নর-নারী দুজনকেই সম্মুখে একশতবেত্রাঘাত (রেফঃ সূরা নূরঃ ২) আবার হত্যার বদলা হত্যার হুকুম দেওয়া হয়েছে(রেফঃ সূরাবাকারা: আয়াত ১৭৮)।এসব ইহকালীন শাস্তির প্রয়োগের আদেশ আবার মদ,সুদ,অশ্লীলতা,গান বাজনা আর মাস্তি,বেপর্দা আর সাজসজ্জার প্রকাশ,এমনকি বাবা মায়ের সাথে উচ্চ স্বরে কথা বলাও নিষেধ,প্রতিটা ক্ষেত্রেপরকালীন শাস্তির শুধু ভয় আর ভয়।

ভয় যে দেখাতেই হবে না হলে তো সমাজ স্বেচ্ছাচারিতায় ভরে যাবে। চুরি,ডাকাতি,খুন,ধর্ষণ,হানাহানি,অবিচার,অসম্মান আর অশ্লীলতায়সমাজ ছেয়েযাবে। একমাত্র ধর্মীয় মূল্যবোধ,অনুশাসন আর আইনের প্রয়োগই তো পারে এসব রুখতে। সেক্যুলারিজম আর আধুনিকতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা,বিশৃংখলতা আর নষ্টামী ছড়িয়ে পড়ছে। এসব ঠেকাতে ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই।
ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।(সূরা আলাক: ১)রাসূলে করিম (সা:) বলেন : ‘নরনারীর ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ বা অবশ্যই কর্তব্য।’

এখানে কোন জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়েছে তা অধিকাংশ অভিভাবকেরাই বোঝেন না। মনগড়া ভাবে চললে সন্তান ভালো মানুষ হতে পারবে না। তাই জানতে হবে এরউপাদান,আর এর প্রথম উপাদান হলো সঠিক জ্ঞান অর্জনআর তারএকমাত্র প্রধানউৎস হলো আল-কুরআন, দ্বিতীয় হলো রাসূল (সাঃ) এর সহিহ হাদিস।

স্কুল কলেজের অ্যাকাডেমিক শিক্ষার গুরুত্ব দিলেও আমাদের সমাজের খুব অল্প সংখ্যক অভিভাবকেরা সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে থাকেন। অথচ ধর্মীয় শিক্ষা ফরজ করে দেওয়া হয়েছে।

আমাদের বাই বার্থ মুসলিম সন্তানেরাজ্ঞান অর্জিত মুসলিম হবার পরিবর্তেধর্মহীনতার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম নষ্ট থেকেনষ্টতরের দিকে এগুচ্ছে। এখনো সময় আছে, আমাদের নষ্ট পথে হাঁটা সন্তানদের ফিরিয়ে আনার, স্কুল-কলেজ আর ভার্সিটির অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সাথে সাথে ধর্মীয় শিক্ষার সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

আরও পড়ুন