আমার একটা ক্যামেরা কেনার শখ

 

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে একজন ক্যামেরম্যান কাকু এসেছিল বাবার ছবি তুলতে,
জমিজমার জন্য কয়েক কপি ছবি লাগবে তাই।
ক্যামেরাম্যান কাকুর গলায় ঝোলানো ছোট একটা বাক্সের মধ্যে ছিল তার ক্যামেরা।
মাথা আঁচড়িয়ে, মুখে পাউডার মেখে, বালিশের তলায় চাপা দিয়ে ভাজ করা একটা সাদা জামা পরে বাবা এসে চেয়ারে বসেছিল।
তখন আমার মা, আমরা সবকটা ভাইবোন, পাড়ার হরিদাসী পিসি, কেষ্ট পাড়ুনি
সবাই ছবি তোলা দেখতে এলোমেলোভাবে উঠোনে দাঁড়িয়ে গেলাম।
তারপর কত রকমভাবে যে ক্যামেরম্যান কাকু বাবার চুল,মুখ, জামার কলার, হাতের পজিশন ঠিক করে নিয়ে
বার বার না নড়ার জন্য বাবাকে সতর্ক করে দেওয়ার পর একটা ছবি তুলল তা আর কি বলব?
‘ক্লিক ‘ করে একটা শব্দ,
কী অদ্ভুত একটা যন্ত্র!
মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, নদী, আকাশ সব কিছুর ছবি এই যন্ত্রটা দিয়ে তুলে রাখা যায় !
ছবি তুলে রাখা যায় আমার মায়ের হাসিমুখেরও !
আমি ক্যামেরাম্যান কাকুকে বললাম আমার মায়ের একটা ছবি তুলতে দিতে।
কাকু বলল, জানিস একটা ছবি তুলতে কয় টাকা লাগে?
তারপর কাকু ক্যামেরাটা তার গলায় ঝুলিয়ে সাইকেল চড়ে চলে গেল।
আমরা সত্যিই গরীব, তবুও আমার মায়ের একটা ছবি কি তোলা যেত না?
আমার চোখে জল।
বুঝতে পেরে আমার মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রান্না ঘরে নিয়ে গেল।
তখন থেকে আমার একটা ক্যামেরা কেনার শখ।
তারপর, অনেকগুলো বছর চলে গেছে,
আমি মায়ের কোল ছেড়ে পড়তে গেছি দুরে।
গরীবের ছেলের আবার পড়া!
কখনো খাবারে টান,কখনো বইখাতার ঘাটতি।
সবাই যখন নিজের পড়া নিয়ে ব্যস্ত আমি তখন সচ্ছল বাড়ির ছেলেকে বর্ণমালা শেখাই।
সবাই যখন খেলাধুলো করে তখন আমি ওদেরকে পাশ কাটিয়ে চলে যাই।
মানি অর্ডারেের খোঁজে মাসে দশ বারের বেশি পিওনকে জ্বালাতন করি।
আমারও সবার মত সকাল হয়, দুপুর হয়, খিদে লাগে,
মায়ের কথা মনে পড়ে…….।

আমারও অনেক বার মেঘের বিচিত্র রঙ চোখে পড়ে,
অনেকবার আমি নদীর তীর ঘেষে মাছরাঙ্গা উড়ে যেতে দেখে দাঁড়িয়ে যাই,
অনেকবার লাউয়ের টালে ফিঙের নাচন দেখে তাকিয়ে থাকি,
অনেকবার কারখানার ঘর্মাক্ত শ্রমিকদের শুকনো রুটি চিবোতে দেখে অবাক হয়ে যাই,
অনেকবার সবুজ ধানের ক্ষেতে অর্ধনগ্ন হাড়জিরজিরে চাষিদের দেখে ছবি তুলতে চাই,
কিন্তু না,
একটা ক্যামেরার অভাবে ছবি তুলতে পারি না।
আমি যদি লাল মিয়ার মত নিখুঁত ছবি আঁকতে পারতাম,
তাহলে আমার মায়ের ছবি এঁকে শুরু করতাম আমার চিত্রকর জীবন।
সে প্রতিভা ঈশ্বর আমায় দেননি।
তাই একটা ক্যামেরা আমার বড় প্রয়োজন।
০৩/১০/২০

লেখকঃ রতন ভট্টাচার্য, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন