কামাল কাকার হেনা

 

জব্বার পিওন দাদার জীবন যাপন আর বেশভূষা দেখে সহজেই সবাই বলতে পারতো যে, এ এক অভিজাত লোক। কিন্তু পিওন আবার অভিজাত হয় কেমন করে ? আমি ছোটবেলায় আব্বাকে প্রশ্ন করেছিলাম। দাদা কি শেক্সপিয়ারের ভাই? আব্বা একগাল হাসি হেসে বলেছিলেন। তোমার দাদার বয়স আর আচকানটি ব্রিটিশরা পরতো তাই দেখে তোমাকে ও রকম মনে হয়েছে। আমার আবারো প্রশ্ন মুখটিও তো ওরকম। হ্যা কিছুটা মিল আছে। দাদা আমার বাবার দূর সম্পর্কের চাচা। রোজই আমাদের বাড়ি আসতেন। উনার এক ছেলে কামাল উদ্দিন। বাড়ির পাশে থানার বাউন্ডারি। কেমন করে এক পুলিশের মেয়ের সাথে অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে যান। দাদা কোনক্রমেই রাজী হচ্ছিলেন না। ব্রিটিশ ডেপুটি কালেক্টরেটের পিওন। ঝাঁঝ বেশি। প্রতিপত্তিও কম ছিলো না। তাই বিগড়ে গেলেন। অবশেষে অনেক মধ্যস্থতা করে আব্বা কামাল কাকার মনোবাসনা পূরণ করতে পেরেছিলেন। কাকীর বয়স তখন ষোল সতেরো। কামাল কাকা রাজপুত্রের মতো দেখতে। কাকী বিয়ের পর যারপর নেই খুশী হয়েছিলেন। আর আমার দাদা এই ছেলের বৌ হেনা কে ছাড়া বাড়ির কোন কিছু কল্পনাও করতে পারতেন না। আমার দাদী অপরূপা বুড়ি মাঝে মাঝে এই শ্যামলা হেনা কে মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি দিতো। অল্প দিনের মধ্যেই হেনা কাকী শ্বাশুড়ির মুখে ঝামা ঘষে ফুটফুটে দুটি সন্তান সন্ততির জন্ম দিলে বুড়ির আচরণে সামান্য পরিবর্তন এসেছিলো। কাকী যখন ছেলে মেয়ে নিয়ে অস্থির তখন কামাল কাকা গান বাজনা আর লাঠি খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সুঠাম দেহী রাজপুত্রের মতো চেহারা কামাল কাকার। তিনি আনসার ট্রেনিং নিয়েছিলেন। ঘনঘন দুটি বাচ্চা হওয়ার পর অল্প বয়সী কাকীর শরীর ভেঙ্গে পড়ার দশা। ঠিক ঐ সময়েই শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীন করার ভয়ানক লড়াই। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসিকতার সংগ্রাম। কামাল কাকা দুর্দান্ত সাহসী বীর, প্রিয়তমা স্ত্রীর কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার যুদ্ধে। কাকা মাঝে মাঝে গভীর রাতে মা বাবা আর স্ত্রীর সান্নিধ্য পাবার আশায় পোশাকী শরীরে ভারী অস্ত্র কাঁধে নিয়ে চলে আসতেন। দাদী প্রায় রাতে ছেলের জন্য ঘুমাতেন না। আর দাদাতো রাশভারী। বিশাল এক রাজকীয় লাঠি হাতে এলাকাময় পায়চারী করে রাত ভর ঘুরে ঘুরে খবর নিতেন কখন কোথায় কারা এ্যামবুশ করছে। গেরিলা আক্রমন চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে বুদ্ধি পরামর্শও দিতেন বলে হেনা কাকীর কাছে শুনেছি। রাতে ছেলে বৌমার ঘরে ঢুকে গেলে বুড়ো বুড়ি শান্তির নিদ্রা যেতেন। যুদ্ধের তীব্রতা শুরু হলে কাকা আর বাড়ি আসতে পারতেন না। প্রিয় স্বামীর পানে চেয়ে থাকা কাকীর পথ দীর্ঘতম হতে শুরু করে। ০৭ নম্বর সেক্টরে হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা চাঁপাই নবাবগঞ্জ অতিক্রম করে গোমস্তাপুর উপজেলায় প্রবেশ করে। ভোলাহাট উপজেলা ভারত সীমান্ত সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরন স্থল আর রসদ সমৃদ্ধ মুক্ত অঞ্চল ওরা কব্জায় নিতে চায়। মাঝখানে মহানন্দা নদী। ১৯৭১ সালের ০৬ অক্টোবর একদল পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা মুক্ত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা চালায়। কামাল কাকার নেতৃত্বে বাংলার ভয়ানক একদল মুক্তি যোদ্ধা ওদের পথরোধ করে দেয়। শুরু হয় ভয়ানক প্রানপণ লড়াই। মুক্তি যোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে পাক সেনার কয়েক জন নিহত হওয়ার পরও যুদ্ধ চলতে থাকে। কামাল কাকা ক্রুদ্ধমূর্তি ধারণ করে একাই থামিয়ে দেন পাকিস্তানী সেনাদের লড়াই। ওরা আতঙ্কে পিছুটান নেয়ার সময় হঠাৎ একটি বুলেট কামাল কাকার গ্রীবা ভেদ করে এপার ওপার হয়ে যায়। স্তব্ধ হয়ে স্টেনগান হাতে কামাল কাকা বাংলার জমীনে পড়ে যায় আলীনগরের শ্যামপুর গ্রামে। সহ যোদ্ধারা বীর শহীদ কামালের লাশ কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে আসে। কাকার রক্তাক্ত লাশের ওপর কাকীর গগন বিদারী হাহাকার আজো আমরা শুনতে পাই। দাদার নিজ বাড়ীতে কামাল কাকার সমাধীর পাশে কাকী প্রায়ই দাঁড়িয়ে বুক ফাটা চিৎকার করতো। এখন আর করে না। কাকী শয্যাশায়ী। আমি বেশ কিছুদিন থেকে কাকীর সাথে দেখা করতে যাইনি। আমার মন খারাপ হবে তাই।

 

নূরে আলম মুক্তা- কবি,সাহিত্যিকও এডমিন মহীয়সী।

আরও পড়ুন