নিলুর আত্মত্যাগ

 

নিলু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সমীরের গমন পথের দিকে। প্রিয় বন্ধু সমীর চলে যাচ্ছে এ দেশ ছেড়ে। মিলিটারীরা নাকি হিন্দুদের যেখানে পায় সেখানেই গুলি ছুঁড়ে, নির্বিচারে ঘর-বাড়ি সুদ্ধ পুড়িয়ে দেয়! তাই সমীরের বাবা সুধীর,পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তাদের ভারত নিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভারত পৌছে দিয়ে প্রিয় জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে আবার ফিরে আসবে। সমীরদের নৌকা চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত নিলু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে খালের পাড়ে। সমীরের শেষ কথাগুলো কানে বাজতে থাকে তাঁর..”আমি আমার দেশে আবার ফিরা আসমু, আমরা আবার একসাথে স্কুলে যামু। একদিন এই দেশ স্বাধীন হইবোই দেখিস। জয়….বাংলা!”

বন্ধুর কথা মনে হতেই দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ দিয়ে। এমন সময় মেলেটারী আইছে! মেলেটারী আইছে!বলে চিৎকার শুনা যায়। নিলু পথিমধ্যে রহমত চাচাকে জিজ্ঞেস করে,

-“চাচা মেলেটারী কোন জায়গায় আইছে?”

-“পাশের গ্রামের স্কুল ঘরে বাজান!”

শুনে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে প্রতিজ্ঞা করে নিলু, যারা তার প্রিয় বন্ধুকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে, এতো এতো মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে, তাদের একজনকে হলেও নিজ হাতে হত্যা করবে!

গ্রামের নাম গোবিন্দপুর।গ্রামের পশ্চিম ধারে পাশাপাশি দুটি বাড়ি। একটা নিলুদের,অন্যটা তার বন্ধু সমীরদের। তাদের দুজনের বাবাও ছোটবেলার বন্ধু। যেকোন বিপদে দুটি পরিবার একে-অন্যকে আগলে রাখে। গ্রামের সবাই সুখে-দুঃখে মিলেমিশে থাকে। অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গ্রামটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে! নিলুদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই, তাছাড়া তার বাবা হাসান মিয়া শহরে চাকরি করে। তিনি এখনও ফিরে না আসায় ছেলেকে নিয়ে গ্রামেই রয়ে গেছেন রাবেয়া বেগম। সমীরের বাবা যাওয়ার সময় বলেছিলো,”ভাবী আমাগো সাথে চলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি আর হাসান আবার চইলা আসমু সবাইরে নিয়া।” রাবেয়া বেগম রাজি হননি। স্বামীর ভিটে ছেড়ে, প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে কোথায়ও যাবে না সে। তাই আর জোর করেনি।

নিলু হাঁটতে হাঁটতে শিমুল স্যারের বাড়ির দিকে মোড় নেয়। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায়ই স্যারের কাছে আসে। স্যারের কাছ থেকে দেশের কথা শুনে। স্যার নিজে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, সেই কথা শুনে।
দেখা মাত্র স্যার হাসিমুখে জানতে চাইলো, কিরে নিলু কেমন আছিস?

-ভালো। স্যার আপনি?

-আমগোরে কি আর ভালো থাকতে দিলো পাকিস্তানী শয়তানগুলা!

-স্যার পাশের গ্রামে নাকি মেলেটারী আইছে?

-হ।তুই জানলি ক্যামনে?

-উত্তর পাড়ার রহমত চাচা কইলো।

-আচ্ছা স্যার,মানুষ কেন মানুষরে মারে?

-শিমুল দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, মানুষের মইধ্যে যখন ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের লোভ দানা বাঁইন্ধা উঠে,তখন তারা মানুষের জীবন নিয়ে খেলে!
এখন বাড়ি যা। সাবধানে থাকিস। বলতে বলতে শিমুল প্রয়োজনীয় সব গুছিয়ে নেয়। খালের পাড়ে পাহারা দিতে হবে।এদিক দিয়ে মিলিটারীর গ্রামে ঢুকার সম্ভাবনার কথা বলছেন শফিক ভাই।

২৫ শে মার্চের সেই রাতের পর বাংলার ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, দিনমজুর, সকল পেশার, সকল শ্রেণির মানুষ পাক হানাদের রুখতে, দেশের অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্যকে নতুন রুপ দিতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।এছাড়া যারা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলো,কিন্তু জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে ইচ্ছুক,তাঁরা স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদেরই একজন গোবিন্দপুর গ্রামের শফিকুর রহমান। গ্রামের সবাইকে তিনি অস্ত্র চালনা ও পাক হানাদের নিশ্চিহ্ন করার দিক নির্দেশনা দেন। সবাই তাঁকে শফিক ভাই বলে ডাকে।

১৮ মে ১৯৭১! প্রতি দিনের মতই গ্রামের মানুষ ভয় এবং আতংকের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করে।সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। রাবেয়া বেগম ভাত বেড়ে বসে আছেন ছেলের জন্য, অথচ ছেলের আসার নাম নেই! দু’দিন আগে হাসান মিয়ার চিঠি এসেছে। চিঠিতে হাসান লিখেছে আমি যুদ্ধে যোগ দিয়েছি। জীবন দিয়ে হলেও দেশকে স্বাধীন করমু। ইনশা আল্লাহ,এই দেশ একদিন স্বাধীন হইবোই,দেইখ্যো। আরো জানিয়েছে, সুধীরের সাথে দেখা হয়েছে। সুধীর বাড়ির খোঁজ দিয়েছে। সুযোগ পেলে দুইদিনের ছুটিতে বাড়ি আইসা তোমাগরে দেইখা যামু। তোমরা সাবধানে থাইকো।

ঐদিকে নিলু মাকে ফাঁকি দিয়ে চুপিচুপি বের হয়েছে গুলতি নিয়ে।পাখি মারা রাবেয়া বেগমের পছন্দ না তাই। তবে আজকে পাখি শিকারের নিয়ত নেই। আজকে শুধু গুলতি দিয়ে নিশানা আরো পোক্ত করবে। তাই বাড়ির অদূরের বাগানের দিকে ঢুকে পড়লো। বাগানের সারি সারি একেকটা গাছকে মিলিটারী সৈন্য বানিয়ে গুলতি দিয়ে নিশানা ঠিক করতে লাগলো। তৃতীয়বারেও যখন সফল হলো না তখন মন খারাপ করে ভাবতে লাগলো, তাইলে কি আমার যুদ্ধে যাওয়া হইবো না? ওর ধারণা নিশানা ঠিক করতে পারলেই শফিক চাচা আর শিমুল স্যার তাকে তাদের সাথে যুদ্ধে রাখবে। সেই আশায় আবার চেষ্টা শুরু করে। এবার প্রথমবারেই সফল হয়। পরপর কয়েকটা নিশানা করে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে নিলু। এমন সময় বাগানের পাশ দিয়ে শাঁ করে একটা মিলিটারী বোঝাই গাড়ি চলে যায় তাদের পাড়ার দিকে। নিলু ভয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। গুলির আওয়াজ আর মানুষের চিৎকারে তার সম্বিত ফিরে আসে। মায়ের কথা মনে পড়তে বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে সবশেষ। হাসান মুক্তিযোদ্ধা জানতে পেরে মিলিটারীরা গোবিন্দপুর গ্রামে প্রথম মিশন শুরু করে তাঁর বাড়ি থেকে।

রাবেয়া ভাত সামনে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য চলে গিয়েছিলেন নিজস্ব জগতে।বাহিরের চিৎকার চেঁচামেচি তাঁর ভাবনার জগতকে ম্লান করতে পারেনি! কিন্তু বুলেটের আঘাত তাঁকে চিরদিনের জন্য নিয়ে যায় ভাবনার অতল গহ্বরে। নিলু হাফাতে হাফাতে ঘরের দাওয়ায় এসে মা’কে ডাকতে থাকে। সাড়া না পেয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে যা দেখে, তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না মোটেই। বারো বছরের ছোট্ট কিশোর কান্না ভুলে মায়ের লাশের সামনে পাথরের মতো হাঁটু গেড়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর; কঠিন এক শপথ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। সাথে নেয় মায়ের প্রিয় সবুজ শাড়িটা।

আগস্টের ৫ তারিখ ১৯৭১! মুক্তিবাহিনীর ঘাটি।কমান্ডার শফিক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জরুরী বৈঠকে বসেছেন। আজই পাকবাহিনীর ক্যাম্পে চুড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেন। শিমুল স্যার, মাহফুজ ভাইসহ আরো কয়েজনকে নিয়ে আক্রমনের নকশা আঁকেন। নিলু এক পাশে বসে তাদের আঁকা নকশার দিকে চোখ বুলায়। মায়ের মৃত্যুর পর একা হয়ে যাওয়ায় কমান্ডার শফিক তাকে আশ্রয় দিয়েছে। সবাই প্রস্তুতি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লে সে যত্নে রাখা মায়ের সবুজ শাড়িটা বের করে চুমু খায়, তারপর শাড়ির এক টুকরো কাপড় মাথায় বেঁধে নেয়। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে রাখা গোলা বারুদটি সাথে নিয়ে রওয়ানা হয় গন্তব্যে।

শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।চোখের সামনে ডলে পড়তে দেখে মাহফুজ ভাই, শফিক চাচাসহ আরো কয়েকজনকে।ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সবাই।এদিকে মুক্তিবাহিনীর গোলা বারুদ ফুরিয়ে আসে দ্রুত।শিমুল স্যার ছাড়া বাধ্য হয়ে পিছু হটে বাকী দুইজন। হঠাৎ একটা গুলি এসে স্যারের পায়ে বৃদ্ধ হলে স্যার পড়ে যান। নিলু দৌড়ে এগিয়ে এসে জামার ভিতর লুকিয়ে রাখা গোলা বারুদটি বের করে আনে। তারপর সর্বশক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারে মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া পাকসেনাদের লক্ষ্য করে। মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায় পাকসেনাদের ঘাঁটি। দুই মিনিটের ব্যবধানে বিপরীত দিক থেকে একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় নিলুর মাথায়।তাঁর মাথায় বাঁধা সবুজ কাপড়টি রক্তের লাল বৃত্ত ধারণ করে। এ যেন স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা! নিলয়, মা-বাবার আদরের নিলু আজকের জয়ের নায়ক; ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

হাসান মিয়া আর কোনদিন ফিরে আসেনি। ফিরে আসেনি সুধীরও! ফিরে এসেছিলো সমীর তার প্রিয় জন্মভূমি স্বাধীন দেশে….

লেখকঃ মুরশিদা সাথী, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন