পবিত্রতার ছোঁয়া

সাঈফা এবং নাঈমের আঁটবছরের সংসার জীবন। সুখের পূর্ণতা তাদের জীবনে। দুঃখেরা খুব সহজে তাঁদের স্পর্শ করে না। নাঈমের ব্যবসা ভালোই চলে। মা বাবা স্ত্রী নিয়ে সুখেই দিনাতিপাত করছে।

সকল সুখের মাঝেও যে দুঃখ সেটা ছিলো তাদের সন্তানহীনতা। একটি সন্তানের স্বপ্ন কে না দেখে! অনেক চেষ্টার পরও যখন সন্তান হলো না, তাঁরা সন্তানের আশা ছেড়ে দিলো। আল্লাহ যদি না চান, কেউ পারবে না কাউকে সন্তান দিতে।

সবকিছু মেনে নিলেও সন্তানহীনতা তাদের কষ্ট দিতো। তারা আল্লাহর কাছে পার্থনা করতো! ইবরাহীম আলাইহিসসালামকে যেমন সন্তান দান করেছিলেন বৃদ্ধ বয়সে, আমাদেরও দান করুন! আমাদেরও নেককার সন্তান দান করুন!

আজ সেই খুশির সংবাদটাই দিয়েছে সাঈফা। নাঈম সংবাদটা শুনে কি করবে বুঝতে পারছে না বা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। নাঈম আলতো জিজ্ঞেস করলো,
–সত্যি?
–হ্যাঁ, সত্যি।
নাঈম সাঈফাকে শূন্যে তুলে ঘুরাতে লাগলো আর চিৎকার বলে ওঠলো আমি বাবা হবো! বাবা হবো! বাবা!

পরদিনই নাঈম পনেরো কেজি মিষ্টি কিনে আনলো। প্রতিবেশী, আত্মীয়দের বাসায় মিষ্টি পাঠালো। এ যে অনেক চাওয়ার পাপ্য।

সাঈফার এখন কাজ অল্প। বলতে হয় অলস জীবন। রান্না করতে গেলে শাশুড়ি ধমকে পাঠিয়ে দেয়। একমাত্র নাতীন বলে কথা। নাঈম দোকান থেকে আগেভাগেই ফিরে আসে। গল্প করে। ছেলে হলে নাম কি হবে, মেয়ে হলে কি হবে। এটা নিয়ে মাঝেমাঝে ঠুনকো ঝগড়াও হয়ে যায়। সবকিছুই সুন্দর হয়ে উঠছে পৃথিবীর।

সাঈফা: আমাদের যদি ছেলে হয়, নাম হবে ইউশা।
নাঈম: নাহ। নাম হবে মাহিম। আমার কাছে বেস্ট।

সাঈফা: না, ইউশাই হবে।
নাঈম: না, মাহিম।

সাঈফা: আমি মানি না।
নাঈম: আমিও মানি না।

সাঈফা: যাও তোমার সাথে কথাই বলবো না।
নাঈম: আমিও বলবো না।

দু’জন দু’দিকে ফিরে বসে রইলো। একটু পর নাঈম সাঈফার দিকে তাকিয়ে বলল,
–আল্লাহ! আমার সন্তান যেন এমন ঝগড়াটে না হয়!

সাঈফা রাগে নাঈমের দিকে ফিরে নাঈমের বুকে মিছে ঘুষি দিয়ে বলতে লাগলো ‘তোমাকে মেরেই ফেলবো।’ নাঈম সাঈফাকে আরেকটু কাছে টেনে বললো ‘মেরে ফেলো। তবে এটা কততম মেরে ফেলা?’ সাঈফ হেসে ফেললো।

তাঁরা অবশ্য দুইটা নাম ঠিক করে রেখেছে, ছেলে হলে সাঈফ, সাঈফার সাথে মিল রেখে। মেয়ে হলে নাম রাখবে নাঈমা, নাঈমের সাথে মিল রেখে।

নতুন মেহমানের আগমনের জন্যই সবাই প্রস্তুত হয়ে আছে। আর অল্প কিছুদিন। ডাক্তার বলেছে জুলাইয়ের শেষদিকে। সাঈফা এখন কঠিন নিরাপত্তার মাঝে থাকছে। সবকিছু নিয়মমাফিক। নিয়মের বাহিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সন্ধ্যার পরপরই নাঈম দোকান বন্ধ করে চলে আসে। এই কয়েকদিন তাঁরা সেই ভার্সিটির সময়ে ফিরে গিয়েছিলো। রাত জেগে গল্প করা। রাগ, গোস্বা, অভিমান। আবার একটু পরে মিটমাট। তবে পার্থক্য হলো তখন আল্লাহর স্মরণ তাদের থেকে দূরে ছিলো। আর এখন আল্লাহর ভয়ই তাদের মূল অস্ত্র। আর সেজন্য আল্লাহর লাখো কোটি শোকর করে তারা।

বাচ্চা পেটে যখন দশমাস চলে, হঠাৎ সাঈফার ব্যথা ওঠে। ধাত্রী ডাকা হয়। ধাত্রী কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল ‘তাকে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে।’

রাতেই নাঈম মা’কে সাথে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে। ভর্তি করে পি,জি হাসপাতালে। ডাক্তার এসে জানায় সন্তান হবে। তবে সাধারণে সম্ভব নয়, সিজার করতে হবে। আশংকাও আছে।

অপেক্ষার প্রহর ফুরোতে চায় না। বাড়ি থেকে আত্মীয়রা ফোন দিচ্ছে বারবার। নাঈমের বিরক্তি লেগে যায়। ফোনটা আস্তে করে বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু কোনো প্রশান্তি পাচ্ছে না। একটু পরপর ডাক্তার ঢুকছে বের হচ্ছে। নাঈম বারবার ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে কি খবর? সবাই বলে একটু অপেক্ষা করুন। এই ‘অপেক্ষা’ নামে যদি কোনো শব্দ না থাকতো!

খবর আসলো। আপনার স্ত্রী ভালো আছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আপনার সন্তান জন্ম নেওয়ার আগেই মারা গিয়েছে। সেজন্য আমরা দুঃখিত।

খবরটা শুনে নাঈম কতক্ষণ ঝিম মেরে গেলো। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুলো না। সম্বিত ফিরে স্ত্রীর কাছে গেলেন তিনি। মাথার পাশে বসলেন। সাঈফা নাঈমকে দেখে ডুকরে কেঁদে ফেললো। কেঁদে ফেললো নাঈমও। কাঁদতে কাঁদতে সাঈফার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলল,

—সাঈফা! সন্তান হওয়া না হওয়া আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি চায়লে অনেককিছুই সম্ভব। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ তিনি তোমাকে আমার থেকে পৃথক করেননি। তোমার আমার বন্ধনে শুধু আমি আর তুমি ছিলাম। এখনও আমি আর তুমিই আছি। ধৈর্য ধরো৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ সকলকিছুর উপর কর্তৃত্বশীল।

ভালোবাসার এই বন্ধন যা আল্লাহর উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছিলো। আল্লাহ তাতে বরকত দিলেন৷ মাত্র পাঁচবছরের ব্যবধানে নাঈম সাঈফা দম্পতি দুই সন্তানের জনক জননী হোন। আর তাদের নাম করা হয় ‘সাঈফ এবং নাঈমা।’ নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম দানকারী।

লেখকঃ সাজিদ আব্দুল্লাহ, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন