প্রথম দেখা

ইসরাত জেরীন শান্তা

বিষাদ ও পুলকের সন্ধিক্ষণ হেমন্তের শুরুটা শ্রেষ্ঠার কাছে সবসময় অধিক আবেগময়। এ সময়ের প্রতিটা সকাল পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে মন চায় তার। সূর্যের মিষ্টি নরম রোদে এক রকমের প্রলেপ মেখে নেয় সে শরীরে। বর্ষার শেষে হেমন্তের শুরুতে মাটির সোঁদা গন্ধ মাতাল করে শ্রেষ্ঠাকে প্রকৃতির প্রেমে। আকাশের সব খন্ড খন্ড মেঘ সড়ে গিয়ে কুয়াশার আলতো পরশে শ্রেষ্ঠা কেমন যেন ভীষণ রকমের আহ্লাদিত হয়, আবেগী হয়।  এমনই দিনগুলোর কোন একটি দিন শ্রেষ্ঠার  জন্য বিশেষ দিন। আজই সেই দিন।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে বারান্দার গ্ৰীল দুই হাতে ধরে আকাশের দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে এরপর চোখ বন্ধ করে থাকে মিনিট পাঁচেক। বড় বড় নিঃশ্বাস নেয় বুক ভরে। আজকের দিনের জন্য অনেক কিছুই পরিকল্পনা করে রাখা আছে তার। নিহানের পছন্দের লাল শাড়ি পড়বে সে। সাথে কপালে কালো টিপ।
ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা করে আয়নার সামনে কিছুটা সময় নিয়ে বসেছে শ্রেষ্ঠা। খুব সুন্দর করে সাজবে বলে অফিসে যাওয়ার বেশ অনেকটা আগেই সে নিজেকে সাজাতে গোছাতে বসেছে। শ্রেষ্ঠার মা নামাজ পড়ে নাস্তার পর চা হাতে নিয়ে মেয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে এলো।
“আজ এত আগেই তৈরি হচ্ছিস? অফিসে কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি?”
“না মা ! এমনি এমনি ।”
“এমনিতে তো তুই কখনো সাজ গোজ করিসনা। হয়তো খুব বেশি খুশি বা খুব মন খারাপে তোকে আমি সাজতে দেখি।”
“এমন কিছুই না। তুমি গিয়ে একটু ঘুমাও। আমি বাইরে থেকে দরজা লক করে দিয়ে যাব।”
“আচ্ছা যাচ্ছি।”
“আর শোন মা। আমার মন খারাপ না। তুমি কোন চিন্তা করো না।”
মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন খুব ধীর পায়ে।আয়নায় নিজেকে দেখে দারুণ লজ্জা লাগছে শ্রেষ্ঠার। চমৎকার লাগছে তাকে। খুশি খুশি মনে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল সে। অফিসে আজকে সবার আগেই পৌঁছে গেছে। শুধুমাত্র দারোয়ানকে দেখা যাচ্ছে। অফিস প্রায় খালি দেখে নিজের কাজে নিজেই হেসে ফেলল।
“চা দেই আপা?”
” চা! দিতে পারো।”
জলিল মিয়া ঘুরে দাঁড়াতেই শ্রেষ্ঠা তাকে ডেকে দুইশত টাকা হাতে গুঁজে দিল।
“টাকা কেন আপা?সেদিনও তো দিলেন।” “সুন্দর করে চা বানিয়ে নিয়ে আসো।”
পূরবী অফিসে ঢুকে কি মনে করো যেন দৌড়ে আবার বাইরে গেল।তার একটু পর হাঁপাতে হাঁপাতে আবার অফিসে ঢুকলো। “কোথায় গেলে? আবার হাঁপাতে হাঁপাতে আসলে।”
“আর বোলো না। পার্সটা ফেলে এসেছিলাম উবারে। ড্রাইভারটা দাঁড়িয়েছিল নিচেই আর অপেক্ষা করছিল আমি পার্সটা আনতে নিশ্চয়ই যাবো।”
“এখনো এমন ভালো মানুষ আছে তাহলে।” “সেটাই।”
“শোন আজকে একটু সময় দিতে পারবে অফিসের পর?”
“কেন শ্রেষ্ঠা ডার্লিং? কারনটা বলে ফেলো।” “একজনের জন্য একটা গিফট কিনব।” “একজনটা কে?”
“সে তুমি চিনবে না। যাবে কিনা বল।”
” চিনব না হয়তো। তবে আন্দাজ করতে পারছি ঠিকই। আচ্ছা তুমিতো কখনও আমাকে এ ব্যাপারে কিছু বলনি!”
“মেয়েটা এত কথা বলে! তাহলে যাচ্ছ তুমি।”
” তুমি এত আবদার ফলাচ্ছো। কিন্তু বলছোনা যা জানতে চাইছি।”
“সময় হলে বলব।”
শ্রেষ্ঠা পূরবীর চাইতে প্রায় ১০ থেকে ১২ বছরের বড় কিন্তু তাদের মধ্যে একটা চমৎকার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক রয়েছে। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে পূরবী। বাবা-মায়ের সাথে থাকে না ইদানীং।  কি যেন ভেবে হুট করে একদিন একটা মহিলা হোস্টেলে উঠে পড়ল ।
তিন টা বাজছে। অন্য দিন অফিস শেষে শ্রেষ্ঠা ও পূরবী কিছুটা সময় দেরি করে বের হয়। তবে আজ আর দেরী করলো না। অফিসে শেষেই দুজনে রওনা দিলো।
“কোথায় যাবে বল।”
“খুব ভালো একটা ব্র্যান্ডের পারফিউম কিনব। কোথায় যাওয়া যায় বল।”
“জেন্টস পারফিউম নিশ্চয়ই।”
“হুম”।
দুজনে মিলে রিকশায় করে শপিং মলে ঢুকলো। পারফিউম ওয়ার্ল্ড খুঁজতে সময়ই তেমন লাগলো না । পূরবী আগেও এসেছে।তাই সব জানা শোনা তার।
অনেকগুলো পারফিউম ট্রাই করার পর ফাইনালি একটা পারফিউম সিলেক্ট করা গেল।
“তুমি কিন্তু বলছো না আমি কার জন্য তোমাকে সময় দিচ্ছি।”
“বলব বলেছি তো।পারফিউম কেনা শেষ। এবার চলো কোথাও বসি।”
দুজনে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে চিকেন চিজ বার্গার, ফ্রেন্চ ফ্রাই ও ড্রিংকস অর্ডার করলো। কতক্ষণ চুপচাপ বসে রইল শ্রেষ্ঠা । কথাটা কিভাবে পূরবী কে বলবে সেটাই ভাবছিল। “আচ্ছা শোনো তাহলে। আমি আর নিহান খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।”
“শুধুই বন্ধু !”
“আহা শোনই না। আমাদের বন্ধুত্ব কলেজ পড়া কালীন সময়ে। ভার্সিটিতেও আমরা একসাথেই ছিলাম। কিন্তু ভার্সিটির পরে অনেকদিন আমাদের কোন যোগাযোগ ছিল না। এরপরে চাকরি খোঁজার পালা। চাকরি খোঁজা নিয়ে দুজনেরই ভীষণ ব্যস্ততা। এরমধ্যেই মাঝেমধ্যে ফোন দিত নিহান। তবে কখনো দেখা হতো না আমাদের। দুজনের মধ্যে নিহানের চাকরিটা প্রথমে হয়ে গেল। আমি তখনও ইন্টারভিউ দিয়েই যাচ্ছি। এমন সময় আমাদের যোগাযোগটা আবার বাড়তে থাকে। একদিন ধুম করে নিহান বলেই ফেলল তার ভালোবাসার কথা।
“আমার মনে হয় আমরা বন্ধুর চাইতেও বেশি কিছু।”
“নিহার কথা শুনে প্রথমে আমি হকচকিয়ে গেলেও পরে একটা সময় আমিও উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম যে, আসলেই হয়তো আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনি। তবে আমি কিছুদিন সময় নিয়েছিলাম। কিছুদিন যোগাযোগ করিনি। সময় নিচ্ছিলাম নিজেকে বুঝবার, সময় বুঝবার, নিহানকে বুঝবার।”
“এখন সে কোথায়?”
” সব বলব। আমরা আমাদের এই নতুন সম্পর্কে প্রথম যেদিন দুজন দুজনকে নতুন রুপে দেখলাম আজ সেইদিন। বলা যায় আমাদের প্রথম দেখা। প্রথম ভালবাসার চোখে দুজন দুজনকে দেখা । অদ্ভুত ভালো লাগা ছিল সেদিনটির প্রতি, সে মানুষটার প্রতি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর দৃশ্য বুঝি সেটাই ছিল। এক অপূর্ব মায়া! অপূর্ব ভালোলাগা! অপূর্ব ভালোবাসা!মন চাইছিল শুধু তাকেই দেখি। কিন্তু কী একটা বিষয় নিয়ে প্রথম দিনেই ঝগড়া লেগে গেল আমাদের। ঝগড়া বলতে ঠিক তেমন কিছু না। অনেকটা মান অভিমান।
তার কোন একটা কথায় আমি গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম। আর তার মনে হচ্ছিল আমার চোখ ছল ছল করছিল পানিতে। আর এটাই তাকে ভীষণ রকমের আহত করেছিল। সে মানতে পারছিল না তার কোন কথায় আমার চোখে পানি আসতে পারে। সে মানতে পারছিল না আমি তার সাথে এমন করতে পারি। কিছুটা সময় ছিলাম সেখানে
কিন্তু নিহান কিছুতেই আর স্বাভাবিক হচ্ছিল না।
সেদিনের পর বেশ কয়েক দিন তার কোন হদিস পাওয়া গেল না। একদিন আবার দেখা হল। কোথায় ছিল ,এমন করলো কেন জিজ্ঞেস করতে উত্তরে বলেছিল, আমার সেই টলোমলো চোখ সে ভুলতেই নাকি পারছিল না। তাই সে সামনে আসছিল না, কথা বলছিল না। যাইহোক এরপর ঘোরের মধ্যেই আমাদের সম্পর্কের তিনটা বছর খুব সুন্দর ভাবেই কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে সে আবার যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে ।ঢাকা ছেড়ে সে তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। কিন্তু কিছুই জানায়নি সে আমাকে, না তার বন্ধু-বান্ধবদের। তারপর তার মোবাইল নাম্বারে অজস্র বার ফোন করেছি। কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারিনি। মোবাইল নাম্বার পাল্টে ফেলেছিল। গত এক বছর তার সাথে কোন যোগাযোগ নেই।”
” বিয়ে করেছে?”
” না মনে হয়। শেষবার যখন ওর বন্ধুর কাছে খবর পেলাম তখন তো শুনলাম বিয়ে শাদি করনি। জানো তার সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমার একটা স্বপ্ন পূরণের সমান ছিল। তার এভাবে চলে যাওয়াতে কতটা কষ্ট পেয়েছি আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না তবে কেন যেন আমি তোকে অবিশ্বাস করতে পারিনি। আমার বিশ্বাস তার এমন করার পেছনেও হয়তো কোনো কারণ ছিল, যা সে আমাকে জানতে দেয় নি।”
“তুমি বোকার মত কথা বলছ।”
“তাকে ভালোবেসে আমি না হয় বোকাই হলাম। তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। তার বন্ধুত্ব, তার ভালোবাসায় সে আমাকে ঋণী করে গেছে।”
“যে মানুষটা তোমাকে কোন কিছু না বলে চলে গেল, যোগাযোগও রাখল না, একটা দিন জানতে চাইলো না তুমি কেমন আছো– তাকে এতোটা ভালোবাসার কি আছে বুঝলাম না।”
“সেটা তোমার বোঝার কথা ও না,তাই না? আর আমি তোমাকে বোঝাতে পারবোও না, চেষ্টাও করবো না। চলো এবার উঠি।”
“যাবে তো। আগে চোখের পানি মুছে নাও। কাজল লেপ্টে ফেলেছ।”
শ্রেষ্ঠার কাছে নিহান হেমন্তের মতই —একদিকে ভালোবাসার পুলক ও অন্যদিকে না পাওয়ার বিষাদের মিশ্রণ। বাড়িতে ফিরে পারফিউমের প্যাকেটটা শ্রেষ্ঠা খুব যত্ন করে লুকিয়ে রাখল আলমারির ভেতযর। যদিও সে জানে কোনদিনই এ উপহার নিহান পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
রাত এগারোটা। ঘুমের প্রস্তুতি নেয়া শেষ। মাকে ওষুধ খাইয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে বিছানায় কিছুক্ষণ বসে রইলো শ্রেষ্ঠা হাতে পারফিউমটা নিয়ে। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। খুব পরিচিত একটি নাম্বার। যে নাম্বারটাতে একটা সময় শত হাজার বার ফোন দিয়েও কোনো প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি। বারবার মোবাইল বন্ধ শোনাচ্ছিল। আজ এতদিন পর তার মোবাইলে নিহানের সে পুরো নাম্বারটা দেখে একদিকে প্রচন্ড খুশি আর অন্যদিকে অভিমানে হাতপা কাঁপছিল শ্রেষ্ঠার। ফোনটা রিসিভ করবে কি করবে না, সেটা নিয়ে চলছিল প্রচণ্ড দ্বিধাদ্বন্দ্ব। একবার মন বলছিল একটা বারের জন্য হলেও নিহানের সাথে কথা বলে, তার কন্ঠ শোনে। পরক্ষণেই  ভেবেছে ফোন ধরে কিই বা বলবে সে ? কি প্রশ্ন, কি উত্তর ?– কোনোকিছু ই তো আর আগের মতো নেই।
আসছে শীতের শেষের একটা দিনে আয়নের ও শ্রেষ্ঠার বিয়ের দিন ঠিক করা হয়েছে।
“আজ কতদিন সে নিহানের কন্ঠ শোনে না।আর কোনদিন ই মনে হয় তা আর শোনা হয়ে উঠবে না।”

ইসরাত জেরীন শান্তা – কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন