বিশ্বাস

ইয়াসমিন রাব্বানী 

জামিলা আমার বড় খালা। মায়ের তিন বোন। আমার মা সবার বড়। মামা আছেন দুইজন। তাঁরা সবার বড়। দুই মামার একজন জীবিত।
মানিকগঞ্জে আমার নানা বাড়ি। বড় খালা ওই গ্রামের শিকদার বাড়ির বৌ। গেরস্ত ঘর।
খালুর বেশ কয়েকটা দোকান আছে গঞ্জে। ভাড়া ভালই পান।
একটা একটা করে তিনটা কন্যা সন্তান জন্ম দেন খালা।
ছেলের আশায় আশায় তিন তিনটা মেয়ে হলো।
আর সন্তান নেবেন না। শহরে গিয়ে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা নিলেন।
খালার ভাসুরের তিনটাই পুত্র সন্তান। জা’য়েরা খালাকে যথেষ্ট সম্মান শ্রদ্ধা করেন এবং ভালোও বাসেন।
খালার আবদার মিটাতে ভাসুরের ছোট ছেলেটাকে নিয়ে আসেন। আদর স্নেহ দিয়ে মানুষ করেন আবুকে।
মানিকগঞ্জ শহরে রেখে বি এ পাশ করান।
খালার একটা শখ ছিলো -সবজি বাগান করা।
বাড়ির আশেপাশে খালি জায়গায় এমন কোন সবজি চাষ করেননি যা এ দেশে পাওয়া যায় না।
বাড়ির জন্য রেখে বাকি সবজি বাজারে বিক্রি ব্যবস্থা করেন।
পাইকাররা এসে সবজি নিয়ে যায়।
এই খালার একটা রোগ ছিলো, এটা রোগ না। শখ বা বিশ্বাস বলা যায়।

বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাঁর গুরু বাবার বাড়ি। গুরুকে এমন মান্য করতেন যে তা চোখে পড়ার মত।
অনেকে বেদাত, অধর্ম বলতেন।
গুরু যে ভাবে যে ভাবে নির্দেশ দিতেন উনি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন।
হাতে কবজ পরতেন, অনেক সংস্কার মানতেন।
খালু খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন।
সকালে গঞ্জে চলে যেতেন। একটা সময় তিঁনি জমির দালালি আরম্ভ করেন।
এই দালালিতে তিঁনি বেশ সুনাম অর্জন করেন।
এই সুনাম কাজে লাগলো খালার। বাড়ির পাশের জমিগুলো কিনে ফেললেন।
একসময় খালাকে সাহায্য কররার জন্য লোকবলের প্রয়োজন হলো।
একাজে দুজন মহিলা নিয়োগ দিলেন।
খালার মেয়েদের অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রতিমাসে পালা করে মেয়েরা আসে। দু চার দিন থেকে চলে যায়।
আমরা আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে হতাশায় ভুগতাম।
বাবার ইনকামে স্বচ্ছল ভাবে চলা যায় না।ছোট একটা সরকারি চাকরি করেন, আমার বাবা আর আমার অন্য খালু।
তবে ভাইবোনদের মধ্যে দারুন সুসম্পর্ক আছে। ছুটিছাটা পেলে সবাই দলবেঁধে জামিলা খালার বাড়িতে যাই।
যে ক’টা দিন থাকি মনে হয় স্বর্গরাজ্যে থাকি।
আমাদের খাওয়া দাওয়াতে বিশাল বিশাল চমক থাকে। খালু গঞ্জ থেকে প্রতিদিন চার পাঁচ রকমের মাছ, দুই রকমের মাংস কিনে আনেন।
অভাব কী জিনিস ভুলে থাকার জন্য ঐ কয়টা দিন আমরা মনোযোগ দিয়ে প্রতিটিক্ষণ অনুভব করার চেষ্টা করতাম।

আমরা গেলে খালার মেয়েরা আসে। ওরা আমাদেরই বোন। অথচ ওদের বেশবাস অন্য রকম। বোনগুলো মায়ের চরিত্র পেয়েছে।
যেদিন ঢাকায় ফিরবো সেদিন আমাদের সবার হাতে ভাল রকমের টাকা দিয়ে বলে দিতো – পছন্দমত জামা কিনিস।
বেশ কয়েক বছর জামিলা খালা তার বোনদের হাতেও টাকা দিতেন। কিন্তু আমাদের বলতেন না।
অভাব আমাদের গবীর করেছে কিন্তু সম্মানবোধ টুকু আছে। খালাকে আমরা মায়ের মত সম্মান করি। অভাবের জন্য কখনো মা বাবাকে দূর চিন্তায় ফেলিনা।

আমাদের – বোনদের বয়স হয়েছে। বিয়ে নিয়ে বাবা মা’র চিন্তার শেষ নাই।
খালা জরুরি তলব পাঠালেন। আমার মা বাবা আমাদের নিয়ে জামিলা খালার বাড়িতে উপস্থিত হলেন।
খালার দোতলা বাড়ি। শহরের সব সুযোগ সুবিধা আছে।
মোট ঘর উনিশটা। রান্নাঘর, বাথরুম, স্টোর রুম, খাবার ঘর।
খালা খালু নীচ তলায় থাকেন। রান্নাঘর,খাবার ঘর নীচ তলায়। বাকি তিনটা রুম ছেলের। বর্তমানে একটিতে থাকে।
মা বললেন – বুজি শুধু আমাগে আইতে কইলা ক্যান?
– তর অত শুননের কাম নাই। মাইয়ার বয়স হইছে।এইডা মাতাত আছে?
মা চুপ করে গেলেন।
– ওই হাফিজা কাইল সহালে সালেহারে লইয়া বাবার বাড়ি যামু।ওরে পর্দা করতে কবি।
সকাল ঠিক নয়,ভোরেই জামিলা খালার সংগে রওনা হলাম। হাটা রাস্তা।
বাবার বাড়ি পাওয়া গেলো।
বাবার পরিবার পরিজন আমাদের খুব আপ্যায়ন করলেন।
বাবা ঘুরতে বেরিয়েছিলেন।
জামিলা এসেছে শুনে তাড়াতাড়িই ফিরেছেন।
নাস্তা শেষে ডাক পড়লো।
আমাকে দেখলেন।
– মা তুমি একটু বাড়ির ভিত্রে যাও।
বেলা দশটার দিকে তিন চারজন পুরুষ মানুষ বাবার রুমে ঢুকলেন। জামিলা খালাও গেলেন।

কিছুক্ষণ পর আমার ডাক পড়লো। মধ্য বয়সী এক মহিলার সাথে আমিও বাবার রুমে গেলাম। দুই জন মুরুব্বি আর একজন সুদর্শন পুরুষ।
আমি ছালাম দিলাম। মনে মনে আন্দাজ করে ফেলেছি।
এক নজর সুদর্শন যুবকটিকে দেখে নিলাম।
আল্লাহকে বললাম – হে আল্লাহ এ যুবক কী আমাকে পছন্দ করবে!
মুরুব্বিরা আমার সাথে ধর্ম বিষয়ক প্রশ্ন করলেন।
বাড়ি ফিরে এলাম। সাতদিন পর আমার বিয়ে। যুবকটি যুব উন্নয়নে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশ বড় খামারের মালিক। খালার খুব স্নেহভাজন।
আমি খুব সুখী। খালা এবার আবু ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে আরম্ভ করলেন।
গুরু বাবার সাহায্য চাইলেন।বাবা জানিয়ে দিলেন মেয়ে খুঁজতে হবে না। আবুর পছন্দ করা আছে।
শহরে পড়তে এসে বেশ বড় ঘরের মেয়েকে পছন্দ করে রেখেছেন।
খালা দ্বিমত পোষণ করলেন না। দিনক্ষণ দেখে মেয়েকে আংটি পরিয়ে এলেন।
মেয়ে গ্রামের পরিবেশ থাকতে পারবে কি না জেনে এলেন।
খালা জানিয়ে এলেন – আবু যদি চাকরি পায় তবে বৌ নিয়ে শহরে থাকবে।
কিছু দিন পর মেয়ে পক্ষের ষোলজন এলেন। বিশাল খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হলো। মাছ,মাংস সব গঞ্জ থেকে কিনে আনা হলো।বিয়ের দিন ধার্য্য করা হলো।
খালা- খালু খাওয়া দাওয়ায় কমতি করেন নি। গ্রাম শুদ্ধ লোক দাওয়াত করলেন।
বৌ এলো। খালার খালুর আনন্দের সীমা রইলে না। বৌ’মাকে কাছে ডেকে বললেন
– মা, তুমি আমার একমাত্র ছেলের বৌ।মেয়েরা সব যার যার বাড়ি। তুমি আমার মনে জায়গা করে নিও। আমি তোমার জন্য হৃদয়টা খালি করে রাখছি। আমি ক্ষেতখামারি নিয়া ব্যস্ত থাকি।
তুমি সোনার মার( রাধুনি) সাথে থাইক্কা বুঝাইয়া দিবা। আমিও সময় পাইলে রান্ধি।
তোমার আগুনের কাছে যাওন লাগবো না।
বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবু কাচের বক্স করে মাছ আনলো। রং বেরংএর মাছ।
আবুর সোবার ঘরের পাশে মাছের ঘর। বৌ মা’র খুব শখের জিনিস।
একদিন রান্না করার সময় খালার শাড়িতে আগুন লাগলো। শরীরের বেশ ক্ষানিকটা পুড়ে গেলো।শহরে চিকিৎসা করার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
গুরুবাবার নির্দেশ- জামিলা প্রাণী পুষবানা। তোমার জন্য প্রাণী নয়। খুব অর্থ দন্ড হইবো।প্রাণ নাশ ও হইতে পারে।
ছেলেকে বলার সাহস নাই।তবু বলেন। কারণ জমি ফসলে ক্ষতি আরম্ভ হয়ে গেছে। পোকা মাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে। সবজির দামও পড়ে গেছে। তবুও খালা আশা ছাড়েননি।
খালু গঞ্জে আরো কিছু দোকান নিয়েছেন। তার পুরোটাই আবু ভাই দেখাশোনা করেন।
মা’য়ের মন খারাপ দেখে মাছ বিক্রি করে দিলো আবুভাই।
দু’বছরের মাথায় নাতির মুখ দেখলেন।
সংসার সেই আগের মত জমজমাট অবস্থা এলো।
খালার ভাসুরের ছেলে কবুতরের চাষ করে। প্রচুর কবুতর। একটা আদর্শ পরিবার। সবাই কিছুনা কিছু কাজ করে।আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রতিটি পরিবারের আছে।
ঐ বাড়িতে কে কী ভাবে অর্থ উপার্জন করবে তা খালাই নির্দেশ দিতেন।
খালা চলতেন গুরু বাবার নির্দেশে।
বাড়ির সবাই কম বেশি বাবাকে শ্রদ্ধা করতেন।
একবার ভাসুরের ছেলে সামু কবুতরের জন্য একটা জায়গা চাইলো। খালা সরাসরি না বলে দিলেন।
খালা নিজেও জালালি কবুতরের খাবার দিতেন।
গুরুবাবার নির্দেশে তা বন্ধ করলেন। একটা মুরগিও পুষতেন না।
তাঁর জীবনে গুরুবাবার ভূমিকা অনবদ্য।

গ্রামে থেকে একজন অর্ধশিক্ষিত মহিলা কীভাবে সচ্ছলতায় ভরপুর সংসার চালাতে পারেন তার দৃষ্টান্ত তিনি।
মিডিয়াতে অনেক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।তাঁর নাম দেয়া হলো-” ফসল নক্ষত্র “।
নাতি হাঁটা শিখেছে।উঠনে কাক বসলে মহা খুসি। কাকের পিছেপিছে দৌড়ায়।
বাবা তাই দেখে খাঁচা করে পোষা পাখি এনে দিলো। একটা একটা করে এক ঝাক পাখির আবাসস্থল হলো বাড়ির শেষ ( নীচতলা) রুমটায়।
কিছুদিন পর হঠাৎ খালুর শরীর খারাপ হতে লাগলো।
একদিন খালু খালাকে ডাকলেন।
— জামিলা তুমি আবুরে কও পাখিগুলান বেইচা দেক। গুরুবাবা কইছেনা! প্রাণী পুষাবানা।
— আমি পারুম না।
এর কিছুদিন পর খালু মারা গেলো। খালাও মরার সাথে যুদ্ধ করতে থাকলো।
একদিন বাবা নিজেই আসলেন।
— জামিলা! শোন মা – আবুরে কয় পাখিগুলা বেইচা দেক।
নইলে ওর অভাব হইবো। চোখে আন্ধার দেখবো।
জামিলার দু-চোখ বেয়ে পানি পড়ে। পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার কারণ খোঁজে।
স্বামী হারা জামিলার সেই উচ্ছাস নাই। মেয়েরা যার যার সংসারে ব্যস্ত।
শুধু ব্যস্ততা নাই সে কর্মব্যস্ত মিডিয়ার “ফসল নক্ষত্র ” জামিলার। নিজেও বহু রোগে আক্রান্ত।
গুরুবাবার কাছে যাবার আগ্রহ হারিয়েছেন তিঁনি।

লেখকঃ সাহিত্যিক

আরও পড়ুন