বুবু

খোন্দকার মেহেদী হাসান

আমার বুবুর যখন বিয়ে হয়ে যায় আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। স্কুল থেকে ফিরে শুনি আজ বুবুর বিয়ে।আব্বা আমাকে বললেন, ছোটন ঢাকা থেকে মেহমানরা আসবে তুই একছুটে বাজারে যা মতিনকে বল তার ডেকোরেশনের চেয়ার পাঠাতে।

আমি এক দৌড়ে বাজারে চলে গেলাম। মতিন চাচাকে যখন সব বলছি দুইটা প্রকান্ড গাড়িকে বাজার পেরিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে যেতে দেখলাম। মতিন চাচা বললেন , যাক মিলির অনেক ভালো ঘরে বিয়ে হলো, তোদের অবস্থা এইবার ফিরবে।

বুবুর কি সত্যি ভালো বিয়ে হচ্ছে? আমি জানি না। আমি শুধু জানি বুবু চলে যাচ্ছে আমাদের বাসা থেকে, তারপর কি হবে, কে আমাদের খাবার রেঁধে দেবে, কে আমাকে চুপিচুপি তার মাটির ব্যাংক ভেংগে আমাকে মেলায় যাওয়ার টাকা দেবে?বুবুকে ছাড়া যে আমার জীবন চলতে পারে আমি সেটা কল্পনাও করতে পারি না।

কলেজের এক প্রোগ্রামে আমার সুন্দরী বুবুকে দেখে নাকি দারুন পছন্দ করেছে এক বড়লোকের ইঞ্জিনিয়ার ছেলে। তার চাপে পড়েই তার পরিবার রাজি হয়েছে এই বিয়েতে। নইলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ঘরে এতো বড় আত্মীয় হওয়ার কথা না। সবাই বলাবলি করছে বুবুর কারনে এইবার আমাদের ভাগ্য ফিরবে। আমার জন্মের সময় আমার মা মারা যান, বুবুর বয়স তখন আট। আমার স্কুল শিক্ষক আব্বা আর বিয়ে করেন নি, বুবুই মানুষ করেছে আমাকে। আমার জগত ঘিরে তাই আমার বুবু।

বিয়ের আসরটা হয়ে গেলো দায়সারাভাবে। বিয়ে নাকি দুই পরিবারের বন্ধন, কিন্তু আমার সেটা মনে হলো না। পাত্রের বাবা সারাক্ষণ মুখ কালো করে রাখলেন। পাত্রের ছোট মামা আমাদের ঘর বাড়ি উঠান ঘুরে ঘুরে দেখলেন, মাঝে মাঝে নাক সিটকালেন, আমাকে ডেকে বললেন, তুমি কোন ক্লাশে পড়?
আমি কিছু বলার আগেই কেউ একজন বলল, ছোটন পাইলট স্কুলে পড়ে, ফার্স্ট বয়, ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে, ক্লাশ এইটেও পাবে।
আমার লজ্জা লাগলো, কিন্তু ছোট মামা শুধু একটু নাক সিটকালেন।

সেদিন গাড়িতে ওঠার আগে বুবু যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছিল তখনও আমার লজ্জা করছিলো, আমি বড় হয়ে গেছি লম্বায় প্রায় বুবুর সমান এতোবড় ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেউ কাঁদে?

তিনদিন পর নতুন জামাই এর বউ নিয়ে নাইওর আসার কথা। আব্বা পাড়া প্রতিবেশিদের নিয়ে রান্নবান্নার আয়োজন করলেন। একটা গাড়ি ভাড়া করে নতুন জামাইকে আনতে পাঠালেন, গাড়ি ফেরত এলো। নতুন জামাই আসতে পারবে না, তার কোন জরুরী কাজ পড়ে গেছে, পরে সময় করে আসবে।

বুবু আসলো আরোও মাস তিনেক পর। একটা সাদা রঙের গাড়ি থেকে বুবু নামল। আমি ছুটে গেলাম। আমি বুবুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও থমকে গেলাম। গায়ে দামি ফিনফিনে শাড়ি, মুখে পার্লার থেকে করা কড়া মেকআপ, প্লাক করা বাঁকানো ভ্রু আর স্ট্রেইট করা চুলে আমার বুবুকে কেন জানি হটাৎ অচেনা লাগলো।

আব্বা দৌড়ে এলেন, জামাই আসে নি?
না আব্বা, সাইটে গেছে। বুবু আব্বাকে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদল।

আমি সারাদিন বুবুর আশেপাশে ঘুরঘুর করলাম, কিন্তু বুবুকে কেমন আনমনা দেখলাম। শুধু একবার আমাকে জিজ্ঞেস করল, ছোটন পড়াশুনা করছিস তো ঠিকমতো?
রাতে আমার ঘুম এলো না, বড্ড অভিমান হলো। বুবু অনেক বদলে গেছে। এই অল্পদিনে এতো বদলে যেতে পারে মানুষ?

বুবু তিনদিন থাকলো, শেষের দিন দুলাভাই এলেন বুবুকে নিয়ে যেতে। দুলাভাই দেখলাম বেশ গম্ভীর। আমাকে ডেকে বললেন, কি রে ছোটন পড়াশুনা করিস ঠিকমতো? নাকি সারাদিন বাঁদরামি?
আমি কিছু বললাম না। দুলাভাই আসার পর থেকেই বুবু তটস্থ হয়েছিলো, কারণও দেখলাম তার। আমাদের সামনেই কপাল কুঁচকে দুইবার বুবুকে ধমক দিলেন দুলাভাই ।

বুবু চলে যাওয়ার পর সেই রাতে আব্বা আমার ঘরে এলেন, অপরাধীর গলায় বললেন, ছোটন তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস, বলতো  আমি কি কোন ভুল করলাম?
আমি হয়ত সত্যি বড় হয়ে গেছি। মনের কথা চেপে বললাম, কেনো সেটা বলছেন? বুবু অনেক ভালো আছে।

কিন্তু আমি ঠিক জানি আমার বুবু ভালো নেই, বুবুর হাতে কালশিটে দাগ দেখেছি, আমার হাসিখুশি বুবু কেমন গুটিয়ে গেছে মাত্র তিনমাসে।

এর ঠিক একবছরের মাথায় আব্বাজান মারা গেলেন। আমি একা হয়ে গেলাম। পাড়া প্রতিবেশিরা বুবু দুলাভাইকে চেপে ধরলেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বুবু উৎকণ্ঠা নিয়ে দুলাভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল, দুলাভাই কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ছোটন চলুক, কাজে লাগবে অনেক।
কাজেই আমি আমার বইখাতা নিয়ে বুবুর বাসায় উঠলাম।

দুলাভাইয়ের পোস্টিং তখন আমাদের গ্রামের কাছেরই শহরে। ছোট ছিমছাম দুই রুমের বাসা। আমি এক রুম ভাগে পেলাম। শহরের একটা স্কুলে ভর্তি হলাম। দুলাভাই চাকরির পাশাপাশি কন্ট্রাক্টারির ব্যবসা করতেন, একদিন আমাকে বললেন তার সাইটে গিয়ে কাজ তদারকি করতে। আমার স্কুলের ক্লাশ মিস হতে লাগলো, আমি বইখাতা নিয়ে কাজের সাইটে চলে যেতাম, সারাদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে খুব ক্লান্ত লাগত।
আমার রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু হলো। বুবু একদিন ভয়ে ভয়ে দুলাভাইকে বলল, ছোটন ভালো ছাত্র ওর পড়াশুনায় ক্ষতি হচ্ছে না তো?
দুলাভাই তেঁতে উঠলেন, গরীবের ছেলে খেটে খেতে হবে, পড়াশুনা করে কি হবে? যতটুকু দরকার ততটুকু শিখলেই হবে।
বুবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ঠিকিই তো ছোটন, পড়াশুনা করে প্রতিষ্ঠা পেতে সময় লাগবে, তুই দুলাভাইয়ের সাথে কাজ শেখ অনেক কাজে লাগবে।
আমি বুবুর কথায় অবাক হয়ে গেলাম। এই বুবুই আমাকে তৈরি করেছে, সবসময় বলত, পড়াশুনা করে একদিন অনেক বড় হতে হবে, পড়াশুনা ছাড়া আমার আর কোন কাজ নেই। আজ কত পরিবর্তন!!

আমি দুলাভাইয়ের সাইট দেখতে লাগলাম, ক্লাস নাইনের একটা কিশোরের জন্য নিশ্চয়ই খুব সহজ কাজ না, কিন্তু আমি শিখতে লাগলাম, সাথে পড়াশুনায় করতাম সাইটে। সাইটের লোকজনের কাছেই খবর পেতাম দুলাভাইয়ের কর্মকান্ড নিয়ে। বাজারে দুলাভাইয়ের এক বাঁধা মেয়ে মানুষ আছে দুলাভাই নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করে। আমি টের পাই, ওই রাতগুলোতে দুলাভাই বাসায় ফেরে টলতে টলতে। মাঝে মাঝে বুবুর চাপা কান্নার আওয়াজ পাই। সকালে কিছু কিছু দিন বুবুর গায়ের নতুন কালশিটে দাগ বুবু লুকাতে চেস্টা করে।

আমার বুবু অনেক বদলে গেছে, আমার মনে হয় আমাকে নিয়ে বুবু ভারী অস্বস্তি বোধ করে, কেমন পালিয়ে বেড়ায়, দেখা হলে ঠিকমতো কথা বলে না। মাঝে মাঝে দুলাভাই বুবুকে পার্লার থেকে সাজিয়ে পার্টিতে নিয়ে যায়, আমার অবাক লাগে। তবু একেকটা দিন যখন বাসায় দুলাভাই থাকে না, হঠাৎ সেই পুরান দিনের মতো বুবু তেল নিয়ে এসে বলে, ছোটন আয় তোর মাথায় দিয়ে দি।
আমার চোখে পানি আসে। আমি লুকাবার চেষ্টা করি।

একদিন অনেক রাতে ফিরে দুলাভাই আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। আমি জেগে দেখি দুলাভাই প্রচন্ড রেগে আছে। দুলছেন, মাতাল হয়ে আছে। আমাকে বললেন, হারামজাদা তোকে আমি সাইট দেখতে দিছি আর তুই সেখানে পড়াশুনা করিস?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
হটাৎ করে দুলাভাই আমার চুলের মুঠি ধরলেন, বল আজ সাইট থেকে এক লাখ টাকা চুরি করেছে কে? নাকি তুই-ই করেছিস?

আমি অবাক হয়ে গেলাম। সাইটের টাকা পয়সা সংক্রান্ত কোন কিছুর সাথেই আমি জড়িত না। আলাদা একাউন্টস আছে। তবু বললাম, আমি কিছু জানি না দুলাভাই।

–তুই জানিস না ? কেনো জানিস না? তুই এর সাথে জড়িত শিওর। আমার খেয়ে আমার সাথেই মামদোবাজী? দাঁড়া।

দুলাভাই তার কোমরের বেল্ট খুলে আমাকে মারতে আরম্ভ করলেন। আমি সারা জীবনে কখনো মার খাই নি। পরিবারে আদরে মানুষ হয়েছি, স্কুলে ভালো ছাত্র হওয়ায় স্যারেরা অত্যাধিক স্নেহ করতেন। আমার শরীরে দুলাভাইয়ের বেল্ট কেটে কেটে বসে যেতে লাগল।

আমি দেখলাম বুবু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, দুলাভাই একসময় ক্ষ্যান্ত দিয়ে চলে গেলেন। আমি সারারাত বিছানায় শুয়ে কোকালাম। চেষ্টা করলাম মুখ দিয়ে শব্দ না করতে।

আব্বা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ছোটন পুরুষ হয়ে গরীব ঘরে জন্মাইছিস, সামনে অনেক কষ্ট আসবে, শক্ত থাকবি। কখনো কাঁদবি না। পুরুষদের কাঁদতে নেই।

পরদিন সকালে আমার ঘুম শরীরে হালকা জ্বর নিয়ে। উঠে দেখি বুবু বসে আছে আমার শিয়রে।
–ছোটন, উঠতে পারবি?
আমি মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ।
–তাহলে চল।
তাকিয়ে দেখি বুবু একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে। আমি বললাম, কোথায়?
–বাড়ি ফিরে যাবো চল। তুই আবার ভালো করে পড়াশুনা শুরু করবি, আমি সেলাই শুরু করব। দুই জনের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমার বুবুর চেহারায় সেই পুরানো দিনের স্নেহ আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

লেখকঃ লেখক ও ব্যাংকার

আরও পড়ুন