বোধ

বোধ
রাবেয়া সুলতানা মুনা

সবকিছুই কেমন জানি ফ্যাকাশে লাগে যা আগের মতো নয়। মনে হয় দিন-রাত সব একই রকম, আমার মেয়েটা বাসায় মনমরা হয়ে থাকে। মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস পরে বাইরে বেরোতে যাব সবাই। এমন সময় মেয়ের আকুতি-আম্মু প্লিজ ।
আব্বু তুমি একটু বল না আম্মুকে আমি কথা দিচ্ছি, ওদেরকে আমি সব সময় বারান্দায় রাখবো, আম্মুর কাছে যেতে দিব না…প্রোমিজ আব্বু প্লিজ! একমাত্র মেয়ের কাকুতি মিনতির সামনে একবারেই গলে গেলেন মিসেস রহমান।
-আচ্ছা ঠিক আছে তবে প্রোমিজ টা যেন মনে থাকে। ওকে আম্মু।
অবশেষে মিমের ইচ্ছা পুরন হলো, মিম তার আব্বুর সাথে সুন্দর একটা খাঁচা সহ এক জোড়া ময়না পাখি কিনে নিলো, বাসায় এসে মিম সোজা চলে গেলো তার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায়। এখানে পাখিগুলোর থাকার বন্দোবস্ত হল। পাখিগুলো নিয়ে মিম এখন মহাব্যাস্ত,দিন দিন পাখিগুলো বড় হতে থাকে। ওদের কলকাকলি ও ডাকাডাকিতেই মুখর থাকে সারা ঘর। তবে সবচেয়ে খুশির ব্যাপার হল সেদিন, যে দিন সকাল বেলা পাখির বাসা থেকে শোনা গেল দুটো ছানার চিঁউ চিঁউ শব্দ। নতুন অতিথি দেখে মিমের কিযে খুশি ।


মিম মিম… ওঠ মা!
-মা আজ তো শুক্রববার, স্কুল নেই।
স্কুল নেই তো কি হয়েছে, উঠো নাস্তার সময় হয়েছে।
সবাই মিলে নাস্তা করতে ডাইনিং টেবিলে বসলো, ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসছে কোরআন তেলাওয়াতের মধুর সুর সাথে ভরাট কন্ঠের বাংলা অনুবাদ
“তোমার মালিক তোমাকে আদেশ করেছেন তোমরা তাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদের সাথে বিরক্ত মুলক কিছু বল না।“
ছোট্ট মিমের ভাবনায় কড়া নাড়লো এই আয়াত ।
-আব্বু ,আমার দাদু তো তোমার আব্বু তাই না? মেয়ের কথায় হঠাৎ ছন্দপতন হয় রহমান সাহেবের। তিনি তার মেয়ের বুদ্ধিদীপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন কি তার জিজ্ঞাসা। তখন মিসেস রহমান এসে দাঁড়ালেন দরজায়। স্বামীর অবস্থা দেখে মেয়েকে ডাক দিলেন- – মিম, মা দেখোতো পাখিগুলো এতো আওয়াজ করছে কেন? -ও হ্যাঁ। ওদের সাথে তো আজকে কথাই হয়নি! এই বলে দৌড় দিল মিম। কিন্তু রহমান সাহেব ঐভাবেই বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর মিমএর চিৎকারে আব্বু আম্মু দৌড়ে আসেন বারান্দায়- -কি হলো মিম? -আম্মু দেখো বাচ্চা দুটো নেই! বলেই ও আবার কান্না জুড়ে দিল। মিমকে ওনারা অনেক বুঝালেন। পরে বললেন “ওরা বোধহয় উড়তে বেরিয়েছে, ফিরে আসবে।“ যখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো কিন্তু বাচ্চা গুলোর কোন খোঁজ পাওয়া গেলো না তখন আর ধৈর্য্য ধারণ করতে পারল না মিম, আবার কান্না শুরু করল। এবার সবার চিন্তা হতে লাগলো। সবাই বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ওমা বাবা-মা পাখি দুটি কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। বাসার চারপাশে ঘুরছে আর কিচিরমিচির করছে। মিম বলল- -আব্বু আম্মু দেখ ওরা বাচ্চার জন্য কান্না করছে আর ওদের খুঁজছে। বল মা ওদের বাবা-মা তো ওদের অনেক আদর করতো। বড় হলেই কি বাবা-মা কে ছেড়ে চলে যেতে হবে! বল না আব্বু বাচ্চা গুলো কখন আসবে? ওরাতো কষ্ট পাচ্ছে!

রহমান সাহেব আবার চোখাচোখি হল সকালের সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখের সাথে। রহমান সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, পা দুটো কাঁপছে, মনে হলো মাথাটা যেন ঘুরছে, বোধহয় এখনই পড়ে যাবেন। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। সেখানেই তিনি দেখতে পেলেন কোন এক বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় দু’জন বৃদ্ধা দাড়িয়ে পরস্পরকে বলছেন- “খোকার বাবা আজ তো শুক্রবার। আমার খোকা তো আসবে আমাদের দেখতে তাই না? একটা কিছু কিনে রাখা দরকার ছিল, ওকে দিলে খুশি হত তাই না? কতদিন পর আজ খোকা আসবে! দুনিয়ার সবকিছু বদলাতে পারে, কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসা কখনও বদলায় না।
লেখিকা : রাবেয়া সুলতানা মুনা

আরও পড়ুন