মাটির মানুষ

জান্নাতুল ফীরদাউসী

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে লাল শাড়ী পড়ে বধূ বেশে এসেছিলাম নতুন এক সংসার সাজাতে! যে সংসার মায়ায় ঘিরে রেখেছিলো আমার পতির মা মানে আজ থেকে যিনি আমার শাশুড়ি মা।

যেদিন আমি প্রথম এ সংসারে এলাম সেদিন আসমানী রঙের শাড়ী পড়া মধ্যবয়সী সুন্দরী এক নারী আমায় বরণ করে ঘরে তুললেন। প্রথম দেখায় আমাকে মিষ্টি হেসে বুকে টেনে নিয়ে জানালেন আমিই তোমার সেই মা যে তেত্রিশ বছর ধরে তোমার চাঁদমুখ দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।

তোমার মা তোমাকে গর্ভেধারন করে অতি যত্নে লালন – পালন করেছে যেভাবে আমিও আমার ইউশাকে ঠিক সেভাবে লালন- পালন করেছি। তবে আমি ইউশাকে তোমার জন্য অতি যত্নে মানুষ করেছি আর তোমার পিতা- মাতা অতি মমতায় তোমাকে আমাদের জন্যই তিলে তিলে তৈরী করেছে।

আজ থেকে আমরাই তোমার অতি আপনজন। ইউশা তোমার অর্ধাঙ্গ মানে আজ থেকে তোমরা দুজন মিলে পরিপূর্ণ।

তোমার পরিবারের জন্য তোমার মন খারাপ করবে এটা স্বাভাবিক তবে আমাদের ভালবাসায় তুমি মায়ার বাঁধনে এতোটা জড়িয়ে যাবে যে ধীরে ধীরে সব মানিয়ে নিতে পারবে। মানিয়ে নেয়ার এ সুন্দর গুনটি আল্লাহ প্রতিটি নারীকে জন্ম থেকেই দান করে তবে কেউ এর সঠিক ব্যবহার করে আর কেউ করে না। আশা করি তুমি এ সুন্দর গুনটি তোমার মাঝে ফুটিয়ে তুলবে এমন ভাবে যে ভাবে প্রতিদিনের রবি তার উজ্জ্বল আলো ফুটিয়ে তোলে বিশ্বময়। একথাগুলো আমি আমার শ্রদ্ধেয় শাশুড়ীমায়ের কাছ থেকে শিখেছি।

জীবনে এক আকাশ সুখের ছোঁয়া যেমন সবসময় থাকবে না ঠিক তেমনি পাহাড়সমান দুঃখ ও তোমাকে বেশিদিন কষ্টে রাখবে না । তাই সুখের দিনগুলোকে আনন্দ উল্লাস নিয়ে উপভোগ যেমন করবে তেমনি দুঃখকে ভোগ করবে সহনশীল হয়ে দেখবে দুঃখ তোমায় হারাতে পারবে না কখনো।

আমার বুকে তোমার জন্য মমতার চাদর বিছিয়ে রেখেছি ক্লান্তিতে সেখানে বিশ্রাম নিও। দুঃখে মুখ লুকিও আর সুখে আমায় পাশে রেখো প্রিয় সন্তানের অর্ধাঙ্গী আমার কলিজার টুকরা মা।

মা একসাথে চলতে গেলে কখনো মতের অমিল হওয়া অস্বাভাবিক নয় তবে তা মানিয়ে গুছিয়ে নেয়ার পবিত্র মানসিকতা না থাকাই অস্বাভাবিক ব্যাপার। তাই ঝড় তুফান যাই আসুক কখনো শুধু নিজের কথা ভেবো না কখনো আমাদের ছেড়ে ভাল থাকবে তা চিন্তায় স্থান দিও না। দেখবে ছোট্ট জীবন সুখেই কেটে যাবে।

আমি মায়ের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। সত্যি বলতে শুনতে খুব ভালো লাগছিলো। এভাবে যদি প্রতিটা শাশুড়ী তার পুত্রবধূকে গ্রহণ করতো আর প্রতিটা মেয়ে যদি তার শাশুড়ীকে মায়ের স্থান দিতো তবে সংসারের টুং টাং আওয়াজগুলো ঢং ঢং করে বেজে লংকাকান্ড হতো না।

আমি আর আমার শাশুড়ীর ভালবাসায় ঊনত্রিশ বছর কাটিয়েছি। শাশুড়ীকে মা কে আমি এবং আমাকে শাশুড়ী মা এতো ভালোবেসেছে যে তাকে ছেড়ে নিজের মায়ের কাছে দুদিনের বেশি থাকা হতো না। কারন তার একা বাসায় থাকতে কষ্ট হবে তাই।

আমি , ইউশা, মা,আর আমাদের কলিজার টুকরা তাশরীফকে নিয়ে ছিলো আমাদের সুখের রাজ্য।
তাশরীফের বয়স এখন পঁচিশ । ওর জন্যও মেয়ে দেখছি হয়তো বছরখানেকের মধ্যেই আমিও শাশুড়ী মা হব।

আমিও চেষ্টা করবো তাশরীফের দাদীমার মত বউমাকে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে। আশা করি আমিও সফল হবো ইংশাআল্লাহ।

শাশুড়ী মা বছর অসুস্থ থাকার পর গত বছর আমাকে একা করে চলে গেলেন । তার শূন্যতা আমি খুব অনুভব করি। আমাকে তিনি তার সন্তানের মত হৃদকোঠরে জায়গা দিয়েছিলেন আর আমিও পরম প্রশান্তিতে তা উপভোগ করতাম।
গত দুবছর আমি তাকে আমার ছোট্ট তাশরীফের মত করে পুষেছি হৃদয় দিয়ে। তার সেবা যত্ন করতে কখনো আমার বিরক্তি লাগে নি বরং ভাল লেগেছে তার স্পর্শ ও দোয়া পেয়ে।

হে আল্লাহ আমার শাশুড়ীর মত এমন সুন্দর মাটির মানুষগুলো এপারে ওপারে সবখানে পরম শান্তিতে রাখুন। ওপারে মা তুমি খুব খুব ভালো থেকো এটাই রবের নিকট একান্ত চাওয়া।

শ্বশুর শাশুড়ী র ভালবাসায় ভরপুর থাকুক পৃথিবীর সবগুলো সুখী পরিবার।

আরও পড়ুন