অন্য এক মুক্তিযুদ্ধ

 

আজ প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সারা দেশে বলতে গেলে লকডাউন চলছে। সরকার প্রথমে সাধারণ ছুটির কথা বললেও এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় অথবা অঞ্চলে অবস্থার ভয়াবহতা আরও যেন বাড়তে না পারে সেটি ভেবে লকডাউন ঘোষণা করেছে৷ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা থেকে নিম্ন আয়ের এবং দিনমজুরদের বিশাল এক অংশ তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যায়৷ ঢাকায় থাকলে খাবে কী? এদের মধ্যে একজন হল হালিম। হালিম ঠেলাগাড়ি চালায়। বানের জলের মত লোকজনের বাড়ির পানে ছোটা দেখে হালিম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে না চেয়ে বৌ রোকেয়া এবং দুই মেয়ের হাত ধরে রওনা দিল জামালপুরে তার পিতৃপুরুষের ভিটে বাড়িতে। জমানো টাকা হাতে নেই সঙ্গত কারণে।

বাড়িতে বৃদ্ধা মা এবং ছোটভাই কলিম তার পরিবার নিয়ে থাকে। হালিমদের দেখে কলিমের বৌ নূরীর মুখে মেঘের ছায়া রোকেয়ার দৃষ্টি এড়ায়নি।নূরী শুনেছে কী একটা মারাত্মক রোগ ছড়িয়েছে। সেজন্য ঢাকা থেকে সব লোক গ্রামের বাড়িতে চলে আসছে। কলিম দিন মজুরের কাজ করে। বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসব্জী লাগিয়ে, ঘরের পিছনে ডোবায় অল্প কিছু মাছের চাষ করে কোনরকমে দিন গুজরান করেন। এখন এতগুলো লোকের পেট চলবে কীভাবে?

হালিমরা বাড়ি আসার সপ্তাহ খানেক পরে একদিন মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ত্রাণ দেবে দুঃস্থ মানুষের জন্য। ওরা দুইভাই সকালবেলায় যেয়ে লাইনে দাঁড়াল। প্রথম দিন তিনেক কোনরকমে খেয়েছে ওরা। গত দুইদিন বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না৷ হালিম বুঝতে পারে রোকেয়া আধপেটা খেয়ে ওকে এবং মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। হালিমের বুক টনটন করে। চোখ জলে ভরে যায় নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে। ঘন্টা খানেক হয়ে গেল ওরা প্রায় পাঁচশ লোক অপেক্ষা করছে। চেয়ারম্যান তখনও আসেনি৷ প্রচন্ড রোদের তাপে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হালিমের চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আসে৷ একসময় চেয়ারম্যান আসে পাজোরো হাঁকিয়ে। ধবধবে সাদা ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরনে। পরনে সাদা লুঙ্গি। গাড়িটি রাখা ছিল অফিসের পিছনদিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

প্রথমে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিলেন চেয়ারম্যান । সবাইকে ধৈর্য ধরতে বললেন। দেশের এই পরিস্থিতিতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। যেমনটি করতে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। খাবার যা আছে সবাই মিলে ভাগ করে খাব। একজন লোকও না খেয়ে মারা যাবে না৷ এরপরে জনপ্রতি এককেজি চাল আর একটু মসুর ডাল দুচারজনকে দিয়ে তিনি তার পাশে দাঁড়ানো ওয়ার্ড মেম্বারকে বাকিদের মধ্যে বিতরণ করতে বলে নিজের দপ্তরে ঢুকে গেলেন। ত্রাণের পরিমাণ দেখে হালিমের মুখ শুকিয়ে গেল৷ এইটুকু চাল দিয়ে কী হবে?

অনেকক্ষণ থেকেই হালিমের চোখে পড়েছিল বেশ কয়েকজন তাগড়া টাইপের মানুষকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিল৷ তবে এরা কারা তা নিয়ে ওর মাথা ব্যথা ছিল না৷ এখন যেই চেয়ারম্যান অফিসে ঢুকে গেল এই লোকগুলোও ওখানে ঢুকে গেল। হালিম বিমর্ষ মুখে বাড়ির দিকে পা বাড়াল৷ হঠাৎ তার চোখে পড়ল চেয়ারম্যানের দপ্তরের পেছনের দরজা দিয়ে কয়েক বস্তা চাল তার গাড়িতে তোলা হচ্ছে। মুহূর্তে হালিমের তার পরিবারের চেহারা ভেসে উঠল। চোখের সামনে এতগুলো ক্ষুধার্ত মুখ দাঁড়িয়ে আছে ত্রাণ পেতে৷ হালিমের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

ওর মনে পড়ল চেয়ারম্যানের বক্তৃতার কথা। তিনি বলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মত সবাই মিলে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ভাগাভাগি করে খেতে হবে। আর নিজে গরীবের হক এইভাবে মেরে দিচ্ছেন! মুক্তিযুদ্ধের সময় হালিম অনেক ছোট ছিল। বড় হয়ে কিছু কিছু শুনেছে। বেশি কিছু জানে না৷ তবে জাতির জনকের কথা জানে। মার্চের ৭ তারিখে দেয়া শেখ সাহেবের বক্তৃতা বহুবার শুনতে শুনতে তার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। হালিম ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিল। তার মনে পড়ল তিনি বলেছিলেন যার যা কিছু আছে তা নিয়ে দেশ মুক্ত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে৷ হালিম একটি বাঁশ পড়ে থাকতে দেখতে ওটা হাতে তুলে নিয়ে ত্রাণপ্রার্থীদের সামনে এসে চিৎকার করে বলতে লাগল “ভাইসব চেয়ারম্যানের গাড়িতে চালের বস্তা তুলে নিয়ে যাচ্ছে৷ ভাইসব আজ আমরা আর একটা যুদ্ধের সামনে পড়েছি। আর সেইটা হইল ক্ষুধা নিবারণের যুূ্দ্ধ৷ চেয়ারম্যান আমাদের মুখের খাবার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ভাইসব আসেন আমরা সবাই মিলে তার গাড়ি আটকে রাখি। আর আপনাদের মইধ্যে থেইকা কয়েকজন পুলিশকে খবর দেন৷ এই দেশ আমাগো সবার৷ সরকার এই চাল সবাইর জন্য পাঠাইছে৷ আপনারা এগিয়ে আসেন৷ চোরকে হাতে নাতে ধরার সুযোগ হারাইয়েন না।”

চিৎকার চেঁচামেচিতে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। ওয়ার্ড মেম্বার বলার চেষ্টা করল ওগুলো অন্য ওয়ার্ডে নিচ্ছে। জনতা তা শুনতে চাইল না। তারা ইউনিয়ন পরিষদের অফিস ঘিরে ফেলল। এর আগেই হালিমের কথা কানে যেতেই চেয়ারম্যান গাড়ি রেখেই পালালেন। পুলিশ আসছে টের পেয়ে মেম্বার চাল বিতরণ বন্ধ করে সটকে পড়তে যেয়ে জনতার হাতে বেদম মার খেল। ইতিমধ্যে পুলিশ এসে পৌঁছাল। খবর পেয়ে র‍্যাবও এল। তারা চেয়ারম্যানের গাড়ি আটক করল। গাড়ির বুটে মাত্র দুই বস্তা চাল পাওয়া গেল৷ র‍্যাব সব শুনে যারা ইতিমধ্যে চালডাল পেয়েছিলেন তার পরিমাণ দেখে পুলিশের সহায়তায় আবার নতুন করে ওদের মধ্যে চালডাল বিতরণ করলেন। হালিমকে ডেকে পিঠ চাপড়াল৷ অন্যদের বলল যখনই এইরকম কিছু দেখবে তাদের যেন জানায়৷ তারা আছেন জনগণের পাশে।
হালিম গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলে উঠল জয় বাংলা! তার দেখাদেখি অন্য সবাই ওর সঙ্গে কন্ঠ মেলাল৷ কয়েকজন ছুটে এসে হালিমকে কাঁধে তুলে জয় বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের সামনে কয়েক পাক ঘুরে নিল। হালিম ভাই এর কারণে আজ তারা দুই চারদিন খাওয়ার মত চালডাল পেল। আনন্দে ওদের মুখ জ্বলজ্বল করছিল।

এর দিন তিনেক পরে হালিমের মৃতদেহ তার বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে পড়ে থাকতে দেখা গেল। মৃতদেহ থেকে শুকনো কালো রক্ত গড়িয়ে পড়ার চিহ্ন রয়ে গেছে।

 

অঞ্জনা দত্ত – কবি ও সাহিত্যিক  

আরও পড়ুন