সেদিনের অপেক্ষায়

শরীফ উদ্দীনঃ

রায় পড়ার সময় কাঠগড়ার দৃশ্য এমন হয় না। আসামি পারলে সময়টা আটকে রাখে কিন্তু জজ সাহেবের তাড়া থাকে। মরুর আচরণ এ দৃশ্যের সাথে মিলল না। জজ সাহেব ঘটনার বিবরণ ও সাক্ষীদের বয়ান পড়তে শুরু করার পর থেকে মরু তিনবার বাঁধা দিল, ‘স্যার আমি যা করেছি সবাই দেখেছে, টিভি-পেপারেও অনেক খবর বেরিয়েছে। নতুন করে বলার দরকার কী? শুধু রায় পড়ে দিন,স্যার।’

জজ সাহেব রেগে গিয়ে বললেন, ‘তুমি মুখ বন্ধ রাখ। তা নাহলে তোমার শাস্তি বেড়ে যাবে।’

ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, জজ সাহেবের কথায় মরু মাথা নিচু করে মুচকি হাসি দিল।

মরু এ মামলার একমাত্র আসামি। বয়স চৌদ্দ-পনেরো। মাঝারি উচ্চতার হলকা-পাতলা গড়ন। শ্যামলা। কোঁকড়া চুলে চিরুনি পড়ে নি অনেক দিন। সারা শরীরে অযত্ন-অবহেলা- অপুষ্টির স্বচ্ছ চাদর।

মরুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। অফিস ছুটির আট-দশ মিনিটের মাথায় সরকারি ভবনের সতেরো তলায় কেরোসিন ঢেলে আগুন। ভয়ংকর নাশকতা।

আসামিকে খুঁজতে হয় নি। একটি সিসিটিভি ক্যামেরা মরুকে সনাক্ত করল, আরেকটি ক্যামেরা একই সময়ে মরুকে বাউন্ডারির গেটে দেখতে পেল। উপরে তাকিয়ে আগুন দেখছে আর মিট মিট করে হাসছে।

সবাই সেফটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে সক্ষম হয়। মরু হয়ত ইচ্ছে করেই সেফটি সিঁড়ির আশেপাশে আগুন দেয় নি। ছুটির সময়ে উপরে তেমন লোকজনও ছিল না।

পুলিশের শাসন-গর্জন, ভয়-ভীতির মুখেও মরু বয়ান পাল্টায় নি। একই কথা, নিরাপত্তাকর্মীদের নজর এড়িয়ে সে একাই গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে, সাথে এক বোতল কেরোসিন। নেপথ্যে কেউ নেই।

জজ সাহেব রায় পড়বেন। হাত বাড়িয়ে সামনের কলমটা হাতে তুলে নিলেন। মরুর ধৈর্য্য বাঁধ মানল না। হাঁটু চুলকাতে চুলকাতে আবারও তাড়া, ‘স্যার, আমার উদ্দেশ্য হাসিল। এবার রায় পড়ে দিন।’

জজ সাহেব সারাজীবনে এমন আসামির দেখা পান নি। রেগে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এমন জঘন্য কাজের পিছনে তোমার কি উদ্দেশ্য ছিল? নচ্ছাড় ছেলে!’

মরু স্বস্তির নিশ্বাস টেনে উত্তর দিল, ‘আগুন নিবারণের ব্যবস্থা রাখার আইন বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে, ঢাকা শহরের উচুঁ দালানের আগুন নিভানোর যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দমকল বাহিনীকে অতিরিক্ত দুইশ কোটি টাকা দিয়েছে। সরকারি অফিসে আগুন না ধরালে এ টাকা দিতে দেরি হতো, আরও অনেক লাশের দরকার পড়ত।’

জজ সাহেব রায় পড়তে গিয়েও পড়তে পারলেন না। আইনের চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা। বিপত্তি ঘটল। কালো কাপড়ের সাথে জজ সাহেবের আবেগের টানাটানি শুরু হল- যা জজ সাহেবের আগে কখনও হয় নি। জজ সাহেব উপস্থিত সবার উদ্দেশে বললেন, ‘রায় লাঞ্চের পর ঘোষণা করা হবে।’

পুলিশকে কাছে ডেকে জজ সাহেব মরুর দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে এজলাস ত্যাগ করলেন।

জজ সাহেবের নির্দেশ পুলিশ রাখার চেষ্টা করল কিন্তু মরু রাখতে দিল না। খাবার মুখে তুলল না।

তিনটার সময় জজ সাহেব এজলাসে ফিরে এলে আবার কাঠগড়ায় মরুর ডাক পড়ল। এই দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে মরুর আচরণ বদলে গেছে। মরু ধীর পায়ে কাঠগড়ায় উঠল- কোনো তাড়া নেই।

আদালত-কক্ষ ভর্তি লোকজন। সামনের সারিতে বাদী-বিবাদী পক্ষের উকিল। বিবাদী পক্ষের উকিল নিয়োগের কেউ না থাকায় রাষ্ট্রই উকিল নিয়োগ দিয়েছে। পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ। জজ সাহেব খু-খু করে কেশে নিয়ে তিন লাইনের রায় দিলেন, ‘বিবাদীর আচার-আচরণ,কথাবার্তায় এটাই স্পষ্ট হয় যে, বিবাদী অপ্রকৃতস্থ- প্রকারান্তে পাগল বলা যায়। বয়স ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে, কোনো সরকারি মানসিক হাসপাতালে আগামি দুবছর নিবিড়-কাউন্সিলিংয়ে রেখে বিবাদীকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হল। সেই সাথে বিবাদীর শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অধিক যত্ন নেয়ার বিষয়টি গুরত্বসহকারে স্মরণ করে দেয়া হচ্ছে।’

আদালত কক্ষে মৃদু গুঞ্জন উঠল। এতবড় মামলায় কড়া-জজ সাহেবের এমন হালকা রায়ে সবাই অবাক।

জজ সাহেবের রায় পড়া শেষ হতেই মরু তীক্ষ্নস্বরে চিৎকার শুরু করল, ‘স্যার, আমি পাগল নই- যা করেছি জেনেবুঝে করেছি। দেশের সম্পদ জ্বালিয়ে দিয়েছি। আমাকে শাস্তি দিন। আমাকে পাগল বানাবেন না। আমি সত্যিই পাগল নই, স্যার।’

জজ সাহেব চেয়ার ছেড়ে মরুর কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিস ফিস করে বললেন, ‘বাপ, আমি জানি তুই পাগল না। তোকে যারা বুঝতে পারে নি তারাই পাগল। পাগলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তোকে পাগল সাজালাম।’

জজ সাহেব নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে মরুকে শান্ত করার উদ্দেশে আশ্বস্ত করলেন, ‘দুবছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে। বের হয়ে নিজের বাড়ি ফিরে যাবি।’

মরু অবাক হয়ে বিচারককে প্রশ্ন করল, ‘বাড়ি? বাড়ি কোথায় পাব, স্যার?’

আদালত কক্ষে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বিচারকের চোখের দিকে তাকিয়ে মরু আবার শুরু করল, ‘বাবাকে চোখে দেখিনি। বাবা কোথায় মাও জানত না। মায়ের সাথে বস্তিতে থাকতাম। মা নির্ঝর টাওয়ারের সাত তলার এক ফ্লাটে ঝিয়ের কাজ করত। সকাল থেকে দুপুর। সকালে মায়ের সাথে দেখা করতে পারতাম না। মেম সাহেব দিদিমণিকে নিয়ে স্কুলে যাবার সময় বাইরে থেকে ফ্লাটে তালা মেরে যেতেন। একদিন সকালে টাওয়ারে আগুন ধরল। মা আমার বের হতে পারল না। মৃতের খাতায় মায়ের নাম উঠল না। সাহেব-মেম সাহেব মায়ের মৃত্যুর কথা গোপন করে নিজেদের অপরাধ ঢাকলেন। উনারা বললেন, মা নাকি সেদিন কাজেই যায় নি। বস্তি ছেড়ে রাস্তায় নামতে হল। সারাদিন হন্যে হয়ে খাবার খুঁজতাম। ঢাকা শহরের কোন ডাস্টবিনে কতটা বাসি-পঁচা খাবার মিলে, কোনটায় প্লাস্টিকের বোতল-ভাঙ্গড়ির হদিশ বেশি, কোন ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে টানাটানি করে খাবার ছিনিয়ে নিতে হয় তখনই মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। কোনোরাতে কমলাপুর স্টেশনে, কখনও মার্কেট বন্ধ হয়ে গেলে রাস্তার পাশের দোকানের সামনে ঘুমাতাম। সারারাত মশার কামড়। ভোরের দিকে মশার যন্ত্রণা কমলে একটু আরামে ঘুম দিতে না দিতেই দোকানের মালিক-কর্মচারির জুতা-স্যান্ডেলের ডগার আচমকা খোঁচায় ধড়ফড় করে উঠে বসতাম। স্টেশনেও আরেক বিপদ। মাঝে মাঝে রাত-বিরাতে পুলিশের তাড়া। তাড়া খেয়ে রেল লাইন ধরে সোজা দৌড়। ঘুম-ঘুম চোখে দৌড়ানোর সময় আমার দিকে দুহাত বাড়িয়ে থাকা মাকে চোখের সামনে দেখতে পেতাম। আমি যতই দৌড়াতাম মা যেন ততই দূরে সরে যেত। বাতিঘরের কাছে পৌঁছে গেলে মাকে আর দেখতে পেতাম না। বাকী রাত বাতিঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে আধো-ঘুমে কাটাতাম। সাত-আট বছর কেটে গেল। রাস্তার ছেলে- ঠিকানা নেই, কেউ বিশ্বাস করে না। চুরি করে পালিয়ে গেলে খুঁজে পাবে না ভয়ে সহসা কেউ কাজ দেয় না। কয়দিন আগে ঘুমের মধ্যে পুলিশের তাড়া খেয়ে বাতিঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে মায়ের কথা ভাবছি। ছেদ পড়ল। পাশেই ধপ করে কারো বসে পড়ার শব্দ শুনে চোখ খুললাম। নাম বলল, রতন। বোনের সাথে বস্তিতে থাকত। গার্মেন্টসে আগুন। বোন পুড়ে যাবার সাথে সাথে আমার মতো রতনেরও ঠিকানা পুড়ল। আমি যে বয়সে রাস্তায় এসেছিলাম সে বয়সে তাকেও রাস্তায় নামতে হয়েছে। বড়লোকেরা পুড়লে খবর হয়- ক্ষতিপূরণ মিলে। আমাদের মা-বোন-ভাই পুড়লে হিসাবের খাতাতেই নাম উঠে না। বছরের পর বছর কাটে, কিন্তু আগুন লাগা থামে না। ব্যবস্থা হয় না বহুতল দালানের আগুন নিভানোর যন্ত্রপাতির। বুঝলাম, দেশের হর্তা-কর্তাদের কাছায় আগুন দিতে হবে। নিজেদের কাছায় আগুন না ধরলে ওদের হুঁশ ফিরবে না। তাই তো সরকারি অফিসে আগুন লাগালাম। ব্যস, আগুন নিবারণের জন্য ঠিকই তড়িঘড়ি করে আইন-অর্থ দুটোরই বন্দোবস্ত করা হল।’

আদালত কক্ষের সবাই হতবাক। আগুন ধরার মতো খড়কুটো যার জীবনে নেই সেই কি-না আগুন নিয়ে বেশি চিন্তিত!

জজ সাহেব রায় দেবার আগেই উপলব্ধি করেছিলেন, মরু কাউকে মারতে আগুন দেয় নি। শাস্তি নিশ্চিত জেনেও আগুন দিয়েছে হাজারো মানুষকে ভবিষ্যত আগুনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। এখন মরুর সব কথা শুনে জজ সাহেব মনে মনে বললেন, ‘জীবনে যাদের কিছুই থাকে না হয়তবা শুধু তাদেরই অনেক বড় মন থাকে- বিপ্লবী মন।’

মরু কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে গেছে। জজ সাহেবের ইশারায় মরুকে পানির বোতল দেয়া হল। মরু এক ঢোক পানি খেয়ে বোতল ফিরিয়ে দিল। জজ সাহেবের প্রতি হঠাৎ সম্মোধন পরিবর্তন করে জোড় হাতে মরুর কাতর অনুরোধ, ‘জজ সাহেব, মা হঠাৎ করে জীবন থেকে হারিয়ে গেল। মায়ের লাশের ছাইটুকুও দেখতে পাই নি। এতবছর হয়ে গেল তবু মায়ের কোলের জন্য মন কাঁদে- বড্ড কষ্ট পাই। জজ সাহেব, দয়া করুন। আমাকে ফাঁসি দিন। আমি মায়ের কোলে যাব।’

মরু কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। জজ সাহেব চশমা মোছার উছিলায় পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের চোখ মুছে নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের উকিলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি তো রায় দিয়ে দিয়েছি। আপনি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন। ওর ইচ্ছা পূরণ করতে কী আপনার মন চায়?’

জজ সাহেবের কথার খোঁচার অর্থ বুঝতে রাষ্ট্রপক্ষের উকিলের অসুবিধে হল না। উকিল সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না।
বিচারক স্নেহের দৃষ্টিতে মরুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকবি বিপ্লব নামে বেঁচে থাকবি। তুই সত্যিই বিপ্লব।’

আদালত কক্ষের দরজার নিকট হতে উৎসুক জনতার মধ্য থেকে একজন জোরে মন্তব্য করল, ‘জজ সাহেবের চাকরি এবার গেল।’

জজ সাহেবের কানেও সে মন্তব্য পৌঁছাল কিন্তু সেদিকে না তাকিয়ে মরুর সাথে শেষ বারের মতো দৃষ্টি বিনিময় করে নিরবে এজলাস ত্যাগ করলেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন