থানচিতে চার খুন

হাসিবুর রহমান ভাসানীঃ

আমি রফিক।অপরাধ তদন্ত বিভাগের(Crime Investigation Department)একজন সিনিয়র অফিসার।চট্রগ্রাম ডিভিশনের দায়িত্বে আছি।আর আমার বর্তমান অবস্থান বান্দরবান সদর।

১০ই আগস্ট,রবিবার সকাল ৭টা; টেলিফোন বেজে উঠলো।অপর প্রান্তে বান্দরবান রেঞ্জের
সাব-ইন্সপেক্টর আদিল;আমার জুনিয়র,শিবরামপুরে একই কলেজে পড়তাম।
–কিরে,এত সকাল সকাল ফোন করলি ?
–স্যার একটা ঝামেলা হয়েছে।
–কি হয়েছে ?
–স্যার থানচি থেকে দশ কি.মি. ভেতরে;
একটা শুটিং টিম এসেছিলো গত মঙ্গলবার,কি একটা সিনেমার শুটিং চলছিল।
ওই টিমের চারজন সদস্যের গত রাত দশটার দিকে হঠাৎ করেই কলেরা দেখা দেয়।
এরপর উপজেলা হাসপাতালে নেয়ার পথেই রাত ১০.৫৬ এ একজন,১১.২২ এ একজন,১১.২৮ এ একজন আর ১২.০৬ এ একজন মারা যায়।
ওরা বললো যে,স্যালাইন আর সামান্য ঔষধ খাইয়েছিল কিন্তু কাজে দেয়নি।
সবার মাঝে মোটামুটি আতংক ছড়িয়ে পড়ছে।একটু পড়েই তো এটা রিপোর্ট হয়ে যাবে,তখন ব্যাপারটা আরো ঘোলাটে হবে।
বুঝতে পারছিনা যে,এখানে আমাদের কি করার আছে ?
কলেরা হয়েছে মরে গেছে;শুধু শুধু পুলিশকে টানা।
–হুম সেটাও ঠিক।আচ্ছা যাইহোক আধঘন্টা বাদে আমি আসতেছি;তুমি বডিগুলো আপাতত হস্তান্তর করো না।আমি মেপুকে নিয়ে এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি।

মেপু আমার সহযোগী;ওকে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম।
ও বললো,
–আচ্ছা রফিকদা,এখানে আমাদের গিয়ে মনে হয়না কোনো লাভ হবে;কলেরাও তো একটা রোগ,মরতেই পারে।
–মেপু দয়া করে চুপ করো।তোমার এই অনর্থক কথাগুলোতে বিরক্ত লাগছে।
মাথায় কি কিছু আসে না তোমার ?
দেড় ঘন্টার ব্যবধানে পর পর চারটা মানুষ মরে গেলো,আর এটাকে এত সহজভাবে নিচ্ছো !
খোঁজ নিয়ে দেখোতো এই অঞ্চলে গত ৫ বছরে পাঁচটা মানুষ মারা গেছে কিনা কলেরায়;অথচ গত একরাতেই চারজন শেষ।
তুমি যা দেখছো মেপু,তার বাইরেও অনেক কিছু ঘটছে যেটা হয়তো তোমার ধারণার বাইরে।

ঘটনাস্থলে পৌঁছালাম;বললাম চারজনকেই ফরেনসিকে পাঠাও।
পরিবারের দু একজন অনুরোধ করলো যাতে পোস্টমর্টেম না করানো হয়।
আমি সাফ জানিয়ে দিলাম,
–এটা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে না।এখানটায় তদন্ত হবে।আপনারা পোস্টমর্টেম শেষে লাশ পেয়ে যাবেন।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো,যে চারজন মারা গেছেন তারা চারজনেই এই টিমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
পরিচালক,সহকারী পরিচালক আর দুজন টেকনিশিয়ান।
অন্যদেরকে জিজ্ঞেস করলাম,
–আচ্ছা এই টিমের বাইরের কতজন লোক এখানে যাওয়া আসা করতো ?
–দুজন;একজন ঝাড়ুদার আর অন্যজন খাবার দাবার এনে সেগুলো পরিবেশন করে।
আমি তৎক্ষণাৎই ওই দুজনকে ডেকে সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলাম যে,নিলয় চাকমা রোজ খাবারটা ‘বাহারি’ হোটেল থেকে নিয়ে আসে।আর যে চারজন মারা গেছেন তাদের প্রত্যেকেই ওই রাতে তাদের জন্য এক্সট্রা পায়েস অর্ডার করেছিলো।
একজন কনস্টেবলকে বললাম,ওদের দুজনকে থানায় নিয়ে যাও;
আর অন্যদেরকে বললাম,
আপনাদেরও যখন দরকার পড়বে আশা করি আপনারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবেন;
আর আপনারাও আপাতত পুলিশি নজরদারিতে থাকবেন।

আমি দুজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে হোটেল বাহারি তে পৌঁছাই।বেশ গোছানো,পরিপাটি।
এখানে সর্বমোট পাঁচজন কর্মচারী।হোটেলের পুরোটা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম,সবকিছুই ঠিকঠাক।
কোথাও কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বা কোনো রাসায়নিক দ্রব্যাদি পেলাম না।

থানায় এসে একে একে ঝাড়ুদার থুসি চাকমা থেকে খাবারের দায়িত্বের নিলয় চাকমা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম।
কোনো উত্তর মিললো না।
ওরা দুজন বললো স্যার,আমরা এখানকার স্থানীয় না,সামান্য বেতনে চাকরি করি;এগুলো কেনো করতে যাবো ?
কেনো করবি সেটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেলেই বলবো,এই বলে প্রথমদিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করলাম।
ওইদিন রাতেই রিপোর্ট আসলো।চারজনেই তীব্রমাত্রায় আর্সেনিক পয়জনিং এ মারা গেছেন।
মানে হলো,আর্সেনিক পয়জনিং এর লক্ষণগুলো অবিকল কলেরার মতো হয়,তাই আপাতদৃষ্টিতে বোঝা যায় না যে এটা কলেরা নাকি আর্সেনিক বিষক্রিয়া।
এতক্ষণে ধারণা স্পষ্ট যে,খুনি খুবই বড় মাপের খেলোয়াড় আর এটা তার অনেকদিনের পরিকল্পনা।
আদালতে চারদিনের রিমান্ড আবেদন করলাম,মঞ্জুর হলো।
এখন আমার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধুই নিলয় চাকমা,কারন খাবারটা যে ওর দ্বারাই সার্ভ হতো।
তৃতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলাম,
–তোকে দেখলে কিন্তু মনে হয়না যে তুই এত বড় হারামি।
ঠিক করে উত্তর দে নয়তো বাকিটা জানিসই, ‘বাঘে ছুলে আঠেরো ঘা আর পুলিশ ছুলে ছত্রিশ’
আর্সেনিক টা মেশালি কেনো ?
–স্যার আমি কিছু জানিনা।
ঈশ্বরের কসম ইত্যাদি ইত্যাদি।

ওইদিন নিলয়কে এগারো বার জিজ্ঞাসাবাদ করলাম একটা সময় দেখতে পেলাম ও কথার জালে আটকে যাচ্ছে আর কিছু নতুন তথ্য বেরোচ্ছে।
শেষমেশ সন্ধ্যের দিকে ও মুখ খুললো;
নিবিড় চাকমার দলের সাথে আমার চুক্তি হয়েছে যে,এখানের টিম মেম্বারদের সব খবরাখবর ওদের কাছে পৌঁছাবো;বিনিময়ে প্রতিদিন দু হাজার করে টাকা দেবে।
তথ্যগুলো পাওয়ার পরই ৪৮ জন পুলিশ নিয়ে চারটা টিম গঠন করি নিবিড় চাকমার দলকে ধরার জন্য।
একদিন পরে,থানচি বাজারের কাছ থেকে নিবিড় চাকমার দলের ৪জন গ্রেফতার হয়।
ওদের টিমে মোট ২৬ জন সদস্য।
রাতেই ওই চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করি আর সেই সাথে বেরিয়ে আসে নতুন এক চরিত্র;খুনের নেপথ্যের ব্যক্তি।
একজন প্রডিউসার নাম রাজিব।সামনের ঈদে তারও একটা ফিল্ম আসছে।
আর এদিকে নবমী ফিল্মসের ঈদের সিনেমার শুটিং ও চলছিলো থানচিতে।
রাজিবের চিন্তাধারা ছিলো,যদি কোনোভাবে নবমীর শুটিংটা বানচাল করা যায়,তাহলে সামনের ঈদে সে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে পারবে;এজন্যই সে নিবিড় চাকমার দলকে আশি হাজার টাকায় ভাড়া করে যাতে যে কোনো উপায়ে নবমীর শুটিংটা ক্যান্সেল হয়।
এদিকে রাজিব মৃত্যুর খবর পেয়েই গা ঢাকা দিয়েছে।
সবকিছুই এখন আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার।
রাজিব নিবিড়কে ভাড়া করে আর নিলয়কে দিয়ে কাজটা করিয়ে নেয়।
পরবর্তীতে রাজিবকে নিকেতনে গ্রেফতার করা হয়।
একে একে সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়।
আদালতে ওঠে নিলয় চাকমা আর রাজীব।
চার খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আদলত ওদের ফাঁসির আদেশ দেয়।

ঘটনাটা এখানে শেষ হলেই পারতো…

রাত্রির বেলা ভিঞ্চি কোড বইটা পড়ে মাথাটা এখনো ধরে করছে।
তাই সকাল সকাল উঠে এককাপ চা নিলাম।খবরের কাগজ হাতে নিয়ে দেখলাম নিলয় আর রাজিবের খবরটা বেশ বড় করে ছেপেছে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি আবার থানচির সদ্য শেষ করা এই চার খুনের কেসটায় খানিকক্ষণ ডুব দিলাম।
অনেকগুলো চিন্তা মাথায় এলো,অনেকগুলো দিক নিয়ে ভাবলাম,
আচ্ছা,নিবিড়ের দল তো চাইলেই হুমকি ধামকি দিয়েই শুটিং টিমকে তাড়াতে পারতো,খুন কেনো ?
হতে পারে পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চায় নি তাই;
আবার অবচেতন মনে একবার মাথায় একটা ধারনা চেপে বসলো যে,নিলয় চাকমা এমন কাজ করার জন্য উপযুক্ত নয়;কারন লজিক বলছে,যে খুনগুলো করে তার চোখেমুখেই একটা অন্যরকম আতংক থাকে বা খানিকটা হলেও তার মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় কিন্তু আমি তো নিলয় চাকমার মাঝে সেটা সেদিন দেখতে পেলাম না।

মেপুকে বললাম;চলো থানচি থেকে একটু ঘুরে আসা যাক।
রিসোর্টে এসে পৌঁছালাম;
ওই ঘটনার পর থেকেই এটা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
এরপর ভাবলাম,হোটেলটায় একবার যাওয়া যেতে পারে এমনিতেই বেশ খিদে পেয়েছে।
রুটি আর পাহাড়ী সবজি খেতে খেতেই লক্ষ্য করলাম যে এখানে চারজন মানুষ কাজগুলো করছেন,একজন কম; আগে তো ছিলো পাঁচজন।
জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলাম যে,পনেরো দিন আগে রবি চাকমা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
এদেরই একজনের থেকে ঠিকানা নিয়ে রবি চাকমার বাসায় গিয়ে তাকে পেলাম না,তার বৃদ্ধ বাবা মাকে পেলাম।
নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
কাকা,এখানে তো গতমাসে সিনেমার শুটিং করতে আসা চারজন মানুষ মারা গেছেন,আপনারা কি সে খবর জানেন ?
বৃদ্ধ চুপ করে রইলো;
বৃদ্ধা বললো মরুকগে,মরাই ভালো।
একটু অবাক হলাম তার কথা শুনে।
কেনো জিজ্ঞেস করতেই বৃদ্ধা বললো,
ওরা দুবছর আগেও এখানটায় শুটিং করতে এসেছিলো।
ওদেরই প্রোডাকশনের দুটো ছেলে দুপুরবেলা বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছিল পাখি শিকারে।
আমার ছোট ছেলে রনিত চাকমা একটা ঝোপ পরিষ্কার করতে গেছিলো।
ওদের একটা গুলি রনিতের ঠিক কানের পাশটায় এসে লাগে,রনিত সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যায়।
প্রোডাকশনের ছেলেগুলো ঝামেলা এড়াতে রনিতকে পাশেরই একটা ডোবায় ফেলে রাখে,ছয় ঘন্টা পর ওর লাশ ভেসে ওঠে।
এ যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে এলো।
যদিও এর দুদিন আগেই আদালত রায় দিয়ে দিয়েছে।
ততক্ষনে বুঝতে পারলাম যে,আর্সেনিকটা বাহারিতেই মেশানো হয়েছিল ওই এক্সট্রা পায়েসে,
আর সেটা মিশিয়েছিল রনিতের বড় ভাই রবি চাকমা।
পুরানো একটা প্রতিশোধ চুকিয়ে নিলো।
আর সব দোষগুলো অন্যদের ঘাড়ে সুকৌশলে চাপিয়ে নিজে কেটে পড়ে।
মাসখানেক পর খবর পাই রবি চাকমা বর্ডার পেরিয়ে মিজোরামে পালিয়ে গেছে।
ততদিনে অবশ্য ওই দুজনের ফাঁসি হয়ে গেছে।

ওই ঘটনার পরে নিজের কাছে নিজেকে ভীষণ দোষী মনে হলো,খুব অনুশোচনায় ভুগতাম
রাতে ঘুমাতে পারতাম না।
তাই এর দুমাস বাদে আমি চাকরিটা ছেড়ে দেই।

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন