রহস্য গল্পঃ হাসান সাহেবের একদিন

সুস্মিতা মিলি

হাসান সাহেব বুঝতে পারছেন না তার কি হয়েছে। তিনি কি পাগল হয়ে গেলেন? নাকি তার উপরে জ্বিন আছর করেছে?

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার দিনটা বিষাক্ত হয়ে গেছে।
কাঁদতেও পারছেন না। এই বুড়ো বয়সে কি কাঁদা মানায়!
অথচ আজকের এই দিনটার জন্য প্রায় একমাস ধরে তিনি মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন আজকের দিনটার জন্য।
তিনি ভেবে রেখেছেন আজকের এই দিনটাতে তার দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে অনেক মজা করে কাটাবেন। যত টাকা খরচ করতে হয় মন খুলে খরচ করবেন। কারও সাথে একদম রাগারাগি করবেন না।
আজ হাসান সাহেবের ত্রিশতম বিবাহবার্ষিকী।
কয়েকদিন আগেই স্ত্রীকে চমকে দেয়ার জন্য অনেক প্ল্যান করেছেন। একটা দামী শাড়ী কিনে বাসায় এনে গোপন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছেন।সাথে দুই ভড়ি ওজনের একজোড়া সোনার চুড়ি।
বড় মেয়েকে বলে রেখেছেন যেন জামাই অনিককে নিয়ে আজ সারাদিন বাবার বাসায় থাকে। আজ খুব দামী রেষ্টুরেন্টে সবাই দুপুরের খাবার খাবেন তারপর ভালো কোন সিনেপ্লেক্সে একটা সিনেমা দেখে তারপর রাতের খাবার খেয়েই বাসায় ফিরবেন।

গতকাল রাতে শুতে যাওয়ার আগেওতো সব ঠিক ছিলো। ছোট একটা বিষয় নিয়ে নিলিমাকে একটা কড়া ধমকও দিয়েছিলেন তিনি। নিলিমাতো বকর বকর করতে করতে শুতে এলো। তখনতো তিনি কিচ্ছু বুঝেননি।

ঘটনার শুরু আজ সকালে। হাসান সাহেব ঘুম থেকে উঠে পাশে নিলিমাকে দেখতে না পেয়ে মিষ্টি করে ডাক দিলেন। গতকাল রাতের ধমকের জন্য মনে মনে একটু লজ্জিত হলেন। এই বয়সে এসেও যখন তখন রেগে যান তিনি। নিলিমা রান্নাঘরে ছিলো,কোন বিশেষ রান্না করছিলেন তিনি। স্বামীর ডাকে বিরক্তি নিয়ে কাছে এলেন। ভুলে গেলেন গতরাতের ধমকের কথা।

ঠিক এমন সময় হাসান সাহেব তার স্ত্রীর মনের কথা বুঝতে পারলেন! মনে মনে নিলিমা বলছেন,
—-বাপরে বাপ জ্বালিয়ে মারলো লোকটা, একটু যে নিরিবিলিতে কাজ করবো উপায় নেই বুড়ো শিয়াল কোথাকার।
তিনি হতভম্ব হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এ কি হচ্ছে? কি শুনছেন তিনি? কি করে তিনি স্ত্রীর মনের কথা বুঝলেন? সত্যিই কি নিলিমা এসব বলছে?
মিথ্যা! মিথ্যা! এমন হতেই পারে না।

কিন্তু নিলিমা কাছে এসে মধুর গলায় বললেন,

—হ্যাগো, ডাকছো কেন? আমিতো রান্না ঘরে ব্যাস্ত।
আহলাদি গলায় বললেন,

—আজ তুমি যা খাবে নাশতায় তাই হবে।
তিনি জানেন এই লোকটা যতই রাগি হোক আহলাদ করে দুটো কথা বললেই খুশি থাকে।

কিন্তু হাসান সাহেব নিলিমার ভেতরের রাগটা বুঝতে পারছেন। তিনি স্পষ্ট শুনতে পারছেন যে নিলিমা বলছে
—এতো দাম দিয়ে একটা শাড়ী আনলো আমাকে সারপ্রাইজ দেবে। এটা কোন শাড়ী হলো! শাড়ীতো নয় যেন একটা একটা বার্মিজ লুঙ্গি।
লুকিয়ে দেখে ফেলেছি এটা লোকটাকে বুঝানো যাবে না। মন খারাপ করবে।যাক তবুওতো ভালো দিনটার কথা মনে রেখেছে।
তিরিশ বছর সংসার করলাম লোকটা আমার রুচিটা এখনো বুঝলো না।
কত শখ ছিলো এবার একটা বেগুনি রঙের কাতান শাড়ী কিনবো। মিরপুর বেনারসি পল্লীতে দেখেও আসলাম।
নাহ্! আর হলো না।এতো দামি শাড়ি কি আর বারবার কিনে দেবে? একটা কিপ্টা লোকের সাথে জীবন পার করে দিলাম।
হতবাক হাসান সাহেব বুঝতে পারছেন না তার কেন এমন মনে হচ্ছে । নাকি সব তার মনের কল্পনা?
তিনি আলমারি থেকে সোনার চুড়িজোড়া বের করে স্ত্রীকে দিলেন। বললেন,

—-তোমাকেতো কিছু নিজ হাতে কিনে দিইনা। দেখতো পছন্দ হলো কিনা।
নিলিমা অবাক হয়ে উপহার হাতে নিলেন। ছলোছলো চোখে বললেন,

—-তুমি যা এনেছো তাতেই আমি খুশি। খুব পছন্দ হয়েছে।
কিন্তু হাসান সাহেব শুনছেন ভিন্ন কথা। তিনি শুনছেন নিলিমা চুড়ি পরতে পরতে বলছে,

—-আহা এতগুলো টাকা খরচ করে এটা কি চুড়ি আনলো?মেয়ের বিয়ের শপিং করার সময় দেখেছেন বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে কত সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের চুড়ি পাওয়া যায়।

হাসান সাহেব বললেন,
—-তুমি চাইলে এগুলো পাল্টে পছন্দের চুড়ি নিতে পারবে। আমার কাছে ক্যাশম্যামো আছে
একথা শুনে নিলিমা চমকে উঠলো বললো,
—না না কেন পাল্টাবো! এগুলো অনেক সুন্দর। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।

স্ত্রী আর ছোটমেয়ে সাথীকে নিয়ে নাশতার টেবিলে বসলেন তিনি । নাশতায় আজ তার পছন্দের সব আইটেম। সাথী এবার অনার্স সেকন্ড ইয়ারে পড়ছে। নাশতা খেতে খেতে ভাবছেন স্ত্রীর সাথে সারাদিনের একটা পরিকল্পনা করবেন। রিটায়ার্ড করার পর এটাই তাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী।
হঠাৎ করেই তিনি বুঝতে পারলেন সাথি মনে মনে ভাবছে তার বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার কথা কিভাবে তার বাবাকে বলবে। সাহসে কুলাচ্ছে না। এর আগেও ডিপার্টমেন্ট থেকে সবাই ঘুরে এসেছে। অনেক টাকা লাগবে। তাই ভয়ে বাবাকে বলছে না। বাবার এই মেজাজকে সবাই ভয় পায়। তাইতো অনেক কথাই বাবার কাছে সবাই লুকিয়ে রাখে। ভয় লাগে কখন রেগে তুলকালাম কাণ্ড করে বসেন।
মাকে বললে বিষয়টাকে ঘেটে একদম হালুয়া বানিয়ে ছাড়বে।তাইতো মাকেও বলছে না।

আমি টাকার জন্য তোমাকে কোথাও যেতে দিইনা এটা ঠিক নয়। বাবা হিসেবে আমি তোমার নিরাপত্তা নিয়েই বেশি টেনশন করি। বন্ধুদের সাথে মজা করতে গিয়ে অনেক সময় বড় বড় বিপদ আসে। যদি নিজে সাবধানে থাকতে পারো তবে যাও। কোন সমস্যা নেই। হঠাৎ হাসান সাহেব একথা বলে উঠলেন।

বাবার কথা শোনে চমকে উঠলো সাথী। নিলিমাও অবাক হয়ে গেলো। এসব কেন বলছেন তিনি?
দশটার সময় বড়মেয়ে বীথি এলো।অনিক এলো না। তার অফিসে নাকি অনেক ঝামেলা। হাসান সাহেব তার স্ত্রীকে দেয়ার জন্য কিনে আনা শাড়িটা বের করলেন না। তিনি ভেবে নিয়েছেন দু একদিন পর শাড়ীটা বদলে একটা বেগুনি কাতান কিনে দেবেন স্ত্রীকে।

দুপুরে সবাই বাইরে যাবে নিলিমা আলমারি খুলে উসখুস করতে লাগলো।
কি পরবেন ভেবে পাচ্ছেননা। হাসান সাহেব বুঝতে পারলেন বিষয়টি। তিনি কাছে এসে নরম সুরে স্ত্রীকে বললেন,

—–আমার শপিং করার রুচি একদম খারাপ। এতো বছরেও তোমার রুচি ধরতে পারিনি। একটা শাড়ী কিনে এনেছিলাম। তোমাকে দিইনি। ভাবছি বদলে একটা কাতানশাড়ী কিনে দেবো। কতদিন হলো তোমাকে কাতানশাড়ীতে দেখিনা। একটা বেগুনি কাতান কিনলে কেমন হবে বলতো?

বদমেজাজি হাসান সাহেবের এমন নরম কথায় নিলিমা কেঁদে ফেললো। বললো,

—-তোমার আজ কি হয়েছে বলতো? সকাল থেকেই কেমন করে উল্টাপাল্টা কথা বলছো। দেখি কি এনেছো? তারপর শাড়ীটাকে জোর করে নিয়ে তিনি পরে ফেললেন। বললেন,

—দেখতো কেমন লাগছে?
হাসান সাহেব বুঝতে পারছেন নিলিমা মনে মনে বলছে,
—-আহা লোকটা পছন্দ করে শাড়ীটা আনলো আর আমি এসব কি ভাবছিলাম। ভালোবাসার উপহারের চেয়ে কি বেগুনি কাতান বড় হলো। গুলি মারি কাতান শাড়ীকে। আমি এই বয়সেও যথেষ্ট সুন্দরী। আমি যাই পরিনা কেন তাতেই আমাকে সুন্দরী লাগে।

হাসান সাহেব হেসে ফেললেন। বললেন,
—আসলেই তুমি যা পরো তাতেই তোমাকে অপরুপ লাগে। তাইতো কিছু কেনার সময় এতো কিছু ভাবিনা আমি।

দুপুরে সবাই সবার পছন্দমতো খাবার খেলো।তারপর সিনেমা দেখলো। রাতের খাবার খেয়ে ফিরবে। আজ সবাই খুব খুশি।হাসান সাহেবের মনটাও বহুদিন পর ফুরফুরে লাগছে। অনেকদিন পর তিনি কারো সাথে রাগ করেননি। অকারণ হৈচৈ করেননি। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন বড় মেয়ে বীথি কাঁদছে। তিনি চমকে তাকালেন মেয়ের দিকে। তিনি দেখলেন মেয়ে উপরে উপরে হাসলেও মনে মনে কাঁদছে।বলছে,
–আমরা এতো ভালো ভালো খাবার খেলাম। কিন্তু বাবা মা একবারও অনিকের কথা ভাবলো না। ওর জন্য কিছু খাবার পার্সেল করে দিলে কি এমন ক্ষতি হতো! আমি সারাদিন মজার মজার খাবার খেয়েছি আর বেচারা সারাদিন পর অফিস থেকে এসে ফ্রিজের খাবার গরম করে খাবে।

হাসান সাহেব তাৎক্ষণিক ড্রাইভারকে বলে আবার গাড়ি ঘোরালেন। আবার ফিরে গেলেন রেষ্টুরেন্টে । সকল খাবার আবার বেশিকরে পার্সেল করে আনলেন। মেয়েকে তার বাসায় নামিয়ে দেয়ার সময় শুধু বললেন,
বাবাতো বুড়ো হয়ে গেছি মনে ছিলোনা কিন্তু তুমি নিজে কেন মনে করে অনিকের জন্য খাবার নিলেনা? বিয়ে হয়ে গেলে কি বাবা মাকে এতো পর ভাবতে হয়?

সেদিন রাতের বেলা শুতে যাওয়ার সময় হাসান সাহেব আর বহু চেষ্টা করেও স্ত্রীর মনের কথা বুঝতে পারেননি। বদমেজাজী হাসান সাহেব বুঝতেও পারলেননা কি কারনে আজ সারাদিন তিনি সবার মনের কথাটা বুঝতে পারলেন। তবে তিনি উপলব্ধি করলেন এই রহস্যময় বিষয়টি যদি আরও অনেকবছর আগে ঘটতো তাহলে জীবনটা হয়তো আরও অনেক রঙিন হতো। স্ত্রী আর মেয়েদের সাথে হয়তো এতো দূরত্ব সৃষ্টি হতো না।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন