আজ তার বিয়ে

এন জে ফারহাঃ

জমকালো মরিচার ঝালরে পুরো বাড়ি সাজানো। লাল নীল বিভিন্ন রঙের বাতি দিয়ে পুরো বাড়ি লাইটিং করা হয়েছে। যেন রূপকথার রাজ্য। বরের বাড়ির ব্যাপার একটু আনন্দের আতশবাজি বেশিই পৌঁছে যাচ্ছে বাতাসের কান ঘেঁষে পাড়ার পুরো শরীরে! কেবল আমার ভীষণ দুঃখবিলাস মন। আনন্দের খড়ঁকুটোও নেই কমলা শুকনো ঠোঁটে।
একবার চোখ বুলাতেই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। টুপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
আজ আজিজের হলুদ ছোঁয়া। ঘরের এককোণে বসে বসে কাটানো মুহূর্তগুলো চোখে ভাসাচ্ছি।ভাবলাম,জানালা খুলে কাকে দেখব? প্রকৃতি, ঈশ্বরকে? আমি তো তাদের দেখতে চাই না। আমি দেখতে চাই আমার প্রিয় মানুষ প্রিয় শরীরকে(মন)! আনন্দময় মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়ে হৃদয়টা খুব কুঁকড়ে নড়ে উঠল। যেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়টা পুরো কেঁপে উঠল। এমন সময় চাচাতো বোনরা এসে বলল আজিজদের বাড়ি যাবে। এমনভাবে ঘিরে ধরল না করার উপায় ছিল না। অজুহাতের তিনহাত পঙ্গু! ওদের কথা ফেলতে পারলাম না কোনভাবেই। নিজেকে শক্ত করে তাদের সাথে গেলাম। একটু যেতেই তার বিয়ের গেট দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারিনি। ভেতরটা দুমড়ে মুছড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছে ইটগুড়োর মতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছি আমি ও আমার সব!
মনে হলো এক শক্তিশালী টাইফুন আমার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। পায়ের নিচের মাটিগুলো সরে যাচ্ছে। কাউকে না পারছি কিছু বলতে না পারছি সইতে। ভেতরে সব জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কষ্টের মাত্রা তীব্র হতে তীব্রতর হচ্ছে মুহূর্তেই। অন্ধকারে কেউ আমার অশ্রুবিসর্জন দেখেনি। সহ্য করতে না পেরে দৌঁড়ে বাড়ি চলে আসি। রুমে এসে নিঃশব্দে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেই চলেছি। চোখগুলো মনে হল সত্যিই খুব বাজেভাবে স্বার্থপরতা করছে আমার সাথে। মানুষ বুঝি নিজের সাথে পেরে না উঠলে কেঁদে ফেলে বহমান নদীর মতোন! নিজের একান্ত অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়েও অন্যের জন্য অবিরাম কাঁদে।
রিনি(চাচাতো বোন) এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে, সে আমার ব্যাপারটা জানে। সে হয়তো খেয়াল করেছে আমার দৌড়ে আসাটা। দরজা খুলে ও-কে ভেতরে নিয়ে আবার দরজা আটকে দেই। ও-কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই ডুকরে কেঁদে চলেছি। শত কষ্টের মাঝে সান্ত্বনার একটা মানুষ ফেলে কষ্টগুলো কিছুতেই চেপে রাখা যায় না। প্রাণ খুলে আরও কাঁদতে ইচ্ছে করে। থামানোর চেষ্টা করেও না পেরে হাল ছেড়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলাতে থাকে। আমি বোকা হই ক্রমশ, প্রেম পাই না!
অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে উঠে পড়লাম। রিনি মুচকি হেসে চলে গেলে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই। একা একা আর কতক্ষণই বা বিষন্নতা পাহারা দেয়া যায়? মন শত শক্ত করলেও মনটা যে অবুঝ, বেহায়া।
চোখ মুছেও কাজ হচ্ছে না। পাহাড়ি ঢল কি আর বাঁধ মানে? না পেরে ইচ্ছে মতো অনেকক্ষণ অশ্রু ঝরাই। রিনি আবার এসে আমাকে তার রুমে নিয়ে যায়। বিভিন্ন কথা বলে হাসানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু যে মন ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে সেই মনে কি আর হাসির ফুল ফোটে?
আম্মুর আবদারে রাতে অল্প একটু খেয়ে নিলাম। নয়তো আম্মু কষ্ট পাবে। শোয়ার পর সে যেন আমায় আগুন ছুড়ে মারছে। প্রতিটা বাজানো গানের আওয়াজ আমার হৃদয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঢুকছে। মানুষ কী অদ্ভুদ, নিজের মনকে ইচ্ছে মতো উপভোগে ভাসিয়ে আমাকে কষ্টের মহা সমুদ্রে কোনো সহায়ক কিছু ছাড়াই ঠেলে দিলো।অটোমেটিক চোখের পানি অনর্গল ঝরছে। মনে হচ্ছে আমার ভেতর থেকে জোর করে ছিড়ে যাচ্ছে তার প্রজাপতি কপাল (হৃদয়)। চাইলেও থামাতে পারছি না। কষ্টের পরিমাণ এতবেশি যে বেঁচে থাকার আশাটুকু হারিয়ে ফেলছি। বেঁচে আছি তবে মরে মরে গিয়ে বাঁচা যাকে বলে! এখনও পর্যন্ত তার আনন্দের সুরগুলো আমার কলিজা ভেদ করে যাচ্ছে। চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে হৃদয়। ইচ্ছে করছে কলিজাটা ছিড়ে তাকে উপহার দিয়ে আসি। আমার তো এখন আর হৃদয়ের কোন দরকার নাই। চোখের পানির ফোটায় ফোটায় ডায়েরীর পাতা ভিজে ভিজে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। অনেকটা ভিজে গেল, ইচ্ছে করলেও আর লিখা সম্ভব হচ্ছে না। অঝর বৃষ্টির ধারা হয়ে পাহাড়ি ঢল অনবরত ঝরছে। দৃষ্টি ঝপসা হয়ে নোনা দরিয়া ভরে দৃষ্টি বিলীন করে দিচ্ছে।
নাহ! আর লিখতে পারছি না। সাদা কাগজে দাগ লাগলে তাকে মানুষ দাগ নয় কালি বলেই চালিয়ে দেবে হয়তো!!
শেরওয়ানি আর পাগড়ী পরে যখন বউ আনার উদ্দ্যেশে বের হলো আজিজ। আমার মনে হচ্ছে, আমার প্রাণটা কেউ সরাসরি হাত দিয়ে টেনে ছিড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। সহ্য করতে পারিনি এমন বেদনাদায়ক স্বার্থপরতার দৃশ্যটা। পুরোপুরি দেখার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।
যখন জ্ঞান ফেরে তখন বিকাল চারটা। মাথার কাছে আম্মু আর রিনিকে দেখতে পেলাম। আম্মুর মুখটা মলিন হয়ে আছে। রিনি আমাকে চোখ খুলতে দেখে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। আম্মু উঠে চলে গেল কোনো এক কারণে। রিনি আমায় ধরে বসিয়ে বলল, আজিজ তো বউ নিয়ে চলে এসেছে। নিচের দিকে তাকিয়ে মনের সাথে যুদ্ধ করলাম। দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁটগুলো শক্ত করে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। রিনি তার ফোনটা এগিয়ে দিলো। বর বেশে আজিজকে মাশা-আল্লাহ! অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। পরক্ষণে মনে হলো এই বেশে এসে তো আমায় বধু করে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! ঘুর্ণিপাক উল্টো পথে বয়ে গেল। আমার মনে ফোটানো গোলাপটা মনের অজান্তেই ঝরে গেল। এই ফুল কি আদৌ আর ফুটবে?
বইটা বন্ধ করে আরনিন ভাবতে লাগলো শেষের পৃষ্ঠাগুলো ছেড়া কেন? এর শেষ কী হয়েছিল? কার কাছ থেকে জানতে পারব? এসব ভাবতেই মনে পড়ল রিনি। রিনিই দিতে পারবে এর উত্তর। সাথে সাথেই ফোন করল রিনিকে,
— কিরে আরনিন আজ এতদিন পর মনে পড়ল বুঝি?
— রিনিয়ামু ‘আজ তার বিয়ে’ গল্পের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? সেই ফুল কি আদৌ ফুটেছিল আর?
— কাল বাসায় আয় বলবো।
রিনি ফোন কেটে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
রাত্রি এগারোটা!
দুজনে খোলা আকাশের নিচে বসে আছে।
— হ্যাঁ ফুটেছিল। কিন্তু সেই ফুল অন্য বাগানের। ফারহা মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে বাঁচানো মুশকিল হয়ে দাড়িয়েছিল। তাই তার বাবা মা ফারহার অজান্তেই বিয়ে ঠিক করে। তাকে রাজি কিনা জিজ্ঞেস করলে সে কোনো উত্তর করত না তাই বাধ্য হয়ে ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের বছর মাথায় তার ছোট্ট পরির আগমন। ফারহা তখন সুস্থের দিকে। কিন্তু কী এমন হলো ফারহার হঠাৎ করেই ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে!
— এরপর?
— সমাপ্ত।
— এর শেষ এমন কেন দিলে?
— তোর মায়ের জন্য।
— মা’র জন্য?
— তোর মা যদি হুট করে আত্মহত্যা না করত গল্পটা অন্যরকম হতো।
রিনি চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।
— মা ও মাগো কেন এমন করলে? তোমার ছোট্ট পরিটার কথা একবারও মনে পড়ল না? কেন হঠাৎ সবাইকে ফাঁকি দিলে? কী এমন হয়েছিল তোমার যে অবুঝ আরনিনকে রেখে যেতেও বুক কাপলো না। বলো মা উত্তর দাও মা উত্তর দাও।
কাঁদতে কাঁদতেই জ্ঞান হারায়। রিনি পাশে বসে বলল,
— সরিরে সোনা উত্তরটা জেনেও অজানা ক্ষমা করিস আমায়। জানিস তো সব উত্তরের লিখিত রূপ, মৌখিক ভাষা থাকে কিছু উত্তর থাকে হৃদভেদী বাতাসের ডগায়, বুকের গভীরতার আমিন ধরলে সে উত্তরের আওয়াজ পাওয়া যায় ;যা খুবই বিকট আফসোস জনক!

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন