কথোপকথন

 

আচ্ছা বলো ত সবুজ না কি নীল কোন টিপ মানাবে আমাকে? বুঝছিনা.. পাহাড় না কি সমুদ্র হবো!

লাবণ্য … এক মাস শেষের পথে! আর মাত্র দু মাস আছে! এখন তুমি টিপ নিয়ে পড়ে আছো তবুও মাঝ রাতে! তোমার এই মাঝ রাতে সাজগোজ করার ছেলেমানুষী বন্ধ হবে কবে?

জানি না… তাহলে তুমি বলবে না? আচ্ছা । আজ না হয় আমি পাহাড় হই। সবুজ আর সবুজ। খুব দরকার এই সময় মনের সজীবতা।

লাবণ্য তুমি সিরিয়াস হতে পারো না! সামনের দিনগুলো কেমন করে যাবে তার চিন্তায় আমার দম বন্ধ লাগছে।
এই কঠিন সময়ে চাকুরী চলে যাওয়া মানে বোঝ কিছু? কোথাও কোন চাকুরী পাবো না। চারপাশে চলছে কর্মী ছাঁটাই উৎসব! মালিক পক্ষ একবারও ভাবছে না এতোদিন ধরে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সততার সাথে চাকুরী করে গেলো তাদেরকে করোনা মহামারির কথা বলে হঠাৎ চাকুরী থেকে বাদ দেওয়া অমানবিক শুধু নয় চরম অপমান করা! বেতন কেটে রাখতে পারতো! ডিউটি বাড়িয়ে দিতে পারতো অন্য কিছু ভাবতে পারতো। বিকল্প কোন কিছু ঠিক বেড়িয়ে আসতো… তা না করে দুম করে বলে দিলো তিনমাস পর আপনাকে আর আসতে হবে না! এ অপমানটা নেওয়া যায় না লাবন্য!

তোমাকে কেউ অপমান করবে সে তোমার বস হোক বা অন্য কেউ! আর আমি তাকে ছেড়ে দিবো তা তুমি ভাবলে কি করে শুভ্র?

তুমি আর কি করবে লাবণ্য? আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের অপমান কেউ গায়ে মাখে না। মাঝে মাঝে মনে হয় মধ্যবিত্তদের বিবেক নামক বস্তু না থাকলে খুব ভালো হতো। তারা না পারে অন্যায় করতে না পারে হাত পেতে কারো কাছে সাহায্য চাইতে… ভেতরে কষ্টের পাহাড় আর মুখে হাসির ঝর্ণা! মধ্যবিত্ত মনটা বড়ই আজব!

ওসব কথা রাখো ত শুভ্র! কষ্ট করে একটু তাকিয়ে দেখো সবুজ শাড়িতে কেমন লাগছে আমাকে? এখনো অবশ্য চোখে কাজল দেওয়া হয়নি….
.মনে আছে প্রথম বেতন পেয়ে এনেছিলে আমার জন্য এই শাড়িটা তাও বছর পনেরো হবে! আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম একদম পাহাড় সবুজ রঙ! তুমি হাসতে হাসতে বলেছিলে তোমরা মেয়েরা পারো ও বটে! সবুজ সেটা না কি আবার পাহাড় সবুজ! মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা….

লাবণ্য আমার শুধু মনে পড়ছে দু’মাস পর আমি বাড়ি ভাড়া দিবো কি করে? সন্তানের খরচ… সংসারের এতো এতো খরচ! কতোদিন আর জমানো টাকায় চলবে? যদি কোন বড় বিপদ আসে তা সামলাবো কি করে?

শুভ্র… আপাতত যদি শব্দটা বাদ দিই আমরা জীবন থেকে। যদি ব্যাক্তিটা খুব খারাপ! অকারনে হাজার টেনশন টেনে নিয়ে আসে। ক্ষমতা থাকলে যদি ব্যাটাকে বাংলা অভিধান থেকে বাদ দিয়ে দিতাম। আমরা বাঁচবো বর্তমান আর অতীতের ভালো সময়গুলো নিয়ে। আর তোমার যদির ঠ্যালায় যদি আমার কাজল লেপ্টে যায়.. তাহলে তোমার বারোটা বাজিয়ে দিবো। তোমার যদি এসেও কিন্তু তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।

হা হা হা হা তুমি পারো ও বটে লাবণ্য! তোমার কথায় কোনদিন পেরে উঠিনি আজও পারবো না।

এই তো গুড বয়। তোমার এই হাসিটাই মিস করছিলাম এতোক্ষন।
তোমাকে বলতে চাইছিলাম না। ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিবো কিন্তু তুমি যে ভাবে চাকুরী চাকুরী করে মন খারাপ করছো মনে হচ্ছে ফাঁশির আসামী। দিন গুনছো! দেখি তোমাকে ফাঁশির আসামী থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া যায় কি না?
খুব ছোট করে বলি তোমার অনুমতি না নিয়ে আমি কয়েকটা কাজ করে ফেলেছি।

১ / আমাদের গেস্টরুম কাজে লাগে না। বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলে সাবলেট দেওয়ার পারমিশন নিয়ে নিয়েছি। সামনে মাস থেকে আসছেন আমাদের নতুন অতিথি রায়হান সাহেব এবং তার মিসেস। ৭০+ বয়স। খুবই ভালো উনাদের সন্তানরা দেশের বাহিরে থাকেন।একা থাকতেন কিন্তু এখন বাহিরে যাওয়া নিজে বাজার থেকে শুরু করে সব কিছু করা তাদের জন্য কষ্টকর আমিও এমন একজন সাব লেট খুজঁছিলাম। পেয়ে যাওয়াতে ভীষণ খুশি৷ ভাড়া যা বলেছি তাতেই শুধু রাজী না মহা রাজী।কারন তারা আমাদের পরিবারের অংশ হয়ে থাকবেন৷ তাদের কোন রান্নার ঝামেলা থাকবেনা।

২ মহুয়ার স্কুল প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে রিকোয়েস্ট করা তে উনি অস্থায়ী ভাবে আমাকে সপ্তাহে ৪ দিন ভিডিও ক্লাস নেবার সুযোগ করে দিয়েছেন। সম্মানীটা খুব কম না কিন্তু। তা দিয়ে মহুয়ার পড়াশুনার খরচ দিব্বি চলে যাবে।

৩ লাস্ট যে কাজটা করেছি… শুনলে হাসবে কি না বুঝতে পারছি না! রহিম ভাই আমাদের সবজি ওয়ালা উনাকে চাকুরী দিয়ে দিয়েছি। মাস শেষে বেতন নিয়ে যাবেন। আর আমার পরিচিত ১০ পরিবারের কাছে প্রতিদিন সবজি ফলমুল বিক্রি করবেন। মুলধন আমার পরিশ্রম রহিম ভাইয়ের। টাকা বিকাশে আমার একাউন্টে চলে আসবে। প্রতিটি আইটেমের সাথে কেজিতে আমরা ৫ টাকা করে বেশী নিবো সেটা বলেই নিবো। রহিম ভাই দারুন একটা বুদ্ধি দিয়েছেন সে তার পরিচিত মুরগীওয়ালা কে চাকুরী দিতে বলেছেন। তাহলে ১০ পরিবারকে অন্তত বাজার করার জন্য বাহিরে বের হতে হবে না।এর মাঝে কিন্তু রহিম ভাইয়ের পরিবারও আছে তবে তারা বিনা অর্থে তাদের সবজিগুলো নিয়ে থাকবেন । পেটের ভাবনা ভাবতে হবে না রহিম ভাইকে। খুশী মনে চাকুরী করতে পারবে।সবাই চাহিদা মতো সব কিছু পেয়ে যাবে শুধু আমাকে একদিন আগে মেসেজ করে দিবেন তাদের কি দরকার? সে অনুযায়ী পেয়ে যাবেন ….
এখন বলো শুভ্র বুদ্ধিটা কেমন? আর কোন যদি আছে তোমার মনে? আর একটা কথা তুমি সামনের মাসে অফিসে গিয়ে নিজেই চাকুরীটা ছেড়ে দিয়ে আসবে৷ এটই হবে তোমার নিরব প্রতিবাদ।

লাবণ্য তুমি কখন এতো সব করেছো? আমার তে বিশ্বাস হচ্ছে না…

যেদিন তুমি মন খারাপ করে অফিসে থেকে বাসায় এসে সব জানালে…. ভয় পেলেও ভাবলাম দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না? মনে আছে বিয়ের আগে আমরা ভেবেছিলাম তোমার চাকুরী না হলে আমরা একটা ফুলের দোকান দিবো।সাথে থাকবে বইয়ের লাইব্রেরী। জমজমাট ব্যাবসা হবে। কিন্তু দুম করে তোমার চাকুরীটা হয়ে গেলো আর আমার স্বপ্ন পূরন হলো না। সুযোগ যখন পেয়েছি একবার চেষ্টা করতে দোষ কি? তুমি একটু একটু করে হাল ছেড়ে দিয়েছো আর আমি একটু একটু করে ভরসা হবার চেষ্টা করেছি….

লাবণ্য আমার বলার ভাষা নেই….

সে তোমার বরাবরই কম! সারারাত কি বকবক করবে না কি ? এখনো অনেক কাজ বাকী আছে। কাপড়ের অনেকগুলো মাস্ক বানাতে হবে।রহিম ভাইদের নিরাপত্তার কথা আমাদেরই তো ভাবতে হবে।
এই ভাইরাস করোনা মহামারী একদিন চলে যাবে তাই না। আবার আমাদের ভালবাসাগুলো স্বাভাবিক শ্বাস নিবে।পৃথিবী ঝলমলিয়ে উঠবে তার রঙ নিয়ে।বন্দী জীবন থেকে মুক্তির স্বাদ পাবো আমরা সবাই তাই না শুভ্র?
চলো বাহিরে খুব সুন্দর জোছনা। ব্যালকনীতে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসি। ঠিক বিয়ের পর যেমন কাটাতাম…..

একদম ই না লাবণ্য! আমাকে এতোটা বোকা ভেবো না তুমি।
লাবণ্য নামক জোছনায় ঝলমলিয়ে আছে আমার পুরোটা ঘর! সবুজে আজ ভীষণ মায়াবতী লাগছে তোমাকে। সেখানে জোছনার আলো যা ছুঁতে পারবো না তাতে ভাসিয়ে যাবার মতো বোকামী করতে চাই না । আজ আমার জোছনার আলোয় আমি লুটপাট হবো মন ভেজাবো ইচ্ছে মতো.

লেখক-সোহানা চৌধুর,  কথাসাহিত্যিক ও কবি

 

আরও পড়ুন