সুইসাইড বাসনা

সুস্মিতা মিলি

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ফোনটা সবসময় কাছে রাখে মীরা। যেদিন ফোনটা কাছে থাকেনা সেদিন বেছে বেছে জরুরি ফোনগুলো রাতে আসে। আর মীরার হাসবেন্ড অয়ন ও সবসময় বিদেশ থেকে রাতে ফোন করে।
যেদিন সে ফোন ধরেনা তারপর কয়েকদিন সে গুসা করে থাকে। ফোন করেনা, মীরা করলেও সে ফোন ধরেনা।
যেন মৌনব্রত পালন করছে।

আজও মীরা মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানায় রাখলো। সে একটা স্কুলে পড়ায়। ক্লাস টেষ্টের খাতা দেখতে লাগলো। এক সময় ক্লান্ত হয়ে
একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলো অল্পক্ষণের ম­ধ্যেই। হঠাৎই মোবাইলের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো মীরার। আননোন নাম্বার। প্রথমে ভাবলো ধরবে না। তারপর কি মনে করে রিসিভ করে কানে ধরতেই একটা চাপা কান্নার আওয়াজ পেলো সে। বুকের ভেতরটায় ধ্বক করে উঠলো মীরার। ফোনের অপর পাশে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কে যেন কাঁদছে।
কে কাঁদে এমন করে? কেন কাঁদছে? কোন কথা বলছে না শুধু কাঁদতেই লাগলো একটা মেয়ে। মীরা কে কে বলেই যাচ্ছে, কিন্তু কান্না থামছেইনা।

হঠাৎ মীরা কি হলো বললো
— কি হয়েছেরে মা, কাঁদছিস কেন? মা বকেছে?

অপরিচিত মেয়েটা যেন এমন গলার জন্য প্রস্তুত ছিলোনা। হেচকি তুলতে তুলতে বললো,

—আমি মরে যেতে চাই। আর বাঁচতে চাইনা।এই জীবনে আমি যদি ওকে না পাই তবে বেঁচে থেকে কি লাভ? আমি আর কষ্ট নিতে পারছিনা।

—কাকে না পেলে মরে যাবে তুমি? আর আমাকে ফোন দিয়েছো কেন?

—আমিতো এখন মরে যাবো। তাই সুইসাইড করার আগে জীবনের শেষ সময়টাতে একজন অপরিচিত মানুষের কাছে মৃত্যুর কারনটা বলে যেতে চাই। মেয়েটা বললো।

অপরিচিত মেয়েটার কথা শুনে আঁতকে উঠলো মীরা। একি শুনছে সে! মেয়েটা কে? তার মা বাবা কোথায়? মীরার শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগলো । ভাবছে মেয়েটাকে যে করেই হোক কথায় ভুলিয়ে রাখতে হবে।

—তোমার নাম কি? কোন ক্লাসে পড়ো?
আমার নাম বলবো না। কালকের পত্রিকা খুললেই খবরটা দেখতে পাবেন।তখন নাহয় নামটা আর কোন স্কুলে পড়ি সেটা দেখে নিবেন। আমি আপনার সাথে কথা শেষ করেই ব্যালকনি থেকে লাফ দেবো।তারপর সব শেষ হয়ে যাবে।

—তোমরা কত তলায় থাকো। মানে দুই তিন তলা থেকে লাফ দিলে শুধু হাত পা ভাঙবে মরবে না।পরে বেঁচে গেলে বন্ধুরা সবাই তোমাকে ক্ষেপাবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটলে সবাই তেমাকে ল্যাংড়া বলবে।
তোমাকে নিয়ে সকলে হাসাহাসি করবে। এটা কি ভালো হবে?
মীরা খুব সিরিয়াস ভাবে কথাটা বললো।

——এই সুযোগ নেই আন্টি। আমরা নয় তলায় থাকি। একবার লাফ দিতে পারলেই শেষ। মেয়েটা জেদের সাথে বললো।

——ঠিক আছে তাহলে একটা কাজ করো, লাফ দেয়ার আগে একটা জিন্স আর সুন্দর একটা জামা পরে নিও।মীরা বলে।

—-কেন? আমিতো মরেই যাবো, মরে যাওয়ার আগে জিন্স পরবো কেন?

—–আরে মেয়ে বুঝতে পারছো না কেন! যখন তুমি নয় তলা থেকে লাফ দিবে তখন তোমার মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে যাবে।
চারদিকে মগজ আর রক্ত ছিটকে পরবে। হাত পা ভেঙে যাবে। তখন আশেপাশের সকলে আসবে দেখতে। রক্তে মাখা মুখটা দেখা যাবে না। আশেপাশের বাসার দারোয়ানেরা গায়ে হাত দিয়ে তোমাকে দেখার চেষ্টা করবে। তখন যদি তুমি স্কার্ট কিংবা পালাজ্জো পরো তখন সেটা হাঁটুর ওপরে উঠে যাবে। আর কিছু দুষ্ট লোক আড়চোখে তোমার সুন্দর শরীরটা দেখবে। মনে মনে হাসবে।

—–ছি ছি কি বলেন! দারোয়ানেরা আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখবে? ভাবতেই বমি আসছে আমার। মেয়েটা বলে,,,

——শুধু দারোয়ান! পোস্টমর্টেম করার সময় ডুমেরা মদ খেয়ে তোমার সুন্দর শরীরটাকে কেটেকুটে দেখবে। ওরা তোমাকে নিয়ে বিশ্রী বিশ্রী কথা বলবে তারপর খিকখিক করে হাসবে। মীরা বলে

এসব কথা শোনে মেয়েটা চুপ করে গেলো। কিছুটা ক্লান্ত গলায় বললো,

—–আপনি কি করে বুঝলেন আমি সুন্দর? আমিতো দেখতে পঁচা। আর পঁচা বলেইতো সিফাত আমার সাথে ব্রেকআপ করেছে। আমার বেস্টফ্রেন্ড সেমন্তিকে নাকি ওর কাছে বেশি সুন্দর লাগে। আর সেমন্তিও সিফাতের সাথে রিলেশন করেছে।

—–তাই! সিফাত নিজেই হয়তো তোমার যোগ্য নয়। যে সে ছেলে কি আর তোমার মতো বুদ্ধিমতী মেয়ের বয়ফ্রেন্ড হতে পারে? অথচ এমন একটা বাজে ছেলের জন্য তুমি মরতে চাও।
তুমি মরে ভুত হয়ে যাবে আর ওরা দুজন মজা করবে। সেটা হলে কি ভালো হবে? মীরা আস্তে আস্তে বলে।

—-আন্টি আমার আর কথা বলতে ভাল্লাগছে না। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি মরতে চাই।

——তুমি মরে গেলে তোমার বাবা মায়ের কি হবে? ওরা তোমাকে এত আদর করে বড় করেছে আর তুমি অন্য একটা ছেলের জন্য মরে যাবে? মীরা বুঝালো।

—–বাবা মায়ের কিছুই হবে না। ওদের কাছেতো আরেকটা মেয়ে আছেই। একদিন ঠিক আমাকে ভুলে যাবে। মনমরা হয়ে মেয়েটা বললো।

—–ছেলেটা হয়তো জানবেই না তুমি কি জন্যে মরছো। এদিকে তোমার বিভৎস লাশ দেখে হয়তো তোমার মায়ের স্ট্রোক হয়ে যাবে।

—–না আমার মা অনেক শক্ত। তার একমেয়ে মরে গেলে কিছুই হবেনা। উল্টা সিফাতের কথা জানলে আমাকে অনেক বকবে। জেদের সাথে মেয়েটা বললো।

—–একদিন আমিও তোমার মতো বয়সে মরতে চেয়েছিলাম। সেদিন আমার মায়ের ভয়ে মরতেও পারিনি। মীরা গল্পচ্ছলে বললো।

—-ওমা সে কি! মরতে আবার ভয় কিসের? অবাক গলায় কিশোরী বললো,কিছু একটা শোনার কৌতুহল গলায়।

মীরা বুঝলো এটাই সুযোগ মেয়েটার সাথে গল্পে গল্পে রাত পার করে দিতে হবে।
মীরা বলতে লাগলো,,,

“আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। একদিন আমাদের স্কুলে একটা নতুন ছেলে ভর্তি হলো। নাইনে পড়া সেই ছেলেকে আমার অনেক ভালো লেগে গেলো। আমি ছেলেটাকে মনের কথা চিঠি লিখে জানালাম। সেও রাজি। ব্যাস শুরু হলো প্রেম। প্রতিদিন আমরা একটা করে চিঠি লিখি।পড়ালেখা আর ভালো লাগেনা। সারাদিন শান্তর কথা ভাবি।

—-তারপর,,,

খুব অল্প দিন প্রেম করার পরই আম্মার কাছে ধরা খাই। শান্তর একটা চিঠি আম্মার হাতে গিয়ে পরলো। আম্মা দিলো আমাকে কঠিন মাইর।

——আপনার মা আপনার গায়ে হাত তুলেছে? অবাক গলায় মেয়েটা জিজ্ঞেস করে,,

শুধু আম্মা নয় আব্বাও ইচ্ছামতো বকলো। তারপর আমাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একটা গার্লস স্কুলে ভর্তি করে দিলো। আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিনরাত কাঁদতে থাকি। একদিন আমার এক বান্ধবী খবর দিলো,শান্ত এখন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জয়ার সাথে রিলেশন করেছে। শুনে ঠিক করলাম সুইসাইড করবো। আর বেঁচে থেকে লাভ কি?

কৌতহল নিয়ে মেয়েটা বলে
—–তারপর,,,,

তারপর স্কুলে যাওয়ার পথে একটা ভ্যানগাড়ি থেকে দশ প্যাকেট ইঁদুর মারার ঔষধ কিনলাম। ভ্যানওয়ালা অবাক!
সে বললো
–ছুডু আফা অতলা অষুদ দিয়া আফনে কিতা করবাইন?
আমি বললাম,
—বাসায় অনেক ইঁদুরের উৎপাত। বই খাতা কেটে কুটিকুটি করে ফেলে তাই ইঁদুর মারবো।

—তারপর কি হলো?উত্তেজনায় মেয়েটা জিজ্ঞেস করে,,,

তারপর রাতে একটা গ্লাসে সবগুলো ঔষধ পানিতে মিশেয়ে একটা জুস বানালাম। জুসটা দেখেই আমার বমি চলে এলো। আর গন্ধটাও অনেক জঘন্য । এমন সময় শুনতে পেলাম আম্মা পাশের ঘর থেকে আব্বাকে বলছে

—- এই তুমি শোনে রাখো, যদি আমার কোন ছেলে কিংবা মেয়ে কোন কারনে আত্মহত্যা করে তাইলে হাসপাতালে নিবনা। মানুষে জানার আগেই আমি ওকে ফুটবলের মতো লাথি দিতে দিতে ড্রেনের নর্দমায় নিয়ে ফেলবো। যেন ড্রেনের নোংরা ক্রিমি আর পুকাগুলি ওর শরীরটাকে খেয়ে ফেলে।
আমি আম্মার কথা শুনে আঁতকে উঠলাম। আর দৃশ্যটাকে ভাবলাম একটু। ” আমি ইঁদুর মারার ঔষধ খেয়ে মৃতপ্রায় আর আম্মা আমাকে লাথি দিতে দিতে নোংরা ড্রেনে ফেল দিয়েছে আর বিভিন্ন সাইজের শুঁয়োপোকা আমার শরীরে হাটছে। ”
আমি ভয়ে গ্লাসের সকল ঔষধ বেসিনে ফেলে দিলাম। তারপর অন্যভাবে মরবো চিন্তা করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম। সারারাত স্বপ্নে আম্মার লাথি খেয়েছি। ভয় নিয়ে ঘুম ভাঙলো।

কিন্তু সকালে উঠে দেখি আম্মা ব্যাগ গুছাচ্ছে। জিজ্ঞেস করতেই বললো সবাই মিলে দাদু বাড়ী যাবে। আমার মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। কতদিন দাদুবাড়ী যাওয়া হয়নি। ভাবলাম সুইসাইড আপাতত স্টপ থাকুক।
আমি মনের আনন্দে ব্যাগ গুছালাম।তারপর সবাই মিলে চলে গেলাম দাদুবাড়ী। আমরা চার ভাইবোন। কিন্তু আম্মা সারাক্ষণ আমার কাছেই ছিলেন। আমরা ট্রেনে পিকনিকের মতো আনন্দ করতে করতে দাদুর বাড়ি গেলাম। দশদিন থাকার পর শান্ত নামক ছেলেটার কথা ভুলে গেলাম। বরং ওর কথা মনে হলে উল্টা বিরক্ত লাগতে লাগলো। মনে মনে নিজেকে গাধা বলে গালি দিলাম। আর ভাবলাম যখনই সুইসাইডের ইচ্ছে হবে আম্মার লাথির কথা ভাববো।”

—–হিহিহিহি মেয়েটা হাসতে লাগলো। আপনার মাতো দেখছি বিরাট রাগী।আমাদের স্কুলের ফারিয়া টিচারের মতো। হাসতে হাসতে মেয়েটা বলে।

মেয়েটার হাসি শুনে মীরার মন থেকে একটা বড় পাথর নেমে গেলো। বললো এতক্ষণ কথা বললাম তোমার নামটা কিন্তু জানা হলো না। কি নাম তোমার?
আমার নাম নুসাইবা।
বাহ্!অনেক সুন্দর নাম। নামের মাঝে একটা রাজকীয় ভাব।
আমিতো বাবার রাজকন্যাই। আমার বাবা বলেন আমি নাকি তার বড় রাজকন্যা।

আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাউম,,, নুসাইবার সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় রাত শেষ হয়ে এলো।
মীরা বললো,
—— নুসাইবা তাড়াতাড়ি যাও সকাল হয়ে এলো পরে মানুষ জেগে যাবে আর মরতে পারবে না।

—–না আন্টি, আজ আর মরতে ইচ্ছে করছে না। ভাবছি এখন থেকে মরতে ইচ্ছে হলে আপনার মায়ের ডায়লগটা মনে করবো। হিহিহি দৃশ্যটা ভাবলেই হাসি উঠে।
মীরা বললো,
—-যদি অন্য কোনদিন তোমার মরতে ইচ্ছে করে আমাকে একটা ফোন দিও। পরদিন পত্রিকায় নিউজটা দেখতে হবেনা? হাহাহা,,,

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন