দুই মেরুর দুই বাবা

ড.উম্মে বুশরা সুমনা

বন্ধুর বিয়েতে আজ ও বরিশাল যাবে,জানের দোস্ত এর বিয়ে বলে কথা,কতআয়োজন। সব বন্ধুরা একই রকম পাঞ্জাবি কিনেছে, গায়ে হলুদ,বিয়ে,বউভাতমিলে অফিস থেকে সাত দিনের ছুটি মঞ্জুর করে নিয়েছে। কিন্তু কয় দিন ধরেমুনিয়াটা তো শ্বাসকষ্টে ভুগছে, তবুও কি ও যাবে?

এর আগেওবাচ্চাটা অবশ্য অসুস্থ হয়েছিল। ওর কোনো খেয়ালই নেই। চাকরি, বন্ধু,আড্ডা,খেলা এসব নিয়েই ব্যস্ত,৯-৫ টা অফিস,তারপর হয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা,নয় তোখেলা দেখা,এক ছাদের নিচে দুইজনের বসবাস,তবুও যেন অনেক দূরে তাদের বাস।

এসবই ভাবছিল সাথী,হঠাৎ হেলালের ডাকে সে চমকে উঠল।

‘শুনছ,আমার ব্যাগ টা একটু গুছিয়ে রেখ, আজ রাতেই আমরা যাচ্ছি।’
‘মুনিয়াটার যে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তবুও তুমি যাবে?’
‘ও কিছু হবে না,খুব বেশি হলে হাসপাতালে নিয়ে যেও, এটিএম কার্ড রেখে যাচ্ছি।টাকা লাগলে খরচ করো।

হেলালের খুব তাড়াহুড়া, লঞ্চ ধরতে হবে, যাওয়ার সময় মেয়েটার কাছ থেকে বিদায়ও নেয়া হলো না।পূর্ণিমার রাত, অদ্ভুত সুন্দর চাঁদের আলো লঞ্চের ছাদে ছড়িয়েপড়েছে, লঞ্চে সব বন্ধু মিলে গল্প আর গানের আসর জমিয়ে ফেলেছে। ব্যাপকমজা চলছে, হেলালের ফোনটা অনবরত বেজেই চলছে। মোবাইলটা সাইলেন্টকরেরাখল, ফোন ধরলেই ঘ্যান ঘ্যান, একটুও এনজয়করতে দেয় না। বউ এর বাজারের লিস্ট,ঘ্যান ঘ্যানানি,বাচ্চার কান্না,চিৎকার এসব আর ভালো লাগেনা।বন্ধু,মাস্তি একসাথে ঘোর ফিরো,মজা করো,লাইফটা কত এনজয়াবল, বয়স তো মাত্র আটাশ,এখন নয় তো,কখন?

মুনিয়ার শ্বাস কষ্টবাড়ছে। হায়আল্লাহ,এত রাতে একা কোন হসপিটালে যাব, ওর বাবা তো ফোনওধরছে না। একটু পরামর্শ করতেও পারছি না, মুনিয়ার ফরসা মুখটা যেন কালোহয়ে উঠছে, কষ্টে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

‘এইতো মা,ভোর হলেই আমরাডাক্তার আঙ্কেলের কাছে যাব, তুমি ভালো হয়ে যাবে।দেখো, কী সুন্দর চাঁদেরআলো,দেখো, বারান্দায় যাবে?ওখানে সুন্দর বাতাস, তুমি চেয়ারে বসে গায়েআলো মাখবে।আমি গান গাইব আর তুমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবে। ঠিকআছে মা, সোনামনি আমার।’

সকালেই মুনিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো।এত বাতাস,তবুও মুনিয়া নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।অক্সিজেন মাস্কেও কাজ করছে না, ছোট্ট বুকটা উঠা নামা করছে।হে আল্লাহ্‌,তুমি ওর কষ্ট দূর করে দাও, আমি যেআর সহ্য করতে পারছি না।সকাল ১১ টায় মুনিয়ার সব কষ্ট দূর হলো,ছোট্ট একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুক্তি পেল।

দুপুর ৩টায় বাসা ভর্তি মানুষ,হেলালের সব বন্ধু,কলিগ,আত্মীয়,প্রতিবেশী আরও কতজন এসেছে। হেলালের চোখে পানি, বুকটা খাঁ খাঁ করছে,অপরাধ বোধও কাজ করছে। শুধু সাথী নির্বিকার, এক ভাবি ওকে কাঁদানোর চেষ্টা করছে। ওর শূন্য চোখদুটি কাকে যেন খুঁজছে। হঠাৎ একজন কে দেখে ও পাগলের মতো ছুটে গেল।একজন ময়লা সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত সাদা শশ্রু মন্ডিত বয়স্ক মানুষকে জড়িয়ে ধরে ও কাঁদছে।

লোকটা হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে ছোট্ট মেয়ের মতো সাথীকে আদর করছে,চোখমুছে দিচ্ছে,কপালে চুমু দিচ্ছে,ফিসফিস করে বলছে,তুই তো ভাগ্যবতী,তুইতো জান্নাতির মা,ধৈর্য ধর মা,আল্লাহ যে তোকে ভালোবেসে পরীক্ষাকরেছেন,সহ্য কর,উত্তম প্রতিদান পাবি, আর কাঁদিস না,মাআমার।

পাঁচ দিন পরের কথা। আজ সাথীর বাবা গ্রামে চলে যাবে।বের হবার সময় দেখে তার ব্যাগের পাশে আরেকটা ব্যাগ।

‘বাবা,আমিও যাব তোমার সাথে।’

হেলাল কী যেন বলতে যাচ্ছিল, সাথীর বাবা তাকে থামিয়ে বললেন, ‘বাবা হেলাল,আমি আমার মেয়েকে একাই বড় করেছি, ওর সব কষ্ট, দুঃখ আমি এইবুকটাতে ধারণ করেছি, চাকরি, বন্ধু, আত্মীয় সব কিছুর উপরে আমি ওকে প্রাধান্য দিয়েছি, কারণ ও আমার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত নেয়ামত, কখনো আমি ওকে অবহেলা, অযত্ন করি নি। আমার এই হাতটা ধরলে ও নির্ভরতার শক্তি পাবে, এই হাত ধরেই ও একদিন হাঁটতে শিখেছিল, আজ আবার এইকঠিন সময়ে ও এই হাত ধরেই উঠে দাঁড়াতে পারবে ইনশাআল্লাহ, কারণ আমি যে ওর বাবা।’

টিকাঃ বাবা সন্তানের ভরণ পোষণ করবেন। তার আর কোনো দায়িত্ব নাই এটাই আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষদের ধারণা।অথচ, পরিবারের সামগ্রিক দায়িত্ব প্রধানত বাবার,মা তার সহযোগী মাত্র। বাবা হচ্ছেন একটি পরিবারের অভিবাবক, পরিচালক ও দায়িত্বশীল।তিনি যদিযথাযথভাবে  তার দায়িত্ব পালন করতে না পারেন,তবে তাকে আল্লাহর কাছে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।এ প্রসঙ্গে রাসূলু্ল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, ‘পুরুষ তার স্ত্রী, পরিজন (সন্তান ও অধঃনস্ত) এর পরিচালক এবং এদায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে’ (বুখারী)

আল্লাহ্‌ পিতাকেতার পরিবার পরিজনের শুধুমাত্র ইহকালীন শান্তির পথই নয় বরং পরকালীন শান্তির পথও তৈরি করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন কর্তা অবশ্যই তার পরিবার-পরিজনকে ধর্মীয় শিক্ষা দিবে যাতে তারা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পায়।এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ সুবহানা তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর’ (সূরাঃ আত তাহরীমঃ৬)

এছাড়া সন্তানের পরিচয় দানের ক্ষেত্রেও নাম হবে পিতার, মাতার নয়।অনেক নারীবাদীরা দাবি করেন যে মা এত কষ্ট করে গর্ভধারণ, জন্মদান, দুগ্ধপান, সন্তান লালনপালন করেন অথচ বাবার নামে সন্তানের পরিচয় দেওয়া, মোটেই ঠিক নয়। কিন্তু যেহেতু সন্তানের ইহকালীন ও পরকালীন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাবাকে, সমস্ত দায়ভার বাবার। তাই পরিচয়ও হবে বাবার নামে, এটা খুব সাধারণ ক্যালকুলেশন।

যাদের কোনো পিতৃপরিচয় নাই তারাই মায়ের নামে পরিচিত হতে চায়। আমেরিকার৪৩% শিশুর পিতৃপরিচয় নাই। এটা ওদের জন্য, মুসলিমদের জন্য নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ সুবহানা তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহ্‌র কাছে ন্যায়সঙ্গত।যদি তোমরা তাদের পিতৃ পরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই এবংবন্ধু-বান্ধব হিসেবে গণ্য হবে।’(সূরা আল আহযাবঃ ৫)

মেয়ে সন্তানেরাও বাবার নামে পরিচিত হবে। বিয়ের পরও পিতৃপরিচয় থাকবে। মিসেস অমুককাফেরদের সৃষ্ট কালচার। আমাদের উপমহাদেশের অনেক মুসলিম নারী খৃষ্টানদের এই কালচার অনুসরণ করে থাকেন। বিয়ের পর নিজের নামের শেষে স্বামীর নাম বা পদবী ধারণ করে থাকেন। অথচ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর কন্যা। তিনি মহানবি মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নামের শেষে মুহাম্মদ নাম যোগ করেন নি। মুসলিমদেরপৃথিবীতেও বাবার পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে এবং বিচার দিবসেও বাবার পরিচয়ে ডাকাহবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন,‘কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ধরে এবং তোমাদের পিতার নাম ধরে ডাকা হবে।’ (সহি বুখারীঃ ৬১৭৭)

ইসলাম ধর্মে একজন পিতার দায়িত্ব অনেক। শুধু অর্থ উপার্জন আর সংসারের ব্যয় ভার বহন করাই তার প্রধান দায়িত্ব নয়, পরিবার পরিজনের ইহকালীন ওপরকালীন শান্তির পথ তৈরী করে দেওয়াই তার প্রধান দায়িত্ব।

লেখকঃ সাহিত্যিক এবং একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

 

আরও পড়ুন