প্রিয়াম ও তার হলুদ মেঘ

 

.
কখনো হলুদ মেঘ দেখেছো প্রিয়াম? প্রিয়াম আমার একমাত্র ছেলে। ওর মা’কে ঈশ্বর নিয়ে গ্যাছে, যখন প্রিয়াম জন্ম নিচ্ছে। যখন প্রিয়াম জন্ম নিচ্ছে- ঈশ্বর কী নিষ্ঠুর হয়ে গ্যালো! আমি প্রেমা মানে প্রিয়ামের মা’র সাথে ওর লেবার পেইন ওঠার পর থেকে, প্রিয়াম হওয়া অব্দি, ওর এই পৃথিবীকে বিদায় বলা অব্দি ছিলাম। ডাক্তারগুলো কী ভীষণ নির্বিকারভাবে ঈশ্বরের পরিকল্পনাটাকে পরিনতি দেবার জন্য মরিয়া হয়ে খেটে চলছিলো। আমি অনুমতি নিয়ে ওদের পাশে, শরীরে এপ্রোন জড়িয়ে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে সবকিছুর সাক্ষী হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রিয়ামের কান্না শোনার আগ পর্যন্ত ঈশ্বর প্রেমাকে নিতে পারেননি। ডাক্তার প্রিয়ামকে ওঁর পেট থেকে বের করলো, আমি দেখলাম। আর, হ্যাঁ, ঈশ্বরের পরিকল্পনা অনুযায়ী ওর সিজারিয়ান হয়েছিল। কেন আমি এতটা দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলে চলেছি যে, প্রেমার প্রস্থান ছিল ঈশ্বরের চূড়ান্ত পরিকল্পনাধীন- কারণ প্রেমা যে প্রিয়ামকে জন্ম দেবার ঠিক পরপরই আমাদের দু’জনকে ফেলে চলে যাবে, তা আমি জেনেছিলাম প্রিয়াম হবার ঠিক তিনদিন আগে তার মায়ের কাছ থেকে।

এবার প্রেমার প্রসঙ্গে আসি। প্রতিরাতে আমি ওকে একগ্লাস দুধ নিজহাতে খাওয়ানোর পর একসাথে ঘুমুতে যাই। সেদিনও তাই হলো। আমি ওকে দুধটুকু খাওয়াবার পর যেভাবে প্রতিদিন আদর করি, ঠিক সেইভাবে ওর সারামুখে হাত বুলিয়ে দিলাম। ও নরম গলা আর সামনে চেইনওয়ালা হালকা নীল রঙের নাইটির মধ্যে দিয়ে হাত দিলাম, ওর অদ্ভুত সুন্দর বুক দুটোই। ওর বুকদুটো আমার এত পছন্দের ছিল যে বিয়ের পর এমন কোনদিন যায়নি, যেদিন ওর বুকে আমি আদর দেয়নি। যেদিন মন্থন তো দূরের কথা, চুমুটা পর্যন্তও আমাকে খেতে দেয়নি, মাসান্তের অপবিত্রতার দোহাই দিয়ে, সেদিনও কিন্তু খুব যত্ন করে ওর নারীচূড়াদ্বয়ে আমাকে আদর দিতেই হবে। কি যে এক গভীর মমতা ছিল আমার তাঁর ও দু’টোর উপর, সে কথা সেও জানতো এবং সেও ভীষণ আগ্রহভরে আমার দৈবপ্রতিম স্পর্শের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতো। প্রথম প্রথম ও এটাকে যৌনস্পর্শজাত কামনা মনে করে, বেশ বাধা দিতো। কিন্তু একসময় ও বুঝতে পারে, আমার এই স্পর্শে কামনার চেয়ে ঢের বেশি ছিল সমর্পণ। আমার সমগ্র পুরুষাত্মার অনুভূতির তাঁর জন্মজাত মাতৃত্বের অহমবোধের প্রতি নিষ্কাম না হলেও এ ছিল এক নির্ভেজাল আত্মসমর্পণ। যে সমর্পণ তাঁকে মনে করিয়ে দিতো, সে আমার সন্তানের মা হিসেবে আজন্ম যে আমার অনাগত সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষুধার অর্ঘ্য বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, প্রবল এক যত্নে সামলে রেখেছে, এবং অন্য কারো কুদৃষ্টি যেন সে অন্নকে অশুচি করতে না পারে, তার জন্য নারী হিসেবে তাঁর প্রাপ্য সম্মানের প্রতি আমার পুরুষকারের সমর্পণ। এমনও হয়েছে না না ঝামেলায় বা অফিসের কাজের চাপে আমি তাতে স্পর্শ রাখতে ভুলে গেলেও, ঘুমুবার আগে সে নিজে থেকেই পরম আব্দারভরে সেই আরাধ্য সোহাগস্পর্শটুকু চেয়ে নিয়েছে। যেন এটা তাঁর দৈনন্দিন ভাত কাপড়ের মতোই একটা আটপৌরে দাবী, তাঁর স্বস্তিত্বের সতী-অধিকার।

তো সেদিন হলো কি! আমি ওকে ঘুম পাড়াবার আগেই ওর প্রাপ্য আদরের দৈনিকতাটুকুন মেটাতে যাবো, এমনটাই ভাবছি কেবল! আর ও নিমিষের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো। এবং ওর জানা আছে বা আমাদেরও এমন বলা আছে যে কোন কারণে দৈবাৎ যদি সে ঘুমিয়েও পড়ে, আমি যেন ওর প্রাপ্য আদরটুকু দিতে একমুহূর্তের জন্যও দ্বিধাগ্রস্ত না হই। তাই আমি ওকে ঘুমন্ত দেখেও আমি যেই না কেবল ওর দিকে হাতখান বাড়িয়েছি, আমার মনে হলো- ও নেই! মানে আমি সেই মুহূর্তটাকে ঠিক কিভাবে বোঝাবো বা ভাষায় প্রকাশ করবো জানিনে। আমার মনে হলো সে তো শুয়ে আছে, কিন্তু তাঁর এই শরীরের সেই চরমপ্রার্থীত নারীত্বের চূড়ামনিদ্বয়ে তাঁর আত্মাখানা নেই। যেন তাঁর আত্মা তাঁকে ফেলে চলে গ্যাছে। আমি ভীষণ হতভম্বের মতো একবার তাঁর দিকে আর পরক্ষণেই যেন সেই অধরা, অছোঁয়া আলীক সেই আত্মার খোঁজে এদিক ওদিক চাইতে লাগলাম। এবং যা দেখলাম।আর কি তা আমার ভাষায় প্রকাশ করা এককথায় অসম্ভব। তবুও এ ঘটনাটা লিখে রাখতে এবং উপযুক্ত সময়ে তা প্রিয়ামকে হস্তান্তরে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম বিধায় তা আমাকে লিখতেই হচ্ছে।

কী দেখলাম? দেখলাম শায়িত প্রেমার মাথার ঠিক ফুট খানেক উপরে প্রেমার ছোট ভার্শনের একখানা বায়বীয় অবয়ব! হালকা হলুদ দ্যুতির বিচ্ছুরণ হচ্ছে সেই অশরীরী অবয়ব থেকে। এবং সেটা যেন আমায় কিছু একটা বলবার জন্য প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আমি আমার ভয়, আমার খুব ভেতরের ত্রস্ততার সহজাত শিহরণ, অজানা কোন অতিমানবীয় স্বত্ত্বাকে নিজ অভিজ্ঞতা থেকে অনুভব করার উদ্বেলতা এড়িয়ে, শুধুমাত্র দায়িত্বের দিকে তাকিয়ে, আমার সমগ্র অতীন্দ্রিয় মনোযোগ একত্রিত করে, ফিরে চাইলাম তাঁর দিকে। এবং আমার সমগ্র অস্তিত্বকে মুহূর্তের মধ্যে জড় করে সে যা বলতে চায়, তা শোনার জন্য মানসিকভাবে নিজেকে ঠিক একইরকমভাবে সঁপে দিলাম যেভাবে তাঁকে আদর দেবার সময় আমি নিজেকে সঁপে দিতাম।

সে যা বললো আমি তাঁর মূল ম্যাসেজটা এখানে পরিষ্কারভাবে লিখতে চাইছি, কারণ সেটাই ছিল তাঁর ঐকান্তিক চাওয়া আর তাই অন্যান্য বাহুল্যগুলো বাদ দিলাম। প্রেমা বা তাঁর সেই আত্মা, সেটা যাই হোক যা আমাকে বললো তা হচ্ছে- তাঁর একটা ছেলে বাচ্চা হবে এবং যার হবার সাথেসাথে তাঁর মৃত্যু হবে। এবং এখনকার লিখে রাখা সমস্ত কথা আমি যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রিয়াম ছাড়া আর কাউকে না জানাই। দ্বিতীয় কথা হলো- ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তাঁর মামা তাঁর গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। যিনি সেই সময় তাঁকে মোলেস্ট করতেন এবং তাঁর বুকে খুব নোংরাভাবে হাত দিয়ে নির্যাতন করতেন। আপন মামার বিষয়ে কার কাছে কিভাবে অভিযোগ করবেন এ কথা ভাবতেন আর দাঁতে দাঁত চেপে অত্যাচার সইতেন। এবং এ ঘটনার ফল স্বরূপ সমগ্র পুরুষজাতির উপর তাঁর ঘৃণা চলে এসেছিল, বিশেষকরে যারা তাঁর ঐ বিশেষ অঙ্গের দিকে আলাদা ভাবে মনোযোগ দিতো। পরবর্তীতে সে কৌতূহল বশতঃ যখন তাঁর সেই গৃহশিক্ষকের এরকম নির্যাতন করার পেছনের কারণ জানার জন্য চেষ্টা করেন, উনি তাঁর মামারূপী গৃহশিক্ষক সম্বন্ধে জানতে পারেন যে, ছোটবেলায় সে লোক যেকোন কারণেই হোক তার মায়ের স্তন্যসেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। জীবনে কখনোই তার পক্ষে তার মায়ের দুগ্ধপানজনিত যে মায়ের কাছাকাছি আসা বা আদর-ভালবাসা পাওয়া, সেদিক থেকে চিরকালই ছিলেন হতভাগ্য। আর তার এই মাতৃস্নেহের চূড়ান্ত পর্যায়ের অবদমন তার মধ্যে নারী শরীরের বিশেষ অঙ্গ নিয়ে নেতিবাচক বিকৃতিতে প্রকাশিত হয়।

যাই হোক এ ঘটনার পর প্রেমার যখন আমার সাথে বিয়ে হয়, প্রাথমিক দিকে অতীতের নির্যাতনের বিভীষিকা তাঁর জীবনে পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে কি না এ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। বিশেষকরে আমার যখন তাঁর বিশেষ অঙ্গের প্রতি আলাদা টান লক্ষ্য করেন, তিনি ভয় পান। তবে ধৈর্য ধারণ করেন এবং কিছু সময় পরে লক্ষ্য করেন যে আমি তাঁর প্রতি যে সম্মান, সমর্পণ, শ্রদ্ধা আর ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে গ্যাছি এবং আপন বলে অনুভব করেছি, তাতে তাঁর পুরুষদের সম্পর্কে পুরানো সবধরনের নেতিবাচক অভিশপ্ত চিন্তা ইতিবাচক ভালবাসায় রূপ নেয়। এবার তাঁর শেষ কথা যা ছিল, যেহেতু তাঁর ছেলের জন্মের সাথেসাথেই উনি মৃত্যুবরণ করবেন। কাজেই সেও তার ছেলেকে স্তন্যসেবাদানের সেই দুর্লভ সুযোগ পাবেন না। উনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে মাতৃস্তনের অবদমনজাত নেতিবাচক কোন বিকৃতির কারণে তাঁর নিজের ছেলে যেন বিকারগ্রস্ততার শিকার না হয়। তাই আমার প্রতি প্রেমার অনুরোধ ছিল, আমি যখন মনে করবো আমাদের ছেলে প্রিয়াম এই কথা শোনা এবং ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মতো যথেষ্ট বড় হয়েছে, আমি যেন এই লেখাটা প্রিয়ামকে পড়তে দেই এবং এই বলি যে তার মা তাকে এটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে এবং অনুধাবন করতে বলেছেন।

এবার আমরা আমাদের গল্পের সেই শুরুতে ফিরে যাই। কখনো হলুদ মেঘ দেখেছো প্রিয়াম? এবার এই প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়াম যা বলেছিল তা শুনে আমার মনে হলো- আমার কাছে রাখা প্রিয়ামের মা’র সেই কাঙ্ক্ষিত লেখাগুলো তাকে পড়তে দেবার সময় এসেছে। আপনারা নিশ্চয় জানতে আগ্রহী যে প্রিয়াম কী এমন উত্তর দিয়েছিল যে আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে আর পিছুপা হই নাই। আমার প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়াম বলেছিলঃ পাপু, তুমি বোকা নাকি! মেঘের কি কোন রঙ থাকে! সূর্যের সাত রঙ একেকসময় একেকভাবে মেঘের উপরে পড়ায়, তার রঙ পাল্টায়। তবে পাপু, আমি খেয়াল করেছি, যখন আমার খুব মায়ের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয় মেঘগুলোর মধ্যে থেকে কিছু মেঘের রঙ অদ্ভুতভাবে হলুদ রঙের হয়ে যাচ্ছে। পাপু, কেন এমন হয় বলতে পারো?

প্রিয়ামকে আমি কি বলবো যে, তার মা’কে আমারও যখন খুব মনে পড়ে, তখন আমারও একই দশা হয়। কিন্তু সেকথা কি আর প্রিয়ামকে বলা যায়! যাই হোক আজ প্রিয়মকে তার মায়ের ইচ্ছের লেখা কথাগুলো পড়তে দেবো। আপনারা আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন যেন সে অবদমনের সমস্ত বিকারগ্রস্ততা সুস্থভাবে মোকাবিলা করার কৌশলগুলো রপ্ত করে একজন সুন্দর মনের মানুষ হতে পারে।।

.
#শিল্পবন্দী_শব্দাস্ত্র

লেখক-জুলিয়াস রাহা, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন