শেষ ফুলশয্যা

সুস্মিতা মিলিঃ

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হতেই আত্নীয় স্বজনের অনেকেই আস্তে আস্তে চলে গেলো।  রাজন আর সাথে থাকা কয়েকজন মিলে খাটিয়াটাকে কবরস্থানের ভেতরে একটা গাছের নিচে রাখলো। এই গাছটার নিচেই মমতাজ বেগমের কবর হবে। মমতাজ বেগমের একমাত্র ছেলে রাজন খাটিয়াটাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। যেভাবে ছোটবেলা মায়ের আঁচলটাকে ধরে রাখতো। তখন ভাবতো আঁচলটা ছেড়ে দিলেই বাবার মতো মা’ও হারিয়ে যাবে।

গাছ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পরছে কাফনে আবৃত লাশটার গায়ে। নতুন আরেকটা কবর খনন চলছে। আগে একটা কবর খানিকটা খু্ঁড়তেই ভেতরে পানি উঠে গেলো।বর্ষাকাল এমনতো হবেই। কিন্তু রাজন তার মাকে কিছুতেই পানিতে শেষ শয্যা নিতে দেবেনা।

রাজন ছোটবেলা একবার বর্ষায়ভরা বাড়ির পুকুরে পরে গিয়েছিলো, বিধবা মা তখন তার গহনা বিক্রি করে পুকুরপারে দেয়াল তুলে দিয়েছিলো।সেই রাজন কি পানিতে মায়ের চিরস্থায়ী শয্যা পাততে পারে?
মা’তো ছোট রাজনকে বর্ষা এলে ভয়ে বুক থেকেই নামাতো না। রাজন এই ভেজা কাদামাটিতে মাকে কিভাবে শোয়াবে? তাইতো একটু উঁচুতে কদমগাছটার নিচেই হবে মায়ের কবরটা।

রাজন অবাক হয়ে দেখে মায়ের তিনপায়ের কুকুর ডগিও বসে আছে নতুন কবরটার কাছে। তিনটে পা নিয়ে এতদূর কিভাবে এলো ডগি! মায়ের বড় আদরের কুকুর ছিলো ওটা। এক্সিডেন্টে এক পা হারানোর পর মমতাজ বেগম পরম যত্ন করে সন্তান স্নেহে কুকুরটাকে সারিয়ে তুলেছিলেন।
ডগি অভিমান নিয়ে তাকিয়ে আছে রাজনের দিকে যেন বলছে,
—-যাও আজ হতে তুমি মুক্ত। মায়ের জন্য আর তোমার বৌ এর সাথে ঝগড়া করতে হবেনা।

রাজন ছিলো তার মায়ের অক্সিজেন। ছেলেকে  কিছুক্ষণ না দেখলেই তিনি ছটফট শুরু করতেন,যেন ছেলেকে বেশিক্ষণ না দেখলে তার শ্বাসকষ্ট হয়। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে ছেলেকে অবলম্বন করেই বেঁচে ছিলেন তিনি। লেখাপড়া শিখে রাজনের ভালো চাকরি হলো কিন্তু মা আর ছেলে আলাদা হলো না। একসঙ্গেই রইল।

রাজন বুঝতে পারেনি নীলাকে বিয়ের পর থেকেই মায়ের অক্সিজেনের ঘাটতি শুরু হয়েছিলো। বাড়ীতে থাকলে নীলার নিপুন অভিনয়ে রাজন বুঝতেও পারেনি ওর অগোচরে মায়ের সাথে কি আচরণ করে।
পিতৃহীন রাজনকে একা মানুষ করায় মায়ের ছেলের প্রতি অধিকারবোধ একটু বেশিই ছিলো। একলা হাতে মানুষ করার কারনে তিনি ছেলের প্রতি অধিকার দেখাতেন।

অফিস থেকে ফিরলে নীলা যদি রাজনের জন্য পাস্তা বানাতো, মা বানাতো কোন সাধারণ পিঠা। রাজন কি খেতে ভালোবাসে এটাই ছিলো মায়ের ভাবনার বিষয়বস্তু। কিন্তু নীলার অধিকারে ওতো মা বাধা দেয়নি কখনো।
বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে মা আগেই রেডি হয়ে থাকতেন। বলতেন আমার রাজনকে অনেকক্ষণ  না দেখলে আমার দমবন্ধ লাগে।  অফিসে সারাদিন থাকে এটাই বেশি। বাকি সময় রাজন আমার চোখের সামনে থাকবে।
এটাই নীলা মানতে পারতো না।

কিন্তু  নীলাতো বিয়ের পর বলেছিলো আপনার ছেলে আপনাকে যেমন ভালোবাসে আমিও তেমন করেই আপনাকে ভালোবাসবো।আপনার কোন অযত্ন আমি হতে দেবোনা। রাজন সেদিন নীলার কথায় বেহেশত খুঁজে পেয়েছিলো। কিন্তু আস্তে আস্তে নীলা পাল্টে গেলো। একদিন নীলাও ছেলের মা হলো। সেও তার সন্তানকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। কিন্তু আরেকজন মায়ের ভালোবাসাটা বুঝতে চায়নি।

রাজনের সামনে মায়ের সাথে খুবই ভালো ব্যাবহার করতো। রাজন অফিসে গেলেই শুরু হতো কটু কথার খোঁচা।
কিন্তু মা কখনো অভিযোগ করেনি। তিনি নিজের মতই থাকতেন।
বরং কাজের মেয়েটা সইতে না পেরে একদিন সব বলে দিয়েছিলো । মাকে কথায় কথায় কটু কথা বলা যেন নীলার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো।

যখন সব বুঝল তখনওতো মায়ের জন্য কিছু করতে পারেনি রাজন। কিভাবে বা করবে? নীলাকে কিছু বলতে গেলেই মাকে ফেলে আলাদা বাসা নেয়ার জেদ ধরতো।  রাজন  চিৎকার চেঁচামেচি, ঝগড়া করেছে কোন লাভ হয়নি।

এদিকে চারিদিকে শুরু হলো করোনা ভাইরাস আতংক। মা হাই প্রেশারের রোগী, টিভিতে একেরপর এক দেখানো করোনায় মৃত্যুর দুঃসংবাদগুলো মাকে আরও অসুস্থ করে তুলে।  সারাক্ষণ শুধু একটাই টেনশন আমার ছেলে নাতি আর বৌমাকে যেন এই রোগে না ধরে।

এর মাঝেই করোনার আক্রান্তে হওয়ার ভয়ের অজুহাতে নীলা তার ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে। বললো,
—–যতদিন করোনার সমস্যা থাকবে আমি এখানে থাকবো না। এখাকার কোন মানুষ লকডাউন মানে না। আমার বাবার ফ্ল্যাট বাড়ীটাই এখন নিরাপদ।
রাজন যদি আমার সাথে না যায় তবে করোনায় সে মরে গেলেও আমি আসবো না।

রাজনের মা বুঝিয়ে নিরাপত্তার আশায় ছেলেকে বৌমার সাথে পাঠিয়ে দিলেন।
কিন্তু অক্সিজেন ছাড়া তিনি কি করে বাঁচবেন সেটাই ভাবলেন না।  রাজন যাওয়ার দুই ঘন্টা পরেই মায়ের হার্ট অ্যাটাক হলো।

ভাইজান কবর রেডি,,,
সবাই অবাক হয়ে দেখলো মমতাজ বেগমের কবরটা যেন অলৌকিক ভাবে কেউ কদম ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। দমকা হাওয়ায় শতশত ফুলেরা যেন তাদের সতেজ পাপড়ি বিসর্জন দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে মমতাজ বেগমের শেষ ফুলশয্যাটা ।
শেষবারের মতো মায়ের মুখটা দেখতে কাফনের কাপড়টা একটু সরালো রাজন। মায়ের মুখে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে।   চোখের সুরমা ধুয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে মা কাঁদছে। যেন বলছে,
— বাবারে তুই রাগ করিস না।তোরে ছাড়া আমি বাঁচতে পারিনা, তাইতো তোরে রেখেই আমি চলে গেলাম রে বাবা,,,

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন