মায়ের ঘ্রাণ

মায়ের ঘ্রাণ

ভূমিকা: আজ একটি অন্যরকম কুরবানীর গল্প বলবো। ঈদ উপলক্ষে সবাই আনন্দময় গল্প লিখেন, সেটাই স্বাভাবিক। আমার দেখা একটি বেদনাদায়ক গল্প আছে যা সবার সাথে শেয়ার করার তাড়না অনুভব করছি। সেটিও একধরনের কুরবানী; সম্ভবত, আক্ষরিক অর্থে আমার দেখা সবচেয়ে বড় কুরবানি। একটি পরিবারের সত্য ঘটনা অবলম্বনে। ঘটনাটি দেখেছি ১৯৮৮ সালে, যতদূর মনেপড়ে আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। খুবই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিলো সেবছর। এত ভয়াবহ বন্যা আমি আর দেখিনি, আমার চেয়ে বয়সে যারা অনেক বড় ছিলেন তারাও বলেছেন এত ভয়াবহ বন্যা আগে দেখেননি। আমাদের সব ফসলই বানের পানিতে ভেসে গিয়েছিলো। বিছানায় বসে শোবার ঘরে বড়শী দিয়ে মাছ ধরেছি। কিন্তু, আমি যে বিপর্যয় সেই পরিবারে দেখেছি বাকি সব দুর্যোগ আমার কাছে খুবই তুচ্ছ মনে হয়েছে।

লন্ডন প্রবাসী একটি পরিবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেশে বেড়াতে এসেছেন। স্বামী, স্ত্রী এবং তাদের একমাত্র ছেলে এই হচ্ছে তাদের পরিবার। মা/ বাবার কোনো ইচ্ছাই ছিলোনা দেশে যাবার। সবেধন নীলমণি একমাত্র ছেলের জেদের কাছে আত্মসমর্পণ করে ওনারা দেশে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ২১ বছর বয়সের ছেলে হুমকি দিয়েছে দেশে না গেলে সে একাই পালিয়ে দেশে চলে যাবে। এরপর দেশে না গিয়ে আর কোনো উপায় ছিলোনা আসলে। তাদের পুরো সাম্রাজ্যই হুমকির মুখে পরেছিল। যেদিন ওনারা ফেরত যাবেন সেদিন সকালবেলাই সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। তখন সিলেট থেকে কোনো ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ছিলোনা। আভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ঢাকা যাবেন, সেখান থেকে লন্ডনগামী ফ্লাইট ধরবেন। যদিও তাদের লন্ডনের ফ্লাইটটি ছিলো পরের দিন তবুও সিলেট শহর ছেড়ে যাবার জন্য ওনারা অস্থির হয়ে ছিলেন। কোনো অবস্থাতেই নিজ জন্মভূমির শহরে ওনারা মানসিকভাবে স্থির হতে পারছিলেন না। পেছনে বাঘ তাড়া করছে এমন একটি আতংকের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ওনারা বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। সারাক্ষণ স্বামী/ স্ত্রী দুজনে মিলে ছেলেকে আগলে রাখছেন। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের হাত ধরে বসে থাকতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না। এত কঠিন পাহারার মধ্যেও হঠাত করে তাদের ছেলেটি উদাও হয়ে গেলো। নাইতো নাই। পুরো বিমানবন্দর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছেলের কোন হদিস বের করতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে ফ্লাইট বাতিল করে বাসায় ফেরত যাবার জন্য রওয়ানা দিয়েছেন।

ওনারা আগে থেকেই জানতেন ছেলে কোথায় যেতে পারে? বিচলিত না হয়ে সরাসরি বড় বোনের বাড়িতে হাজির হলেন। ওখানে গিয়ে দেখেন ছেলে তার মানসিক ভারসাম্যহীন বড় খালাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।

ঘটনা পুরোপুরি বুঝার জন্য তাদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড একটু জানতে হবে। সিলেট শহরের স্থায়ী বাসিন্দা একটি পরিবারে ভাই/বোন পাঁচজন- এক ভাই, চার বোন। ভাই সবার বড় যিনি চারটি ছেলের বাবা কিন্তু, ওনার কোনো মেয়ে নেই।

দ্বিতীয় হচ্ছেন এক বোন যার বিয়ে হয়েছে শহরের কাছেই একটি গ্রামে। ওনার তিন ছেলে, এক মেয়ে।

পরবর্তী দুই বোনের বিয়ে হয়েছে শহরেই যাদের দুটি করে মেয়ে আছে কিন্তু, কোনো ছেলে নেই।

সবার ছোটো এই লন্ডন প্রবাসী বোন যার তখন পর্যন্ত কোনো সন্তান ছিলোনা।

ওনাদের প্রত্যেকটি বোন ছিলেন অপরুপ সুন্দরী, যেমন গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো তেমন দীঘল কালো চুল, যথেষ্ট লম্বা এবং খুবই মায়াময় চেহারার অধিকারী ছিলেন সবাই। সৃষ্টিকর্তা কোনো এক বিচিত্র কারণে তাদেরকে যে পরিমাণ সৌন্দর্য্য দিয়েছেন মেধা দিয়েছেন তার বিপরীত অনুপাতে। ফলে শহরের প্রাণকেন্দ্রে থেকেও কোনো বোনই হাইস্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি। বিয়ে হয়েছে খুবই অল্পবয়সে। চার বোনের মধ্যে একমাত্র বড় বোনই তিন তিনটি ছেলের মা। আর কারো কোনো ছেলে সন্তান নেই। ছোটবোনেরতো কোনো সন্তানই নেই। বিলাতের উন্নত চিকিৎসা নেবার পরও তাদের কোনো সন্তান হয়নি। দেশে গিয়ে, পীর, ফকির, কবিরাজ, টোটকা কিছুই বাদ দেননি। কিছুতেই কোনো ফল আসেনি। সব থাকার পরও একটি সন্তানের অভাবে তাদের পরিবারে সবসময় অমাবস্যার অন্ধকার। স্বামী / স্ত্রী দুজনের হৃদয়ে সারাক্ষণ হাহাকার লেগেই আছে। দান খয়রাত, দোয়া দরুদ কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা।

বড় বোনের শেষ সন্তান হয়েছে কয়েক মাস আগে- ফুটফুটে রাজপুত্র। ওনার প্রতিটি ছেলেমেয়েই অসম্ভব রকমের সুন্দর।

লন্ডন প্রবাসী ছোটবোন দেশে এসেছেন বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়ে। স্বামী/ স্ত্রী দুজনে মিলে সকাল বিকাল বড় বোনের বাড়িতে আনাগোনা করেন কিন্তু, কিছু বলার সাহস করতে পারেননা। তাদের এই সন্দিহান হাবভাব দেখে বড় বোন জানতে চাইলেন সমস্যা কী?

নিঃসন্তান দম্পতি বড় বোনের পা জড়িয়ে ধরে বসে গেলেন। এমন এক আবদার করলেন যার ব্যাখ্যা দেয়া অসম্ভব। ওনারা বড় বোনের কাছে ছোটো ছেলেকে ভিক্ষা চাইলেন। ওনাদের চিন্তাভাবনা হচ্ছে ছেলে একেবারেই ছোটো। এখন যদি এই ছেলেকে নিয়ে ওনারা লন্ডনে চলে যান তাহলে তার মায়ের কোনো স্মৃতি থাকবেনা। উনাদেরকেই তার মা/বাবা হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে।

আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি তখনই ঘটল। বোনের প্রতি ভালোবাসার কাছে মাতৃস্নেহ আত্মসমর্পণ করলো। তিনি তার কলিজার টুকরাকে বোনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন এই মুহুর্তে এখান থেকে চলে যা। কাগজপত্রে পরে দস্তখত নিয়ে যাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফরমালিটিজ শেষ করে এক বোনের হৃদয় পুড়িয়ে আরেক বোনের হৃদয় তৃপ্ত করে উড়াল দিলেন বিলেতে। ছেলের বয়স তখন আনুমানিক এক বছর।

কিছু দিন পরেই বড় বোন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। একেবারে হযবরল হয়ে গেল সব। কাপড়চোপড় ঠিক থাকেনা, খাওয়া দাওয়া নেই, নিজের সন্তানদেরকে চিনেননা। সারাক্ষণ বলেন, “আমার পেটের ভিতরে আরেকটি বাচ্চা আছে, ওটি বের করে দাও।”
চিৎকার, চেঁচামেচি করে কান্নাকাটি করেন। নিজেই ছুরি নিয়ে পেট কেটে বাচ্চা বের করার জন্য উদ্যত হোন। কোনো চিকিৎসাই তেমন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত চেইন দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো। ওনার বুকফাটা আর্তনাদ, কান্নাকাটি দেখে আশেপাশের মানুষরাও কেঁদে বুক ভাসাতেন।

ওদিকে প্রবাসী দম্পতি দেশের সাথে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। কারো সাথে কোনো যোগাযোগ করেননা। তাদের ভয়ের কারণ হলো দেশে যোগাযোগ করলে যদি কোনভাবে ছেলে জেনে যায় তার আসল মায়ের কথা। ওনারা আর কখনও দেশেই আসেননি।

ছেলের বয়স যখন বিশ বছর, ছেলে একদিন স্বপ্নে দেখলো একজন মায়াবী নারী তাকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছেন। সেই নারী বাংলাদেশের একটি গ্রামে থাকেন, বাড়ির সামনে পুকুর, পুকুরের পারে সারি সারি সুপারি গাছ। সেই নারী তাকে বলছেন বাবা আমাকে বাঁচা, ওরা আমাকে পাগল বানিয়ে মেরে ফেলবে। তুই ছাড়া আর কেউ আমাকে ভালোবাসেনা। এই একই স্বপ্ন ছেলে প্রতিদিন দেখে। বাংলাদেশে আসার জন্য পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু, মা/বাবা নানা অজুহাত দেখান, ওনারা দেশে আসবেননা।

ছেলে প্রশ্ন করে –
আশেপাশের সবাই তাদের পরিবার নিয়ে প্রতিবছর দেশে যায়। তোমরা গত বিশ বছরে আমাকে একবারও দেশে নিয়ে যাওনি কেন? আমাকে, আমার জন্মভূমির সাথে পরিচয় করিয়ে দাওনি কেন? এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন আমি কেন দেখি? এই মহিলাই বা কে? আমি দেশে যাবোই যাবো, যেভাবেই পারি।

শেষ পর্যন্ত আতংকিত হয়ে উনারা ছেলেকে নিয়ে দেশে আসলেন। এত বছর পর দেশে এসেছেন। সব বোনরা ছুটে এসেছেন বোনের সাথে দেখা করার জন্য। পাগল বোনও এসেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে ছেলে শুধু বড় খালার পেছনে ঘুরঘুর করে। কারণে অকারণে বড় খালাকে জড়িয়ে ধরে। বড় খালার শরীর ঘ্রাণ নিয়ে বলে এই ঘ্রাণ আমি স্বপ্নে পেতাম। তুমিই আমাকে স্বপ্নে মুখে তুলে ভাত খাওয়াতে। বড় খালা, আমি আর কারো সাথে কথা বলবোনা। শুধু তোমার সাথে কথা বলার জন্যই আমি দেশে এসেছি। তোমার কীসের কষ্ট আমাকে বলো? কে তোমাকে পাগল বলে আমাকে দেখিয়ে দাও? এহেন আবেগ জড়িত নানাবিধ কথা দিয়ে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। বড় খালাও সারাক্ষণ ওর সাথে আনন্দে থাকেন। কোনো চিৎকার, চেঁচামেচি কিছুই নেই। অনবরত ওর চোখেমুখে আদর করছেন, চুমো খাচ্ছেন, খিলখিল করে হাসছেন, দুনিয়ার গল্প করছেন কিন্তু, ভুলে গেছেন এটি যে ওনার ছেলে। কখনোই তাকে নিজের ছেলে হিসেবে দাবি করছেননা আবার ছেলের পিছুও ছাড়ছেন না।

বড় খালার সাথে ছেলের এত মাখামাখি দেখে ওর মা/বাবা ভয় পেয়ে গেছেন। কখনযে সিক্রেট আউট হয়ে যায় সেই আতংক থেকেই তাড়াহুড়া করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা। কিন্তু, বিধি বাম। ছেলে বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে গিয়ে সেই বড় খালাকে জড়িয়ে ধরেই বসে আছে।

এক হতভাগ্য মা তার সন্তানের কথা স্মরণ করতে পেরেছিল কি না সেই রহস্য অমিমাংশিত রেখেই পরদিন সকালে হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আরেক হতভাগ্য সন্তান তার মায়ের লাশ ধরে বারবার বলছে, “বড় খালা আমি স্বপ্নে তোমার শরীরের ঘ্রাণ পাই, তোমাকে আমার এত মায়া লাগে কেন? তুমি চলে গেলে, আমাকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াবে কে?

লেখক- মনসুর আলম, কবি,সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন