প্রেমানুরাগ

প্রেমানুরাগ
রাবেয়া সুলতানা মুনা

বারান্দার গ্রিল ধরে বিকালের কোমল রোদের দিকে তাকিয়ে পুরোনো স্মৃতি আজ খুব মনে পড়ছে,কখন যে দু’চোখে প্লাবন নেমে এসেছে বুঝতে পারিনি।
আমি হামিদ, শিলাকে ভীষণ ভালোবাসতাম, ওর সাথে পরিচয় হয় মোবাইলে। সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে কল দিতে গিয়ে ওর কাছে চলে যায়, ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম একটা মেয়ের কণ্ঠ- হ্যালো ! কোথায় যেতে হবে? বাসায় নাকি প্রাইভেট কোন হোটেল? আমি শুনছি আর অবাক হচ্ছি মেয়েটি কি বলছে এসব! অপর প্রান্ত থেকে আবার বললো- হ্যালো, হ্যালো, আমি বললাম আপনি কে?
-আমি শিলা, আপনি কে? আর আমাকে কি করতে হবে বলছেন না কেন?
আমি কোন রকম রং নাম্বার বলে লাইনটা কেটে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বেশ কিছু দিন পর আবার মোবাইলে কল আসলো। আমি রিসিভ করতেই বললো – আমাকে চিনতে পেরেছেন?
-না, কে আপনি? আমি শিলা।
আমার তখনি মনে পড়লো সেই দিনের কথা । ও আচ্ছা, জী বলেন ।
মোবাইলে রং নাম্বারে কত কল আসে নিয়মিত, মেয়ে মানুষের কণ্ঠ শুনলেই জ্বালায়,আর আপনি কিনা সেদিন থেকেই চুপ আছেন। কে বলেন তো আপনি! আমার কণ্ঠ কি অনেক বাজে?
-না তা হবে কেন? আপনার কণ্ঠ তো অনেক সুন্দর। আমি আসলে সেদিন আমার এক বন্ধুকে কল দিতে গিয়ে ভুলে আপনার নাম্বারে দিয়ে ফেলি, দুঃখিত ক্ষমা করে দিবেন।
– আচ্ছা আর ক্ষমা চাইতে হবে না। আপনি এতো ভালো কেন? এই প্রশ্নে আমি কিছুই বলতে পারিনি সেদিন। কেমন জানি মেয়েটার প্রতি দুর্বল হয়ে গেলাম। ফোনে কথোপকথন চলতে লাগলো, একদিন শিলাকে বললাম- আপনাকে কিছু প্রশ্ন করলে উওর দিবেন?
-হুমম।
এই পেশায় কত দিন আছেন?
-বেশ কিছুদিন।
আপনি এই ধরনের কাজ করেন কেন?
-পেট চালানোর জন্য।
আরো তো অনেক কাজ আছে,এই কাজ বেছে নিলেন কেন?
-কে দিবে কাজ? আমি যে পিতৃ পরিচয়হীন। ভালো সমাজের কোন এক রাতের পাপের ফসল আমি ।
ওর কথা শুনে আমি একদম হতভম্ব হয়ে গেলাম, বুকের ভিতরে কেমন জানি হাহাকার অনুভব করলাম। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- আপনার সংসার করতে ইচ্ছে করে না?
-এক সময় করতো। এখন করে না। কারণ আমার এই নষ্ট জীবনের সাথে অন্য কোন ভালো মানুষকে জড়াতে চাই না। এবার আমি হঠাৎ করে বললাম আমি যদি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, করবেন? ও কিছুক্ষন হাসলো। এ ব্যাপারে আর কথা বলতে চাইলো না। ধীরে ধীরে শিলা আমার মনের অনেকখানি জায়গা দখল করে নেয়, জানি না কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। শিলার সাথে দেখা করলাম, ওকে অনুভব করলাম এবং আরও বেশি জানতে শুরু করলাম। আর ভাবতে থাকলাম শিলাকে এই রাস্তা থেকে আমার কাছে যে করেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে।
হঠাৎ একদিন শিলার কোন খোঁজ পাচ্ছিলাম না, ফোন রিসিভ করছিলো না, আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম, ওর ঠিকানাও জানতাম না,কি করি বুঝতে পারছিলাম না, এভাবেই কেটে গেলো নয় দিন । হঠাৎ আবার আসলো প্রতিক্ষিত কল, মরুর বুকে পানি প্রাপ্তির মত প্রশান্তিতে রিসিভ করতেই চমকে উঠলাম, একি !কণ্ঠটা তো শিলার মনে হচ্ছে না! একটা মেয়ে কান্না কান্না কণ্ঠে বলতে লাগলো -ভাইয়া শিলা আর নেই, আমি প্রথমে বুজতে পারছিলাম না কি বলতে চাইছে। জিজ্ঞেসা করলাম আপনি কে? শিলাকে দিন প্লিজ ।
-আমি শিলার বান্ধবী। শিলা আর পৃথিবীতে নেই! আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো । সেই মেয়েটি আরও বলতে লাগলো- রোড এক্সিডেন্ট হয়েছিল,নয় দিন ধরে হাসপাতালে ছিলো কিন্তু দু’দিন আগে তার অবস্থা খারাপ এর হতে থাকে ,গতকাল বিকালের দিকে মারা যায়। আমি ফোন কেটে দিয়ে বসে পড়লাম, ভাবতেই পারিনি এমন দু:সংবাদ অপেক্ষা করছে ।

ঘরকুনো হয়ে পড়ে আছি, কোথাও যেতে ইচ্ছা কর না, মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আমি ভীষণ একা, বন্ধুদের এড়িয়ে যেতে থাকি, তবুও মারুফ ওদের সাথে আড্ডা দেওয়ার জন্য বার বার তাগাদা দিতে লাগলো, অনেকটা বাধ্য হয়ে সপ্তাহ দুয়েক পর বের হলাম রমনার উদ্দেশ্যে,ভাবলাম একা থাকলে আমি সাইকো হয়ে যাব, ও যখন এত করে বলছে একটু দেখা করে আসি ।
বন্ধুরা আমার মন ভালো করার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমার ভাবনায় যে কেবলই শিলা, কোন ভাবেই ওর হাসিমাখা মুখ মন থেকে সরাতে পারছিলাম না, এদিক ওদিক তাকিয়ে ভাবছিলাম-কেন মেয়েটা অসময়ে চলে গেল, এত তাড়া ছিলো কিসের । হঠাৎ চমকে উঠি, খেয়াল করলাম আমাদের আড্ডার স্থান থেকে কিছু দুরে একটা কাপল বসে আছে, মেয়েটাকে শিলার মতই মনে হচ্ছে, আবার ভাবলাম এ হয়তো মনের ভুল, আরেকটু কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করলাম। এমন পরিস্হিতির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না, এ কি করে সম্ভব! মেয়েটি শিলা । আমার মোবাইল থেকে শিলাকে কল দিলাম, শিলা তার মোবাইলটা বের করে হাতে নিলো, কিছুক্ষণ পরে সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো, আমি দাঁড়িয়ে ওকে দেখতেই থাকলাম, যেমনটা প্রাণহীন লাশকে মানুষ শেষ বারের জন্য দেখে ।

লেখিকা : রাবেয়া সুলতানা মুনা

আরও পড়ুন