দায়মুক্তি

আমিনুল ইসলাম

আব্দুর রহমান একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। সে তার ডেস্কে বসে কম্পিউটারে একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করছিল, ঠিক তখন তার বস এসে রুমে ঢুকে বললেন, ‘আব্দুর রহমান সাহেব?’
‘জি, স্যার?’
‘আপনার রক্তের গ্রুপ যেন কি?’
‘ও-নেগেটিভ।’
‘গ্রেট। আমার খালার জরুরি ভিত্তিতে ও-নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন। ডাক্তার তাড়াতাড়ি লাগবে বলেছেন, নাহয় খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে। আপনি কি রক্ত দিতে পারবেন?’
‘জি, স্যার, দিতে পারবো। কখন লাগবে?’
‘আপনি প্রজেক্ট প্রোফাইলটা রেডি করে এ্যাপোলো হাসপাতালে চলে আসবেন। আমি এখন হাসপাতালে যাচ্ছি।’
‘জি, স্যার, আমি কাজ শেষে চলে আসবো।’

আব্দুর রহমানের কাজ শেষ করে সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস থেকে বের হলো। বস পাঁচটায় বের হয়েছিল। তিনি চাইলে আব্দুর রহমানকে তার গাড়িতে নিতে পারতেন। প্রজেক্ট প্রোফাইলের কাজ যেটুকু বাকি ছিল তা আগামীকাল সকালবেলায় প্রথম ঘন্টায় শেষ করা যেতো। আমাদের দেশের অফিসের বস’রা সাধারণত তার অধীনস্থদের নিয়ে নিজের গাড়িতে চড়তে পছন্দ করেন না, তাই হয়তো তাকে নিলেন না।
আব্দুর রহমান অফিস থেকে বের হয়ে একটি লোকাল বাসে উঠলো। সে সিট পায়নি বলে দাঁড়িয়ে আছে। এই সন্ধ্যাবেলায় লোকাল বাসে বসার সিট পাওয়া তো দুরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা পাওয়াও কঠিন। তার মোবাইল বেজে উঠলো। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে বসের ফোন। মানুষের ভিড়ে সে ফোন রিসিভ করতে পারছে না, কোন রকমে ফোন রিসিভ করে বললো, ‘আসসালামু আলাইকুম, স্যার।’
‘কি হলো আব্দুর রহমান সাহেব, এতো দেরি হচ্ছে কেন?’
‘স্যার, আমি আসছি। এখন বাসে আছি।’
‘তাড়াতাড়ি আসুন। খালার অবস্থা ভালো না।’
‘জি, স্যার।’
আব্দুর রহমান ভাবছে, এতোই যদি তাড়া থাকে তবে আমাকে সঙ্গে নিয়ে এলেই হতো। বসের আচরনে মনে হয় আব্দুর রহমান তার চাকর। রক্ত দিতে যেন সে বাধ্য। আব্দুর রহমানের ইচ্ছা হচ্ছিলো রক্ত না দিয়ে বাসায় ফিরে যেতে, কিন্তু একজন মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন বলে কথা, তাই এমনটি করছে না। বস তাকে প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর ফোন দিচ্ছে। আব্দুর রহমান প্রায় চলে এসেছে এমন সময় তার বস ফোন দিয়ে বললেন, ‘আব্দুর রহমান সাহেব, এতো সময় তো লাগার কথা নয়। আমি এই রাস্তায় সবসময় আসা-যাওয়া করি।’
‘স্যার, আর বেশি সময় লাগবে না। কাছাকাছি চলে এসেছি। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম, তাই দেরি হচ্ছে।’
আব্দুর রহমান প্রতিদিন লোকাল বাসে চড়ে অফিসে আসা-যাওয়া করে। আর তার বস টয়োটা এলিয়েন মডেলের নতুন গাড়িতে চলাফেরা করেন। তার গাড়িতে এসি আছে। আরামদায়ক সিট। তিনি গাড়িতে গান শুনতে পারেন। যারা এমন আরামধায়ক গাড়িতে চলাফেরা করে তাদের কাছে রাস্তার জ্যাম কোন সমস্যা নয়। তাদের উপলব্ধি আব্দুর রহমানদের মতো হবে না যারা লোকাল বাসের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থেকে চলাফেরা করে। হ্যান্ডেল শক্ত করে না ধরলে গাড়ি ব্রেক করলে হয়তো হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে। গাড়িতে উঠেই তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন একটি সিট খালি হবে। সিট খালি হলে শুরু হয় প্রতিযোগিতা, কার আগে কে বসবে। এই সময় পকেট সাবধান রাখতে হয়। একটু অমনোযোগী হলেই পকেট ফাঁকা হয়ে যেতে পারে। কিছুদিন আগে লোকাল বাস থেকে আব্দুর রহমানের মোবাইল চুরি হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো চোরকে সে দেখেও ধরতে পারেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো লোকাল বাসে যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা করে। এর ফলে আধঘন্টার রাস্তা একঘন্টায় যেতে হয়। বস’রা এসব বুঝবেন না। তারা তাদের মতো করে হিসাব করেন।
সন্ধ্যাবেলায় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম বেশি থাকে। ঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছানো কঠিন। রাস্তায় গাড়ির যে গতি থাকে তার চেয়ে মানুষের হাঁটার গতি বেশি৷ আব্দুর রহমান একটি সিট খালি পেয়ে বসে দুই বছর আগের কথা ভাবছে। তখন আব্দুর রহমান অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করতো। তার এক সিনিয়র কলিগের নাম জামসেদ। তার সাথে আব্দুর রহমানের খুব সখ্যতা ছিল৷ তিনি একদিন হন্তদন্ত হয়ে আব্দুর রমানের কাছে এসে বললো, ‘আপনার রক্ত ও-নেগেটিভ তাই না?’
‘জি।’
‘আমার চাচা স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এক ব্যাগ রক্তের দরকার।’
‘জামসেদ ভাই, আমি গত মাসে একজনকে রক্ত দিয়েছি। তিন মাসের আগে রক্ত দিতে পারবো না।’
‘তাহলে তো কিছু করার নেই। অন্য কোথাও থেকে ম্যানেজ করতে হবে, কিন্তু নেগেটিভ রক্ত পাওয়া খুব কঠিন।’
আব্দুর রহমান চার মাস আগে রক্ত দিয়েছে। এখন রক্ত দিতে কোন সমস্যা নেই। সে জামশেদ সাহেবকে মিথ্যা বলেছে, কারণ আজ তার বিবাহবার্ষিকী। বাসায় অনেক বড় আয়োজন হয়েছে, অনেক মেহমান এসেছে৷ আজ রক্তদান করলে শরীর দূর্বল হয়ে যাবে। তাছাড়া অফিস থেকে তাকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে।
পরের দিন সকাল নয়টায় আব্দুর রহমান অফিসে ঢুকলো। জামসেদ সাহেব মুড অফ করে আছেন। তিনি গালে হাত দিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। ডানে-বামে তাকাচ্ছেন না। একদৃষ্টিতে টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছেন। আব্দুর রহমান ভাবছে, হয়তো তার উপর রাগ করেছেন। সে জামসেদ সাহেবের রুমে ঢুকে বললো, ‘ভাই, আপনার কি হয়েছে?’ জামসেদ সাহেব কোন উত্তর দিলেন না।
আব্দুর রহমান এবার বললো, ‘আপনার কি মন খারাপ?’
‘হুঁম।’
‘কী হয়েছে খুলে বলুন?’
এবার তিনি চোখ তুলে আব্দুর রহমানের দিকে তাকালেন।
আব্দুর রহমান বললো, ‘ভাই কি আমার উপর রাগ করেছেন?’
‘আপনার উপর রাগ করবো কেন?’
‘তাহলে?’
‘গতকাল রাতে আমার চাচা মারা গেছেন। ও-নেগেটিভ রক্ত পেতে দেরি হয়েছে বলে তাকে বাঁচানো যায় নি। রাত তিন টায় নরসিংদী থেকে আমাদের এক আত্নীয় রক্ত দিতে এসেছিল, কিন্তু তার আগেই আমার চাচা মারা গেলেন।’
জামসেদ সাহেবের কথা শুনে আব্দুর রহমানের মন খারাপ হলো। সে ভাবছে, কতো বিবাহবার্ষিকী আসবে-যাবে, কিন্তু একটি প্রাণ তো আর ফিরে আসবে না। আমার মিথ্যা বলা উচিত হয় নি। রক্তদান করলে একটি প্রাণ হয়তো বেঁচে যেতো। আব্দুর রহমানের ভিতরে একটি অপরাধবোধ তৈরি হয়েছে। সে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়লো। কয়েকদিন পর সে চাকরিটি ছেড়ে দিলো। তারপর একমাস বেকার থেকে এই কোম্পানিতে জয়েন করে।

আব্দুর রহমানের একমাত্র মেয়ের নাম মুক্তা, আজ তার বার্থডে৷ সে ভাবছে মেয়ের বার্থডে পালনের ছেড়ে একটি জীবনের মূল্য অনেক বেশি৷ আগের অফিসের একটি ভুল আজো তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। একই ভুল বারবার করা ঠিক হবে না৷ বিষয়টি সে তার স্ত্রী মিনুকে ফোনে জানিয়েছে। তার স্ত্রী মিনুও রক্তদানে সম্মতি দিয়েছে৷ মিনু আগের ঘটনা জানে বলেই অনুমতি দিয়েছে।
আব্দুর রহমান সন্ধ্যা সাতটায় এপোলো হাসপাতালের সামনে চলে এলো। হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে দেখে মানিব্যাগটি নেই। নিশ্চয় লোকাল বাসে পকেটমার নিয়ে গেছে। আব্দুর রহমান এখন এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। সবার আগে একজন মানুষকে বাঁচানো দরকার।
আব্দুর রহমানের বস কয়েকজনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আব্দুর রহমানকে দেখেই বলে উঠলেন, ‘এই যে আমার অধীনস্থ আব্দুর রহমান চলে এসেছে। বলেছিলাম না চলে আসবে, আমার কথার অবাধ্য হওয়ার দুঃসাহস দেখাবে না।’
আব্দুর রহমান তার বসকে সালাম দিলো।
ডাক্তার সাহেব আব্দুর রহমানকে নিয়ে ল্যাবে ঢুকলেন৷ তিনি নার্সকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি উনার রক্ত ক্রসমেস করুন। রোগীর অবস্থা ভাল না।’
‘জি, স্যার৷’
নার্স আব্দুর রহমান থেকে রক্তের স্যাম্পল নিয়ে বললো, ‘আপনি পনের-বিশ মিনিট অপেক্ষা করুন। আমি রিপোর্ট নিয়ে আসছি।’
কিছুক্ষণ পর নার্স এসে বললো, ‘ক্রসমেস হয়ে গেছে। কোন সমস্যা নাই৷’
‘জি।’
‘আপনি ডান হাত সোজা করে বেডে শুয়ে পড়ুন।’
‘জি, করছি৷’
নার্স আব্দুর রহমানের হাতে সুই ঢুকিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, ‘আপনার নাম কি ভাইয়া?’
‘জি, আব্দুর রহমান।’
‘আপনাকে খুব দূর্বল লাগছে কেন?’
‘জি, সারাদিন অফিস করে এখানে এলাম। তাছাড়া রাস্তায় বিশাল যানজট অতিক্রম করতে হয়েছে, দূর্বল তো লাগবেই৷’
‘রোগী আপনার কে হয়?’
‘আমার কেউ না, তবে বসের খালা হয়৷’
‘ও, আচ্ছা।’
কথা বলতে বলতে নার্স আব্দুর রহমানের হাতে একটি ইলাস্টিক বল দিয়ে বললো, ‘আগে কখনো রক্ত দিয়েছেন?’
‘হুঁম।’
‘আপনি বিবাহিত?’
‘হুঁম।’
‘ছেলে-মেয়ে আছে?’
‘হুঁম।’
‘আপনার সাথে কথা বলে মজা নাই, শুধু হুঁম হুঁম করছেন।’
‘আপু, কথা বলতে ভালো লাগছে না। রক্ত দিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে৷’
‘তাড়াতাড়ি কেন?’
‘আজ আমার মেয়ের বার্থডে৷’
‘তাহলে রক্ত দিতে এলেন কেন? উনারা বড়লোক মানুষ রক্ত যে কোনভাবে ম্যানেজ করতে পারতেন। আপনার রক্তের দরকার হলে উনারা কি রক্ত দিতে আসবেন?’
‘আপু, এতোকিছু হিসাব করিনি। তবে আপনি সঠিক বলেছেন।’
‘আর কয়েক মিনিট লাগবে। তারপর আপনি সোজা বাসায় চলে যাবেন৷ তবে মেয়ের জন্য একটি লাল জামা নিয়ে যাবেন।’
‘লাল জামা কেন?’
‘মেয়ে বাচ্চাদের লাল জামা ভালো লাগে। আমার একটি মেয়ে ছিল।’
‘ছিল মানে?’
‘আমার স্বামী তাকে নিয়ে ইংল্যান্ড চলে গেছে।’
‘আপনি গেলেন না কেন?’
‘আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে।’
‘ও, আচ্ছা।’
নার্সের কথা শুনে আব্দুর রহমানের মন খারাপ হয়ে গেলো। একজন মা সন্তান ছাড়া থাকা খুব কঠিন।
নার্স বলে উঠলো, ‘ভাইয়া, এক ব্যাগ রক্ত নেয়া হয়েছে।’
‘আপু, আপনি খুব ভাল মানুষ৷’
‘ভাইয়া, আপনি আমার উপর রাগ করবেন না। আমি আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি। আপনাকে আমার আপন ভাইয়ের মতো মনে হয়েছে।’
‘বিরক্ত হই নাই।’
‘আমি রক্ত নেওয়ার সময় সবার সাথে গল্প করি। তবে একমাত্র আপনাকে আমার ব্যক্তিগত কথা বলেছি৷’
‘সবার সাথে গল্প করেন কেন, আপু?’
‘সে এক বিরাট কাহিনী। সংক্ষেপে বলছি, একদিন এক রক্তদাতা থেকে রক্ত নিচ্ছিলাম…’
হঠাৎ ডাক্তার সাহেব প্রবেশ করলেন। তিনি নার্সকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। তাড়াতাড়ি রক্ত নিয়ে চলুন৷’
‘জি, স্যার। আনছি৷’
নার্স তার কাহিনী আর বলতে পারলো না। সে রক্ত নিয়ে ডাক্তারের সাথে চলে গেলো অপারেশন থিয়েটারে। আব্দুর রহমান ভাবছে, আরেকদিন এসে পুরো কাহিনী শুনতে হবে। খুব ইন্টারেস্টিং গল্প নিশ্চয়। আচ্ছা রক্তদাতার সাথে গল্প করার কি কারণ হতে পারে? তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
আরেকজন নার্স এসে তাকে বললো, ‘আপনি এখন চলে যেতে পারেন৷’
আব্দুর রহমান চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখছে। সে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। শরীরে যেন কোন শক্তি নেই। কয়েকবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও উঠতে পারলো না। সে নার্সকে বললো, ‘আপু, আমি কি আরো কয়েক মিনিট বসতে পারি?’
‘আপনার কি দূর্বল লাগছে?’
‘জি।’
‘আপনি আস্তে আস্তে নিচে চলে যান। দোকান থেকে জুস, স্যালাইন ও কিছু ফল কিনে খান, দূর্বলতা কেটে যাবে।’
‘আচ্ছা।’
আব্দুর রহমান নিচে নেমে এলো। সে তার বসকে ফোন দিলো। তিনি ফোন রিসিভ করে বললো, ‘আব্দুর রহমান সাহেব, আপনার কাজ শেষ। আপনি এখন চলে যান৷’
‘স্যার, একটু কথা ছিল৷’
‘আগামীকাল অফিসে বলবেন। এখন চলে যান৷’
মানিব্যাগ হারানোর কথা বলে বস থেকে কিছু টাকা ধার নেওয়ার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু বস তার কথা শুনলেন না। সে রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ানোর সাতে সাথে একটি সিএনজি এসে তার সামনে দাঁড়ালো। ড্রাইভার তাকে বললো, ‘স্যার, কোথায় যাবেন?’
‘খিলগাঁও।’
‘চলেন স্যার।’
‘ভাড়া কতো?’
‘রেট ভাড়া দিবেন।’
‘রেট কত?’
‘জানি না স্যার।’
‘তাহলে রেট ভাড়া কিভাবে দিবো?’
‘আপনার কাছে মোবাইল এ্যাপ নাই?’
‘আছে।’
‘এ্যাপে দেখেন কত রেট দেখায়?’
‘দুইশো ত্রিশ টাকা দেখাচ্ছে।’
‘আপনি এ্যাপের টাকা দিলেই চলবে।’
আব্দুর রহমান সিএনজির ভিতরে উঠে বসলো। গাড়ি চলছে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি জ্যামে আটকা পড়েছে। আব্দুর রহমান তার স্ত্রী মিনুকে ফোন দিলো। মিনু ফোন রিসিভ করে বললো, ‘তুমি কোথায় এখন?’
‘আমি সিএনজিতে উঠেছি।’
‘আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসো, লোকজন চলে যাবে।’
‘মিনু, তুমি আমার বিকাশ নম্বরে তাড়াতাড়ি পাঁচশো টাকা পাঠিয়ে দাও তো।’
‘কেন, তোমার কাছে টাকা নাই?’
‘মানিব্যাগ হারিয়ে ফেলেছি।’
‘আচ্ছা, পাঠাচ্ছি।’
সিএনজি খিলগাঁও চলে আসার পর ড্রাইভার পিছনে ফিরে দেখলো আব্দুর রহমান হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। ড্রাইভার বলে উঠলো, ‘স্যার, খিলগাঁও চলে এসেছি৷ এখন কোন দিকে যাবো?’ আব্দুর রহমানের ড্রাইভারের উত্তর দিচ্ছে না। ড্রাইভার একটি সুবিধাজনক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে জোরে জোরে বললো, ‘স্যার, উঠেন। খিলগাঁও এসে গেছি৷’ ড্রাইভার পিছনের সিটে এসে আব্দুর রহমানের গায়ে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করলো, কিন্তু সে উঠলো না৷ ড্রাইভার ভয় পেয়ে গেলো। সে সিএনজি নিয়ে দ্রুত কাছের একটি ক্লিনিকে চলে এলো। আব্দুর রহমানকে ক্লিনিকে ভর্তি করানো হলো। ডাক্তার সাহেব ড্রাইভারকে বললেন, ‘উনি জ্ঞান হারিয়েছেন। শরীর খুব দূর্বল। স্যালাইন দিচ্ছি।’
‘জি, স্যার।’
আব্দুর রহমানের মোবাইল ও ল্যাপটপের ব্যাগ সিএনজি ড্রাইভারের কাছে। হঠাৎ আব্দুর রহমানের মোবাইল বেজে উঠলো। ড্রাইভার ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে বলে উঠলো, ‘কি ব্যাপার, তুমি কখন আসবে?’
‘ম্যাডাম, আমি বরকত। সিএনজি ড্রাইভার। স্যার জ্ঞান হারিয়েছেন। আমি ক্লিনিকে নিয়ে এসেছি। এখন স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। আপনি তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে চলে আসুন৷’
মিনু তাড়াহুড়ো করে মুক্তাকে নিয়ে ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো৷

কিছুক্ষণ পর আব্দুর রহমানের জ্ঞান ফিরেছে। সে ক্লিনিকের বেডে শুয়ে ডানে-বামে তাকাচ্ছে। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘আপনার শরীর এতো দূর্বল হলো কি করে?’
‘আমি আমার বসের খালাকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। শরীর খুব দূর্বল লাগছিল। চোখে ঝাপসা দেখছিলাম। আর কিছু মনে নাই৷’
‘আপনার নিজের শরীরে রক্তশূন্যতা আছে। এই অবস্থায় রক্ত দিলেন কেন?’
‘আমি রক্ত না দিলে রোগী হয়তো মারা যাবে।’
‘কতটুকু রক্ত দিয়েছেন?’
‘এক ব্যাগ।’
‘এক ব্যাগ রক্ত দিলে এতো দূর্বল হওয়ার কথা নয়। আগে কবে রক্ত দিয়েছেন?’
‘এক মাস আগে।’
‘আপনি জানেন না, একবার রক্ত দেওয়ার পর তিন-চার মাস আগে রক্ত দেওয়া যায় না?’
‘জানি, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো জরুরি, তাই রক্ত দিলাম৷’
মিনু মুক্তাকে নিয়ে ক্লিনিকে এলো৷ মিনুর চেহারা খুব মলিন দেখাচ্ছে। রিসিপশনে জিজ্ঞেস করতেই আব্দুর রহমানের ক্যাবিন দেখিয়ে দিলো। সে ক্যাবিনে ঢুকেই কেঁদে উঠলো। ডাক্তার সাহেব বললেন, ‘এখন আর টেনশন করবেন না। উনার জ্ঞান ফিরেছে। এখনো স্যালাইন চলছে। আগামীকাল বাড়ি নিয়ে যাবেন। কিছুদিন রেস্টে থাকতে হবে। তবে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার স্বামী সত্যিই একজন মহৎ মানুষ।’
সিএনজি ড্রাইভার বললো, ‘ম্যাডাম, এই নিন স্যারের মোবাইল ও ল্যাপটপের ব্যাগ।’
মিনু সিএনজি ড্রাইভারকে ভাড়া দিতে টাকা বের করলো, কিন্তু ড্রাইভার টাকা নিলো না। সে বললো, ‘এমন মহৎ মানুষের উপকার করতে পেরেছি এটাই আমার ভাগ্য। আমার ভাড়া পেয়ে গেছি৷ ম্যাডাম, আমি যাই।’
সিএনজি ড্রাইভার চলে গেলো। মিনু আব্দুর রহমানকে বললো, ‘তুমি কেন এমন করলে? আমার তো মনে ছিলো না তুমি এক মাস আগে রক্ত দিয়েছো। এখন থেকে আমি নিজেই হিসাব রাখবো তুমি কবে রক্ত দাও। আমাদের কথাও তোমাকে ভাবতে হবে, নাকি?’
আব্দুর রহমান বলে উঠলো, ‘শোন মিনু, পুরানো একটি অপরাধের দায়মুক্তির চেষ্টা করেছি। আজ নিজেকে হালকা লাগছে৷ মনে হচ্ছে বুকের উপর থেকে একটি বড় পাথর সরে গেছে৷’

#গল্পগ্রন্থ_তৃতীয়_দৃষ্টি

আমিনুল ইসলাম – সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন