বিশ্ব জন্ম নিয়ন্ত্রণ দিবসের বিশেষ লেখাঃ ড্যাম বড়ি

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ড্যাম বড়ি-১

-বাচ্চা নিবেন না, জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিবেন !

-বড়ি খাই তো ম্যাডাম। এবারের বড়ি মনে হয় ড্যাম ছিল।

প্রত্যেকের কাছে এই একই ‘ড্যাম বড়ি’ ‘ড্যাম বড়ি’
শুনতে শুনতে মাথা যখন ড্যাম হওয়ার জোগাড়, ভাবতে শুরু করেছি আসলেই মনে হয় সরকার ড্যাম বড়ি দেয় মাঝে মাঝে,তখনই হঠাৎ জেরার মুখে ড্যামের আসল কারসাজি বের হয়ে আসলো।

-বাচ্চা নষ্ট করলে কেন?

-গরীবের সংসার ম্যাডাম, ছোলের বাপ আর ছোলপোল লিবি লয়।

-তাইলে ব্যবস্থা নিলেই পারো।

-নিছিলাম তো ম্যাডাম। বড়িই তো খায়। ড্যাম ছিল মনে হয় বড়ি।

-নিয়মিত বড়ি খেতে?

-নিয়ম করেই খ্যাতাম ম্যাডাম। তাও কেম্বা ইংক্যা হল।

-সত্যি করে বল তো। নিয়ম করে রোজ বড়ি খেতে?

-নিয়ম করেই খ্যাতাম ম্যাডাম। রোজ অবশ্যি খাওয়া লাগেনা। মাঝে মাঝে খাই। (মুখে সলজ্জ হাসি)

বেরিয়ে এল ‘ড্যাম বড়ি’র রহস্য। আমি এবার নিয়ম করেই বড়িওয়ালীদের বড়ি খাওয়ার ইতিহাস নেয়া শুরু করলাম। দেখলাম, গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত ৯৮-৯৯% বড়িওয়ালীরাই এই নিয়মে নিয়মিত ‘ড্যাম বড়ি’ খায়, এদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা খায়। এনাদের ভালভাবে বুঝিয়ে বললেও অতি কনফিডেন্সের সাথে উত্তর দেয়,

-এত বছর ধরা এ নিয়মেই খাচ্চি ম্যাডাম। কিচ্চু হয়নি।

-হামাগেরে গ্রামের সব বেটিছোলেরা ইংক্যা করেই তো খায়।

-আগে তো রোজই খাচ্চিলাম ম্যাডাম। সগলি কলো,’তুই এত বোকা ক্যা?’

-রোজই খাছুনু ম্যাডাম। এখন বউবেটিরা ন্যাকাপড়া শিখিছে, কল্যো,’রোজ খাওয়া লাগবি না’ । তখন থেকে ইংক্যা করেই খাই।

সবার নিয়ম করে ‘ড্যাম বড়ি’ খাওয়ার ইতিবৃত্ত শুনে একটা কৌতুক মনে পড়ে ……..

এক ভদ্রমহিলা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে ওষুধের দোকানে এসে পিলের পাতা ফার্মাসিস্টকে দেখিয়ে বলল,
‘দেখেন তো ভাই, এই পিলের পাতায় কোন সমস্যা আছে কিনা?’
ফার্মাসিস্ট ভাল করে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে বললেন ,
‘ঠিকই তো আছে। সমস্যা তো দেখছিনা।’
‘বড়ি ড্যাম নয় তো?’
‘না না । ভালই তো দেখছি। ডেটও ঠিক আছে।’ আবার উল্টিয়ে পাল্টিয়ে চোখ বুলিয়ে বললেন ফার্মাসিস্ট । কিছুটা উৎসুক হয়েই জানতে চাইলেন,
‘কেন বলুন তো?’
‘না মানে, এটা নিয়মিত খাওয়ার পরেও আমি বারবার প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ছি।’
‘বলেন কি? নিয়মিত খাওয়ার পরও?
‘হ্যাঁ । নিয়মিত খাওয়ার পরেও….’
ফার্মাসিস্ট এবার নড়েচড়ে বসলেন।
‘আপনি প্রতিদিনই এটা খাচ্ছেন?’
‘আমি না। আমার হাজবেন্ড প্রতিদিনই নিয়ম করে খাচ্ছেন।’
ফার্মাসিস্টের চক্ষু চড়কগাছ। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললেন।
‘মানে……..?’
‘হ্যাঁ, আমার হাজবেন্ড ভেতরের কাগজটা পড়ে বলল, “ওহ্ নো,হানি, এটা তো সাংঘাতিক ওষুধ । এটা খেলে তোমার শরীর স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তোমার খেতে হবেনা, তোমার বদলে আমিই রোজ জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খাব”। এরপর থেকে গত পাঁচ বছর ধরে উনিই নিয়ম করে বড়ি খাচ্ছেন। বিশ্বাস করুন, একদিনও বাদ দেয়না। তারপরেও………….’!

 

ড্যাম বড়ি-২

-নিয়মিত বড়ি খাও?

-এক্কেরে নিয়মিত খাই ম্যাডাম। বড়ি আসলে ড্যামই আছিল।

-হুম। এক বড়ির পাতা শেষ হতে ক’দিন লাগে?

-বেশী দিন লয়। মুনে করেন যে, এক পাতা কিনলে দুইমাস যায়।

-বাহ্ বেশ। মেলা টাকা তাল্যে সঞ্চয় হছে তোমার। এখন ওই টাকা তাল্যে নতুন বাচ্চার পিছে খরচ করো।

এই পর্যন্ত বলেই ক্ষান্ত হতে পারলে ভাল হতো। এরপর বকর বকর করে বড়ি আর ড্যাম বড়ির পার্থক্য বোঝানো শুরু করি।আমার এসিষ্ট্যান্ট বন্যা রাগ রাগ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মহাবিরক্তির সুরে বলে,’ম্যাডাম,বাইরে কল্যে মেলা উগী বস্যা আছে। উগীরা কল্যে মারামারি লাগ্যে যাবি!’

আমি কি করব? যেই হারে ড্যামবড়ি খাওয়ার মাত্রা বাড়ছে,তাতে মাথাই ড্যাম হওয়ার জোগাড়। একটা সত্য ঘটনা বলে উদাহরণ দিই।

গ্রামের মধ্যে মহা হুলস্থূল। চেয়ারম্যানের কাছে বিচার নিয়ে এসেছে সবাই। চেয়ারম্যান সাহেব হাতের ইশারায় সবাইকে থামিয়ে বললেন,

-বল, ঘটনা কি? এত হইচই কিসের?

-আর কয়েন না চেয়ারম্যান সাব, এই ভিজিটর হামাকেরে গেরামেত ড্যাম বড়ি বিলি করিচ্চে। আপনে এর বিচার কর‍্যা দ্যান।

সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘হ হ এর বিচার কর‍্যা দ্যান।’

চেয়ারম্যান আবারো হাতের ইশারায় সবাইকে থামিয়ে দিলেন।

-কই ভিজিটর, কি কচ্চো তুমি কও। এরা কি কচ্চে?

-কতা সত্য নয় চেয়ারম্যান সাব। হামি ক্যা ড্যাম বড়ি বিলি করমু? সরকার হামাক যা দিছে,হামি তাই দিচ্চি। সরকার কুনুদিন ড্যাম বড়ি দিবি? ‘

-সগলি কি তাল্যে মিছা কতা কচ্চে? তুমি বড়ি বাড়ীত থুয়্যা দিছিলা নাকি মেলা দিন ধর‍্যা?

-এলা কি কচ্চেন চেয়ারম্যান সাব? সগলি কোক না ক্যা! হামি কদ্দিন ধর‍্যা সগলির বউ বেটিক বড়ি দিচ্চি!

-তা তো দিচ্চোই। তাল্যে এই কতা হচ্চে ক্যা যে,তুমি ড্যাম বড়ি দিছো?

-যার অসুবিধা হছ্যে তাক এনা পুছ করেন না ক্যা, হামি কি ওক ড্যাম বড়ি দিছনু?

চেয়ারম্যান সাহেব এবার হাঁক ছাড়লেন।

-কই কার অসুবিধা হছ্যে ড্যাম বড়ি খায়্যে, তাঁই সামনে আসো।

দুজন মহিলা হেলেদুলে এল সামনে। একজনের বয়স বিশ-বাইশ মত, অন্যজনের চল্লিশের কোঠায়। চেয়ারম্যান দুজনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

-বল,তোমাদের কাহিনী বল।

একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে অল্পবয়সীজন কথা শুরু করল।

-চেয়ারম্যান সাব, এইডা হামার মাও। এই ভিজিটরের কাছে থ্যাকে লেওয়া ড্যাম বড়ি খায়্যে হামার আর হামার মায়ের দুঝনারই একই চান্দেত ছোল প্যাটোত আচ্চে।

চেয়ারম্যান সাহেবের চোখ গোলগোল হয়ে গেল।

–অ্যাঁ! বল কি!

-হ চেয়ারম্যান সাব। এনাও মিছা কতা কচ্চি না। সগলিক পুছ কর‍্যা দেকেন!

ভিজিটর রেগেমেগে তেড়ে আসল,

-হামার ড্যাম বড়ি খায়্যে নাল্যে তোমার পাও ভারী হছ্যে! তোমার মায়েক তো আর হামি বড়ি বিলি করিনি। তোমার মাওক কিষক ধর‍্যা লিয়্যা আচ্চো?

চেয়ারম্যান সাহেব মাথা নাড়ালেন।

-হ্যাঁ,তাই তো! তোমার মা তো আর হামাগেরে ভিজিটরের বড়ি খায়নি!

-না চেয়ারম্যান সাব, খাছ্যে তো! ওর ড্যাম বড়ি খায়্যেই তো হামার সাতে সাতে হামার মার প্যাটোতও ছোল আচ্চে।

-বুঝিচ্চি না। তুমি কি কব্যার চাচ্ছো, খোলাসা কর‍্যে কও।

-শোনেন চেয়ারম্যান সাব, হামার মাও-বাপ ওই মাসে হামার বাড়ীত বেড়াবা আচ্চিল। মা বড়ির পাতা আনব্যা ভুল্যে গেছলো। মা আর হামি একই বড়ির পাতা থাক্যে বড়ি খুল্যা একই সাতে খাছ্যি। পরের মাসেতই দেকি,মা আর হামার দুঝনারই গাও বন্ধ হয়্যা গেছ্যে। কাটি পরিক্কা কর‍্যা দেকি,দুই দাগ। তকনই বুজছি,হামার ওই বড়ির পাতাই ড্যাম আছিল।

উপস্থিত গ্রামবাসী আবারও হইহই করে উঠল।

-দেকেন, দেকেন, চেয়ারম্যান সাব দেকেন। হামাকেরে ভিজিটরই ড্যামবড়ি দিয়্যা বেড়াচ্চে। এক্কুনি ওর বিচার কর‍্যেন আপনে।

আজ ২৬ সেপ্টেম্বর,বিশ্ব জন্মনিয়ন্ত্রণ দিবস। এ উপলক্ষ্যে আমার জনপ্রিয় লেখা ‘ড্যাম বড়ি’ র দুটি পর্ব একসাথে দিলাম। এটি একটি সচেতনতামূলক পোষ্ট। নীচের অংশটুকু কৌতুক হলেও, উপরের অংশটুকু খাঁটি করুন সত্য। যত মজা করেই ব্যাপারটা উপস্থাপন করি না কেন, পরিস্থিতি রীতিমত উদ্বেগজনক। এইরকম ‘ড্যাম বড়ি’ খেয়ে অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করছে অগণিত নারী। এদের কেউ কেউ এটাকে ‘আল্লাহর দান’ বলে রেখে দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন অভাবের সংসারের বোঝা বাড়ছে, অন্যদিকে দেশও আরও খানিকটা জনশক্তি উপহার পেয়ে উপহারের ভারে নুয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যাপারে সচেতন থাকায়, কোন চিন্তা না করেই সোজায় চলে যাচ্ছে গর্ভপাত করতে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যেখানে সেখানে গর্ভপাতের ফলে জরায়ু ও অন্যান্য জননতন্ত্রের নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদী রোগে নারী স্বাস্থ্য ক্রমশ: ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এভাবে অনিয়মিত পিল খাওয়ার ফলে দেখা দিচ্ছে অনিয়মিত রক্তস্রাব, অতিরিক্ত রক্তস্রাব ,ডিম্বানুর সিস্টসহ নানা ধরনের জটিলতা ।

সুতরাং, নিয়মিত বড়ি(পিল) খান। হঠাৎ একদিন বা দুইদিন ভুলে গেলে, মনে পড়ার সাথে সাথে মিসিং পিলগুলো খেয়ে ফেলুন এবং সেই সাথে অন্যান্য পিলগুলোও যথানিয়মে খান। তিনটি বা তার অধিক পিল ভুলে গেলে, সর্বশেষ মিসিং পিলটি খেয়ে নিয়ে পিলের পাতার অন্যান্য পিল নিয়মানুসারে খান, কিন্তু পরবর্তী সাতদিন শারীরিক মেলামেশা বন্ধ রাখুন কিংবা কনডম ব্যবহার করুন।প্রতিদিন পিল খাওয়া ঝামেলা মনে করলে দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি গ্রহন করুন, যেমন- কপার-টি, ইমপ্লান্ট ইত্যাদি। আর যারা পরিবার পরিপূর্ণ করে ফেলেছেন, তারা স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহন করে স্থায়ীভাবে চিন্তামুক্ত হতে পারেন।

কিন্তু সব কথার শেষ কথা একটিই, এরকম ‘ড্যাম বড়ি’ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। নিজে সচেতন হোন,অন্যকেও সচেতন করুন।

লেখকঃ ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস , এফসিপিএস(অবস এন্ড গাইনী), ফিগো ফেলো(ইটালী)
গাইনী কনসালট্যান্ট
পপুলার ডায়াগনষ্বটিক সেন্টার,
বগুড়া

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.