জোনাথনের ডেডবডি নিয়ে কাটানো বিমর্ষ মুহূর্ত

 সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের কানে কানে

নাজমা বেগম নাজু

লাশঘরের হিম হিম শীতলতায় চিরদিনের মত চিরশান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে জোনাথন। কখনোই আর কোনদিনও আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে দোভাষীর বুলি আওড়াবেন না তিনি। জাতিসংঘে দোভাষীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। এই কাগাবান্দরোতেই ছিলেন।অনেকগুলো ভাষায় ছিল তার প্রশংসনীয় দক্ষতা।একই সাথে ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি, সাংগু এবং আরবি ভাষায় নির্ভূল বলতে এবং লিখতে পারতেন তিনি।

আজ রাত বারটার দিকে তার নিথর রক্তাক্ত মৃতদেহটি উদ্ধার করে আমাদের এই হাসপাতালে নিয়ে আসে জাতিসংঘের টহলরত মিলিটারি।তক্ষুনি জীবন মরণ প্রতিজ্ঞায় মৃতদেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মানবপ্রেমী, দক্ষ নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসকেরা আমার।চিরতরে চলে গেছেন যিনি তাকেই ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকে পুরো হাসপাতাল। মৃতেরা ফেরে না কখনোই। ফিরে আসেননি জোনাথনও। জোনাথন নামের এই ইন্টারপ্রেটর সেন্ট্রাল আফ্রিকার নাগরিক।অনেক মেধাদীপ্ত, স্মার্ট এবং সপ্রতিভ ছিলেন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা।আমাদের এই ব্যানমেডের অনেকগুলো অনুষ্ঠান আয়োজনেও এসেছিলেন তিনি।আমাদের কোন সাংগু ভাষার ইন্টারপ্রেটর নেই বলে বারবার তাকেই ডাকা হতো।স্হানীয়দের চিকিৎসা সেবা অথবা অন্য কোন প্রয়োজনে তার সহায়তা পেতাম আমরা।আজ আবারো এসেছেন এখানে। বড় অসময়ে এসেছেন। এসেছেন মৃতদেহ হয়ে, ইন্টারপ্রেটর হিসাবে নয়।

এই সেক্টরের কাছাকাছি একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন তিনি। স্হানীয় আর্মড গ্রুপের কিছু সদস্য দরজা ভেঙ্গে তার বাড়িতেই তাকে গুলি করে নগদ অর্থকড়ি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।রাত একটা পনের মিনিটে জোনাথনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।সেক্টরের শীর্ষস্হানীয়রা মোটামুটি সবাই ছুটে এসেছেন ব্যানমেডে। কিন্তু তার কোন স্বজন আপনকে দেখলাম না।জানতে পারি তারা সবাই বাংগুইতে থাকেন। শুরুতে কান্নার আর্তনাদে ভেঙ্গে পড়া একজন মহিলাকে দেখেছিলাম। জেনেছিলাম তিনি তার স্ত্রী। এখন তাকেও আর কোথাও দেখছি না।কেউ কান্নাকাটিও করছে না আর। থমথমে শোকার্ত পরিবেশ চারদিকে।এর মাঝেই রাত বেড়ে মধ্যরাত হয়।একে একে আপন নীড়ে ফিরে যায় সবাই।

আর রাতের এই মধ্যপ্রহরে আমাদের কর্মব্যস্ত অফিস শুরু হয়।জোনাথনের মৃতদেহ মর্চুয়ারীতে রেখে আসার পরে বাংগুই- তে ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্সে কথা বলি।চিফ মেডিকেল অফিসার, ফোর্স মেডিকেল অফিসার, মুভমেন্ট কন্ট্রোল অফিসার, মুভমেন্ট কন্ট্রোলের সদস্যবৃন্দ, মেডিকেল ইভাক্যুয়েশন অফিসার সবাইকে টেলিফোনে বিস্তারিত জানাই। এত রাতে ঘুম ভাঙানোর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিই সবার কাছে।প্রত্যেকের কাছে মেইলও পাঠানো হয়।তখন চারটার মত বাজে। ভোরের আগমনী ঘন্টা শুনতে পাই। কিন্ত একটু বিশ্রামের যে বড় প্রয়োজন আমার। কিছুতেই খুলে রাখা যাচ্ছে না দুচোখের পাতা।তার স্বরে বেজে উঠে টেলিফোন। আধো ঘুম আর জাগরনের মাঝে চমকে উঠি। কেটে যায় সবটুকু ঘুমের রেশ।একজন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের রোগি আসছে। তার জরুরি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার আয়োজন করতে হবে।দ্রুত সবাইকে সেটে জানানো হয়। রাতের শেষ ভাগে আবারো দ্বিতীয় দফায় জেগে উঠে পুরো হাসপাতাল।ভোর আসে। নিদ্রা- বিশ্রামহীন রাতের শেষে ব্যস্ততম দিনের সূচনা হয় আবারো। বাংগুই ফোর্সেস হেড কোয়ার্টার্স থেকে জানানো হয় আজ কোন বিমান আসবে না। পোস্টমর্টেম এর জন্য আগামীকাল নেয়া হবে এই ডেডবডি। আগামীকাল মানে— ততক্ষনে চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে যাবে। আমাদের এই টেম্পোরারি মরচুয়ারীর ধারণ ক্ষমতা চব্বিশ ঘন্টাই। মহা দুশ্চিন্তার মাঝে পরে যাই আমি।সেক্টরের শীর্ষস্হানীয়দের এই বাস্তবতা জানাই। কোনরকম দায়িত্ব নিতে রাজি হয় না কেউই। বলে এটা তোমার কাজ। তোমাকেই সবটুকু দায়িত্ব নিতে হবে।তোমাকেই এটা ম্যানেজ করতে হবে।

কোন উপায় না পেয়ে বিকল্প একটা প্রস্তুতি হিসাবে সবগুলো ফ্রিজ খালি করে বরফ বানানোর কাজে ব্যবহার করি( উল্লেখ্য এখানে বরফ খুবই দূষ্প্রাপ্য)। এভাবেই দিন পেরিয়ে রাত হয়, কাঙ্খিত সেই আগামীকালের দেখা পাই।আমাকে জানানো হয় দুটোর দিকে জাতিসংঘের বিশেষ বিমানে উড়াল দেবে মৃত জোনাথন।অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনি।এদিকে মরচুয়ারীর তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়ছে। মাইনাস টু থেকে এখন প্লাসের দিকে। বারটায় জানতে পারি বাংগুইর আবহাওয়া অত্যন্ত খারাপ। প্রচন্ত ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। আজও আসছে না জাতিসংঘের বিমান।মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া আমার। এই ডেডবডির সামান্যতম ক্ষতি হলেও জাতিসংঘ ক্ষমা করবে না আমাকে।নির্ধারিত চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টার কাছাকাছি। টেম্পোরারি এই মরচুয়ারীতে ডেডবডি এতটা সময় থাকার কথা নয়।কিন্তু কে শোনে কার কথা?

ঐ একই কথা সবার মুখে– তুমি ম্যানেজ করো, শুধু আজকের এই রাতটুকু।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার টেনশনও বাড়তে থাকে।সন্ধার কিছু পরে মরচুয়ারী খুলে দেখা হয়। না কোন রকম পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এখনো। তবে বরফ কিছু কিছু গলতে শুরু করেছে। ওগুলো সরিয়ে আবারো নতুন বরফে ঢেকে দেয়া হয় জোনাথনের মৃতদেহ।মনে প্রাণে সৃষ্টিকর্তার সহায়তা প্রার্থনা করি, এই রাতটা, শুধু আজকের এই রাতটা আমাদের রক্ষা করো প্রভু। পরদিন সকালে নিশ্চিত হই জাতিসংঘের বিমান আসছে। আমরা কফিন রেডি করি। আমাদের ব্যানমেডের পক্ষ হতে ফুলের তোড়া এবং শোকবার্তা দিয়ে সাজানো হয় কফিনের ঢাকনা।হাসপাতাল চত্বরে ভীড় জমে গেছে। জাতিসংঘের সদস্য ছাড়া স্হানীয়রাও এসেছেন।বাংগুই থেকে তার ছোটভাই এসেছে।চিফ এ্যাডমিন অফিসার এবং মুভমেন্ট কন্ট্রোল অফিসাররাও এসেছেন।ক্যাথরিন( চিফ এ্যাডমিন অফিসার) কে জিজ্ঞেস করি – জোনাথনের স্ত্রী কোথায়, তাকে দেখছি না কেন? ক্যাথরিন একটু সামনে এসে নীচু স্বরে জানান—– সে তো ওর অফিসিয়াল ওয়াইফ নয়। তার স্ত্রী তিন বছর আগে মারা গেছে। এই মহিলার সাথে জোনাথন লিভ টুগেদার করত। কিছু পরেই হাত তুলে দেখান– ঐ তো ওখানে, সে তো অনেক আগেই এসেছে।চোখ ফিরিয়ে দেখি আকুল হয়ে কাঁদছেন সেই মহিলা।

এ সময়ই ইউনিফর্মের পকেটে থাকা আমার মোবাইল বাজতে থাকে–, প্লেন ল্যান্ড করেছে, ডেডবডি দ্রুত নিতে হবে এয়ার মুভমেন্ট পয়েন্টে।কফিনে মোড়ানো জোনাথনের ডেডবডি অফিসরুমের সামনের মাঠটাতে রাখা হয়।আমরা সবাই দাঁড়িয়ে যাই। স্হানীয় একজন সংক্ষেপে তার জীবনী তুলে ধরেন।তার স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়।ডুকরে কেঁদে উঠেন জোনাথনের ছোট ভাই এবং লিভ টুগেদার করা সেই মহিলাটি।অসহায় এই মহিলার জন্য কষ্টে বুক ভেঙ্গে আসে আমার। সামাজিক ভাবে স্বীকৃত হলেও এই লিভ টুগেদারের কোন আইনি সমর্থন নেই। আবেগ অনুভূতি ভালবাসা মিথ্যে হয়ে গেছে বিয়ে নামের এক টুকরো প্রানহীন কাগজের কাছে। জোনাথনের সহায় সম্পত্তি অর্থের এক কানাকড়িও পাবে না এই মহিলা,এমনকি এই বিপর্যয়ে কারো কাছ থেকে কোনরকম সান্তনা সহানুভূতিও পাবে না। তার রক্তক্ষত হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে কেউই পাশে এসে দুদন্ড দাঁড়াবে না।

ভাবনার ঘোর কাটে আমার—- জোনাথনের প্রেয়সি এবং ছোট ভাই চিৎকার করে কাঁদছেন। এক সময় কফিনের উপর আছড়ে পড়েন তারা। হাতে সময় নেই একেবারেই। তাদের বুঝিয়ে – সরিয়ে নেয়া হয়।কফিন লাশবাহী গাড়িতে তোলা হয়।ধীর গতিতে এয়ার মুভমেন্টের দিকে রওনা দেয় জোনাথনের মৃতদেহ।পেছনে দীর্ঘ সারিতে আনত ভেজা চোখে হাঁটতে থাকে জাতিসংঘের সদস্য এবং স্হানীয় জনগণ। বিষন্নতা এতটাই গ্রাস করেছিল যে ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ি।সরাসরি অফিসে না গিয়ে গোল ঘরটাতে একটু সময় বসি।আমার সাথে ক্যাথিও( মুভমেন্ট কন্ট্রোলের নারি কর্মকর্তা ) এসে পাশের চেয়ারে বসেন। চোখ মুছে জানতে চান — বলতে পারো কবে শেষ হবে এই আত্মনিধন? কবে থামবে এরা? আর কতদিন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস যজ্ঞে উন্মত্ত হয়ে থাকবে এই জাতি? এর উত্তর জানা নেই আমার। জানতে হলে কোথায়, আর কতদূরে যেতে হবে আমাকে তাও জানি না আমি! ( চলবে)

আগের পর্ব- বাতাসে দীর্ঘশ্বাস

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার

 

 

 

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.