কাশ্মীরি নারীদের বেদনার উপাখ্যান

সাজেদা হোমায়রা

লাল গাল, রক্তাভ কপাল, তীক্ষ্ণ নাক, দুধেল সফেদ ত্বক, স্নিগ্ধ হাসির অপূর্ব সুন্দর কাশ্মীরি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কতোবার যে চমকে উঠেছি!
হিজাবে মোড়ানো কাশ্মীরি নারীর মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে কতোবার যে মনে মনে বলেছি…
‘কী নিখুঁত সৃষ্টি বিধাতার!’

কাশ্মীরি মেয়েদের অসাধারণ রূপের কথা পুরো পৃথিবীরই জানা। কিন্তু এই রূপের আড়ালে তাদের ভয়ার্ত আর্তনাদ ক’জনই বা শুনতে পায়? ক’জনই বা দেখতে পায় তাদের উপর অত্যাচারের রক্তক্ষরণ?

ভাবলেই গা শিউরে উঠে ভূস্বর্গ খ্যাত এ উপত্যকায় নারীর শরীর আলাদা যুদ্ধেক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘ধর্ষণ’ ব্যবহৃত হয় যুদ্ধের একটি হাতিয়ার হিসেবে।

সংঘাতসংকুল এ উপত্যকার নারীদের গল্পগুলো খুব করুণ!

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত এলাকা কাশ্মীর। এখানে প্রতি বর্গমাইলে ১০০ জন ভারতীয় সৈনিক কর্মরত। ১৯৯৩ সালে Human Rights Watch জানিয়েছে, কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনী ধর্ষণকে একটি যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে বাড়িতে তল্লাশির সময়। অথবা জোরপূর্বক নারীকে নিয়ে যাওয়া হয় অজানা কোন জায়গায়। কখনোবা ক্ষেতে বা জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া যায় কোন নারীর বিবস্ত্র ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ…
মেয়ে হারা বাবাদের কান্না আর থামে না…
সন্তানরা পাগলের মতো খুঁজে বেড়ায় তাদের মমতাময়ী মাকে…
সেই মা আর ফিরে আসে না।

গত কয়েক দশক ধরে এ ভূস্বর্গে হাজার হাজার নারী সেনা ও আধা সেনাবাহিনী দ্বারা ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

১৯৯১ সালে কুনান ও পুশপুরা গ্রামে এক রাতের ঘটনা….সেনাবাহিনীর সদস্যরা গ্রামের পুরুষদের এক জায়গায় জড়ো করে রেখে ঘরে ঘরে ঢুকে মেয়েদের গণ ধর্ষণ করে। ওই গ্রামে পরের ৩ বছর কোনো বিয়ের প্রস্তাব যায়নি। ধর্ষিত এবং অ-ধর্ষিত সকল মেয়েই ছিলো বিবাহ অযোগ্য। আর বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে যারা ধর্ষিত হয়েছিলো তাদের পরিত্যাগ করেছিলো তাদের স্বামীরা। সেই গ্রামের মেয়েরা আজো সৈন্য দেখলে ভয়ে কাঁপতে থাকে…

এ উপত্যকায় অনেক প্রেগন্যান্ট নারীকেই প্রসবকালে মৃত্যু বরণ করতে হয়, শুধুমাত্র হসপিটালে নেওয়া সম্ভব হয় না বলে। কারণ বাইরে থাকে কারফিউ।

যুদ্ধে নিখোঁজ হয়েছে যার স্বামী, তার আরেকটি নাম ‘অর্ধ বিধবা বা হাফ উইডো’। এরকম হাজার হাজার হাফ উইডোদের কেউ কেউ দুই দশক ধরে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের ফিরে আসার। তারা জানেনা তাদের স্বামী আজো বেঁচে আছে কিনা!

এ আতঙ্ক উপত্যকায় ১০ থেকো ৬০ বছরের মেয়েরা জানেনা কখন কে অর্ডার হাতে এসে বলবে ” সার্চ ইউ”। পরে মধ্যরাতে এসে ছিঁড়ে ফেলবে কাপড়। ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে দেখবে আরেকটি ছোট্ট মেয়ে। সেও জানবে এমন করেই একদিন সার্চ অর্ডার আসবে তারও!

গত ৫ ই আগস্ট ভারত সরকার কতৃক কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর থেকেই ভারতীয়রা মনে করছে, কাশ্মীরি মেয়েরা তো এবার হাতের নাগালে। এখন যে কেউ কাশ্মীরে গিয়ে ‘ফেয়ার স্কিনড কাশ্মীরি গার্লস’ বিয়ে করে আনতে পারে।  ভারতীয় যুবকরা এখন ‘কাশ্মীরি নারী ও তাদের বিয়ে করার উপায়’ জানতে গুগোল সার্চ করছেন। এর ফলে কাশ্মীরি মেয়েদের নিরাপত্তা কতটুকু অটুট থাকবে তা নিয়ে রয়েছে বিরাট আশঙ্কা!

সপ্তদশ শতাব্দীতে অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভায় অভিভূত মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে যে কাশ্মীর ‘ভূস্বর্গ’ আখ্যা পেয়েছিলো…কে জানতো সেই ভূস্বর্গই একদিন মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠবে! কে জানতো এই ভূস্বর্গেই নির্যাতিত নারীদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হবে!

হে পৃথিবী! শুনতে কি পাও?
ধর্ষিত বোনদের গোঙ্গানির আওয়াজ?
হাজার হাজার হাফ উইডোদের করুণ আর্তনাদধ্বনি?
মধ্যরাতে ভেসে আসা সন্তান হারা মায়ের বুক ফাটা কান্না?
বাবা হারা মেয়ের গগনবিদারী আহাজারি?

হে পৃথিবী! শুনতে কি পাও ভূস্বর্গের ভয়ার্ত চিৎকার?

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.